বনপর্ব: ৪৪। কৌশিক, পতিব্রতা ও ধর্ম্মব্যাধ

যুধিষ্ঠির বললেন, ভগবান, আপনি নারীর শ্রেষ্ঠ মাহাত্ম্য এবং সূক্ষ্ম ধর্ম সম্বন্ধে বলুন। মার্কণ্ডেয় বললেন, আমি পতিব্রতার ধর্ম বলছি শোন।—কৌশিক নামে এক তপস্বী ব্রাহ্মণ ছিলেন। একদিন তিনি বৃক্ষমূলে ব’সে বেদপাঠ করছিলেন এমন সময়ে এক বলাকা (স্ত্রী-বক) তাঁর মাথার উপরে মলত্যাগ করলে। কৌশিক ক্রুদ্ধ হয়ে তার দিকে চাইলেন, বলাকা তখনই মরে পড়ে গেল। তাঁকে ভূপতিত দেখে ব্রাহ্মণ অনুতপ্ত হয়ে ভাবলেন, আমি ক্রোধের বশে অকার্য ক’রে ফেলেছি।

তার পর কৌশিক ভিক্ষার জন্য গ্রামে গিয়ে একটি পূর্বপরিচিত গৃহে প্রবেশ ক’রে বললেন, ভিক্ষা দাও। তাঁকে অপেক্ষা করতে ব’লে গৃহিণী ভিক্ষাপাত্র পরিষ্কার করতে গেলেন। এমন সময়ে গৃহস্বামী ক্ষুধার্ত হয়ে গৃহে এলেন, সাধ্বী গৃহিণী তখন ব্রাহ্মণকে ছেড়ে পা আর মুখ ধোবার জল, আসন ও খাদ্য-পানীয় দিয়ে স্বামীর সেবা করতে লাগলেন। তার পর তিনি ভিক্ষার্থী ব্রাহ্মণকে স্মরণ ক’রে লজ্জিত হয়ে তাঁকে ভিক্ষা দিতে গেলেন। কৌশিক ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, এর অর্থ কি? তুমি আমাকে অপেক্ষা করতে ব’লে আটকে রাখলে কেন? সাধ্বী গৃহিণী বললেন, আমাকে ক্ষমা করুন, আমার স্বামী পরমদেবতা, তিনি শ্রান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে এসেছেন সেজন্য তাঁর সেবা আগে করেছি। কৌশিক বললেন, তুমি স্বামীকেই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান ক’রে ব্রাহ্মণকে অপমান করলে! ইন্দ্রও ব্রাহ্মণের নিকট প্রণত থাকেন। তুমি কি জান না যে, ব্রাহ্মণ পৃথিবী দগ্ধ করতে পারেন?

গৃহিণী বললেন, ক্রোধ ত্যাগ করুন, আমি বলাকা নই, ক্রুদ্ধ দৃষ্টি দিয়ে আপনি আমার কি করবেন? আমি আপনাকে অবজ্ঞা করি নি, ব্রাহ্মণদের তেজ ও মাহাত্ম্য আমার জানা আছে, তাঁদের ক্রোধ যেমন বিফল, অনুগ্রহও সেইরূপ। আপনি আমার ত্রুটি ক্ষমা করুন। পতিসেবাই আমি শ্রেষ্ঠ ধর্ম মনে করি, তার ফল আমি কি পেয়েছি দেখুন—আপনি ক্রুদ্ধ হয়ে বলাকাকে দগ্ধ করেছেন তা আমি জানতে পেরেছি। দ্বিজোত্তম, ক্রোধ মানুষের শরীরস্থ শত্রু, যিনি ক্রোধ ও মোহ ত্যাগ করেছেন দেবতারা তাঁকেই ব্রাহ্মণ মনে করেন। আপনি ধর্মজ্ঞ, কিন্তু ধর্মের যথার্থ তত্ত্ব জানেন না। মিথিলায় এক ব্যাধ আছেন, তিনি পিতা-মাতার সেবক, সত্যবাদী ও জিতেন্দ্রিয়। আপনি সেই ধর্মব্যাধের কাছে যান, তিনি আপনাকে ধর্মশিক্ষা দেবেন'। আমার বাচালতা ক্ষমা করুন, স্ত্রী সকলেরই অবধ্য।

