বনপর্ব: ৪১। দীর্ঘায়ু বক ঋষি — শিবি ও সুহোত্র — যযাতির দান
তার পর মার্কণ্ডেয় ইন্দ্রসখা দীর্ঘায়ু বক ঋষির এই উপাখ্যান বললেন। — দেবাসুরযুদ্ধের পর ইন্দ্র ত্রিলোকের অধিপতি হয়ে নানাস্থানে বিচরণ করতে করতে পূর্বসমুদ্রের নিকট বক ঋষির আশ্রমে উপস্থিত হলেন। বক পাদ্য অর্ঘ্য আসনাদি নিবেদন করলে ইন্দ্র বললেন, আপনার লক্ষ বৎসর বয়স হয়েছে; চিরজীবীদের কি দুঃখ তা আমাকে বলুন। বক বললেন, অপ্রিয় লোকের সঙ্গে বাস, প্রিয় লোকের বিরহ, অসাধু লোকের সঙ্গে মিলন, পুত্র-দারাদির বিনাশ, পরাধীনতার কষ্ট ধনহীনতার জন্য অবমাননা, অকুলীনের কুলমর্যাদা, কুলীনের কুলক্ষয় — চিরজীবীদের এইসব দেখতে হয়, এর চেয়ে অধিক দুঃখ আর কি আছে? ইন্দ্র আবার প্রশ্ন করলেন, চিরজীবীদের সুখ কি তা বলুন। বক উত্তর দিলেন, কুমিত্রকে আশ্রয় না করে দিবসের অষ্টম বা দ্বাদশ ভাগে শাক ভক্ষণ — এর চেয়ে সুখকর কি আছে?
অতিভোজী না হয়ে নিজ গৃহে নিজ শক্তিতে আহৃত ফল বা শাক ভোজনই শ্রেয়, পরগৃহে অপমানিত হয়ে সুস্বাদু খাদ্য ভোজনও শ্রেয় নয়। অতিথি ভৃত্য ও পিতৃগণকে অন্নদান ক'রে যে অবশিষ্ট অন্ন খায় তার চেয়ে সুখী কে আছে? মহর্ষি বকের সঙ্গে নানাপ্রকার সদালাপ ক'রে দেবরাজ সুরলোকে চ'লে গেলেন।
পাণ্ডবগণ ক্ষত্রিয়মাহাত্ম্য শুনতে চাইলে মার্কণ্ডেয় বললেন।— একদা কুরুবংশীয় সুহোত্র রাজা পথিমধ্যে উশীনরপুত্র রথারূঢ় শিবি রাজাকে দেখতে পেলেন। তাঁরা বয়স অনুসারে পরস্পরকে সম্মান দেখালেন, কিন্তু গুণে দুজনেই সমান এই ভেবে কেউ কাকেও পথ ছেড়ে দিলেন না। সেই সময়ে নারদ সেখানে এসে বললেন, তোমরা পরস্পরের পথরোধ ক'রে রয়েছ কেন? রাজারা উত্তর দিলেন, ভগবান, যিনি শ্রেষ্ঠ তাঁকেই পথ ছেড়ে দেবার বিধি আছে। আমরা তুল্যগুণশালী সখা, সেজন্য কে শ্রেষ্ঠ তা স্থির করতে পারছি না। নারদ বললেন, ক্রূর লোক মৃদুস্বভাব লোকের প্রতিও ক্রূরতা করে, সাধুজন অসাধুর প্রতিও সাধুতা করেন, তবে সাধুর সহিত সাধু সদাচরণ করবেন না কেন? শিবি রাজা সুহোত্রের চেয়ে সাধুস্বভাব। —
জয়েৎ কদর্যং দানেন সত্যেনানৃতবাদিনম্।
ক্ষময়া ক্রূরকর্মাণমসাধুং সাধুনা জয়েৎ॥
—দান ক'রে কৃপণকে, সত্য বলে মিথ্যাবাদীকে, ক্ষমা করে ক্রূর-কর্মাকে, এবং সাধুতার দ্বারা অসাধুকে জয় করবে।
নারদ তার পর বললেন, তোমরা দুজনেই উদার; যিনি অধিকতর উদার তিনিই স'রে গিয়ে পথ দিন, উদারতার তাই শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হবে। তখন সুহোত্র শিবিকে প্রদক্ষিণ ক'রে পথ ছেড়ে দিলেন এবং তাঁর বহু সৎকর্মের প্রশংসা করে চলে গেলেন। এইরূপে রাজা সুহোত্র তাঁর মাহাত্ম্য দেখিয়েছিলেন।
তার পর মার্কণ্ডেয় এই উপাখ্যান বললেন। — একদিন রাজা যযাতির কাছে এক ব্রাহ্মণ এসে বললেন, মহারাজ, গয়ুর জন্য আমি আপনার কাছে ভিক্ষা চাইতে এসেছি। দেখা যায় লোকে যাচকের উপর অসন্তুষ্ট হয়; আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি, আমার প্রার্থিত বস্তু আপনি তুষ্ট হয়ে দেবেন কিনা? রাজা বললেন, আমি দান ক'রে তা প্রচার করি না, যা দান করা অসম্ভব তার জন্য প্রতিশ্রুতি দিই না।
যা দানের যোগ্য তা দিয়ে আমি অতিশয় সুখী হই, দান ক'রে কখনও অনুতাপ করি না। এই ব'লে রাজা যযাতি ব্রাহ্মণকে তাঁর প্রার্থিত সহস্র ধেনু দান করলেন।