কৌশিক বললে—শোভনা, আমি প্রীত হয়েছি, আমার ক্রোধ দূর হয়েছে, তোমার ভর্ৎসনায় আমার মঙ্গল হবে। তার পর কৌশিক জনকরাজার পুরী মিথিলায় গেলেন এবং ব্রাহ্মণদের জিজ্ঞাসা ক'রে ধর্মব্যাধের নিকট উপস্থিত হলেন। ধর্মব্যাধ তখন তাঁর বিপণিতে ব'সে মৃগ ও মহিষের মাংস বিক্রয় করছেন, বহু ক্রেতা সেখানে এসেছে। কৌশিককে দেখে ধর্মব্যাধ সসম্ভ্রমে অভিবাদন ক'রে বললেন, এক পতিব্রতা নারী আপনাকে এখানে আসতে বলেছেন তা আমি জানি। এই স্থান আপনার যোগ্য নয়, আমার গৃহে চলুন। ধর্মব্যাধের গৃহে গিয়ে কৌশিক বললেন, বৎস, তুমি যে ঘোর কর্ম কর তা তোমার যোগ্য নয়। ধর্মব্যাধ বললেন, আমি আমার কুলোচিত কর্মই করি। আমি বিধাতার বিহিত ধর্ম পালন করি, বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবা করি, সত্য বলি, অসূয়া করি না, যথাশক্তি দান করি, দেবতা অতিথি ও ভৃত্যদের ভোজনের পর অবশিষ্ট অন্ন খাই। আমি নিজে প্রাণিবধ করি না, অন্যে যে বরাহ-মহিষ মারে আমি তাই বেচি। আমি মাংস খাই না, কেবল ঋতুকালে ভার্যার সহবাস করি, দিনে উপবাসী থেকে রাত্রে ভোজন করি। আমার প্রারব্ধ অতি দারুণ, তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু দৈবকে অতিক্রম করা দুঃসাধ্য, আমি পূর্বকৃত কর্মের ফল ভোগ করছি। মাংসে দেবতা পিতৃগণ অতিথি ও পরিজনের সেবা হয়, সেজন্য নিহত পশুরও ধর্ম হয়। শ্রুতিতে আছে, অজের ন্যায় ওষধি লতা পশু পক্ষীও মানুষের খাদ্য। রাজা রন্তিদেবের পাকশালায় প্রত্যহ দুই হাজার গরু পাক হ'ত। যথাবিধানে মাংস খেলে পাপ হয় না। ধান্যাদি শস্যবীজও তো জীব, প্রাণী পরস্পরকে ভক্ষণ ক'রেই জীবিত থাকে, মানুষ চলবার সময় ভূমিস্থিত বহু প্রাণী বধ করে। জগতে অহিংসক কেউ নেই।

তার পর ধর্ম, দর্শন ও মোক্ষ সম্বন্ধে বহু উপদেশ দিয়ে ধর্মব্যাধ বললেন—যে ধর্ম দ্বারা আমি সিদ্ধিলাভ করেছি তা আপনি প্রত্যক্ষ করুন। এই বলে তিনি কৌশিককে এক মনোরম সৌধে নিয়ে গেলেন, সেখানে ধর্মব্যাধের মাতা-পিতা আহারের পর শুক্ল বসন ধারণ ক'রে সন্তুষ্ট চিত্তে উত্তম আসনে ব'সে আছেন। ধর্মব্যাধ মাতা-পিতার চরণে মস্তক রাখলে তাঁরা বললেন, পুত্র, ওঠ ওঠ, ধর্ম তোমাকে রক্ষা করুন। ধর্মব্যাধ কৌশিককে বললেন, এরাই আমার পরমদেবতা, ইন্দ্রাদি তেত্রিশ দেবতার সমান। আপনি নিজের মাতা-পিতাকে অবজ্ঞা ক'রে তাঁদের অনুমতি না নিয়ে বেদাধ্যয়নের জন্য গৃহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়েছিলেন।

আপনার শোকে তাঁরা অন্ধ হয়ে গেছেন, আপনি শীঘ্র গিয়ে তাঁদের প্রসন্ন করুন।

কৌশিক বললেন, আমি নরকে পতিত হচ্ছিলাম, তুমি আমাকে উদ্ধার করলে। তোমার উপদেশ অনুসারে আমি মাতা-পিতার সেবা করব। তোমাকে আমি শূদ্র মনে করি না, কোন্ কর্ম্মের ফলে তোমার এই দশা হয়েছে? ধর্ম্মব্যাধ বললেন, পূর্ব্বজন্মে আমি বেদাধ্যায়ী ব্রাহ্মণ ও এক রাজার সখা ছিলাম। তাঁর সঙ্গে মৃগয়ায় গিয়ে আমি মৃগ মনে ক'রে এক ঋষিকে বাণবিদ্ধ করি। তাঁর অভিশাপে আমি ব্যাধ হয়ে জন্মেছি। আমার প্রার্থনায় তিনি বললেন, তুমি শূদ্রযোনিতে জন্মগ্রহণ করেও ধর্মজ্ঞ জাতিস্মর ও মাতা-পিতার সেবাপরায়ণ হবে, শাপক্ষয় হ'লে আবার ব্রাহ্মণ হবে। তারপর আমি সেই ঋষির দেহ থেকে শর তুলে ফেলে তাঁকে তাঁর আশ্রমে নিয়ে গেলাম। তিনি মরেন নি।

ধর্ম্মব্যাধকে প্রদক্ষিণ ক'রে কৌশিক তাঁর আশ্রমে ফিরে গেলেন এবং মাতা-পিতার সেবায় নিরত হলেন।