বনপর্ব: ৪৫। দেবসেনা ও কার্ত্তিকেয়
মার্কণ্ডেয় বললেন, আমি এখন অগ্নিপুত্র কার্ত্তিকেয়র কথা বলছি তোমরা শোন। — দেবগণের সহিত যুদ্ধে দানবগণ সর্বদাই জয়ী হয় দেখে দেবরাজ ইন্দ্র একজন সেনাপতির অনুসন্ধান করতে লাগলেন। একদিন তিনি মানস পর্বতে স্ত্রীকণ্ঠের আর্তনাদ শুনে কাছে গিয়ে দেখলেন, কেশী দানব একটি কন্যার হাত ধরে আছে। ইন্দ্রকে দানব বললে, এই কন্যাকে আমি বিবাহ করব, তুমি বাধা দিও না, চলে যাও। তখন কেশীর সঙ্গে ইন্দ্রের যুদ্ধ হ'ল, কেশী পরাস্ত হয়ে পালিয়ে গেল। কন্যা ইন্দ্রকে বললেন, আমি প্রজাপতির কন্যা দেবসেনা, আমার ভগিনী দৈত্যসেনাকে কেশী হরণ করেছে। আপনার নির্দেশে আমি অজেয় পতি লাভ করতে ইচ্ছা করি। ইন্দ্র বললেন, তুমি আমার মাতৃষসার কন্যা। এই বলে ইন্দ্র দেবসেনাকে ব্রহ্মার কাছে নিয়ে গেলেন। ব্রহ্মা বললেন, এক মহাবিক্রমশালী পুরুষ জন্মগ্রহণ ক'রে এই কন্যার পতি হবেন, তিনি তোমার সেনাপতিও হবেন।
ইন্দ্র দেবসেনাকে বশিষ্ঠাদি সপ্তর্ষির যজ্ঞস্থানে নিয়ে গেলেন। সেখানে অগ্নিদেব হোমকুণ্ড থেকে উঠে দেখলেন, অপূর্ব্বসুন্দরী ঋষিপত্নীগণ কেউ আসনে বসে আছেন, কেউ শুয়ে আছেন। তাঁদের দেখে অগ্নি কামাবিষ্ট হলেন, কিন্তু তাঁদের পাওয়া অসম্ভব জেনে দেহত্যাগের সংকল্প করে বনে চলে গেলেন।
দক্ষকন্যা স্বাহা অগ্নিকে কামনা করতেন। তিনি মহর্ষি অঙ্গিরার ভার্যা শিবার রূপ ধরে অগ্নির কাছে এসে সঙ্গম লাভ করলেন এবং অগ্নির শুক্র নিয়ে গরুড়-পক্ষিণী হয়ে কৈলাস পর্বতের এক কাঞ্চনকুণ্ডে তা নিক্ষেপ করলেন। তার পর তিনি সপ্তর্ষিগণের অন্যান্য ঋষির পত্নীরূপে পূর্ববৎ অগ্নির সঙ্গে মিলিত হলেন, কেবল বশিষ্ঠপত্নী অরুন্ধতীর তপস্যার প্রভাবে তাঁর রূপ ধারণ করতে পারলেন না। এই প্রকারে স্বাহা ছ বার কাঞ্চনকুণ্ডে অগ্নির শুক্র নিক্ষেপ করলেন। সেই স্কন্ন অর্থাৎ স্খলিত শুক্র থেকে স্কন্দ (১) উৎপন্ন হলেন; তাঁর ছয় মস্তক, এক গ্রীবা, এক উদর। ত্রিপুরাসুরকে বধ করে মহাদেব তাঁর ধনু রেখে দিয়েছিলেন, বালক স্কন্দ সেই ধনু নিয়ে গর্জন করতে লাগলেন। বহু লোক ভীত হয়ে তাঁর শরণাপন্ন হ'ল, ব্রাহ্মণরা তাঁদের 'পার্ষদ' বলে থাকেন।
সপ্তর্ষিদের ছয় জন নিজ পত্নীদের ত্যাগ করলেন, তাঁরা ভাবলেন তাঁদের পত্নীরাই স্কন্দের জননী। স্বাহা তাঁদের বার বার বললেন, আপনাদের ধারণা ঠিক নয়, এটি আমারই পুত্র। মহামুনি বিশ্বামিত্র কামার্ত অগ্নির পিছনে পিছনে গিয়েছিলেন সেজন্য তিনি প্রকৃত ঘটনা জানতেন। তিনি স্কন্দের জাতকর্মাদি ত্রয়োদশ মঙ্গলকার্য সম্পন্ন ক'রে সপ্তর্ষিদের বললেন, আপনাদের পত্নীদের অপরাধ নেই; কিন্তু ঋষিরা তা বিশ্বাস করলেন না।
স্কন্দের বৃত্তান্ত শুনে দেবতারা ইন্দ্রকে বললেন, এর বল অসহ্য হবে, শীঘ্র একে বধ করুন; কিন্তু ইন্দ্র সাহস করলেন না। তখন দেবতারা স্কন্দকে মারবার জন্য লোকমাতা (২)দের পাঠালেন। কিন্তু তাঁরা গিয়ে বালককে বললেন, তুমি আমাদের পুত্র হও। স্কন্দ তাঁদের স্তন্য পান করলেন। সেই সময়ে অগ্নিও এলেন এবং মাতৃগণের সঙ্গে মিলিত হয়ে স্কন্দকে রক্ষা করতে লাগলেন।
স্কন্দকে জয় করা দুঃসাধ্য জেনেও বজ্রধর ইন্দ্র সদলবলে তাঁর কাছে গিয়ে সিংহনাদ করলেন। অগ্নিপুত্র কার্তিক সাগরের ন্যায় গর্জন ক'রে মুখনিৰ্গত অগ্নিশিখায় দেবসৈন্য দগ্ধ করতে লাগলেন। ইন্দ্র বজ্র নিক্ষেপ করলেন, কার্তিকের দক্ষিণ পার্শ্ব বিদীর্ণ হ'ল, তা থেকে বিশাখ (৩) নামে এক যোদ্ধা উৎপন্ন হলেন, তাঁর (১) স্কন্দ, কার্তিকেয় বা কার্তিকের উৎপত্তি সম্বন্ধে বিভিন্ন উপাখ্যান প্রচলিত আছে।
(২) মাতৃকা, এঁরা শিবের অনুচরী।
(৩) কার্তিকের এক নাম।
দেহ কাঞ্চনবৰ্ণ, কৰ্ণে দিব্য কুণ্ডল, হস্তে শক্তি অস্ত্র। তখন দেবরাজ ভয় পেয়ে কাৰ্ত্তিকের শরণাপন্ন হলেন এবং তাঁকে দেবসেনাপতি করলেন। পাৰ্ব্বতীর সঙ্গে মহাদেব এসে কাৰ্ত্তিকের গলায় দিব্য সুবৰ্ণমালা পরিয়ে দিলেন। শিবগণ রুদ্রকে অগ্নি বলেন, সেজন্য কাৰ্ত্তিক মহাদেবেরও পুত্র, মহাদেব অগ্নির শরীরে প্রবেশ ক'রে এই পুত্র উৎপাদন করেছিলেন।
দেবগণ কর্তৃক অভিষিক্ত হয়ে কাৰ্ত্তিক রক্ত বস্ত্র পরে রথারোহণ করলেন, তাঁর ধ্বজে অগ্নিদত্ত কুক্কুটাচিহ্নিত লোহিত পতাকা কালাগ্নির ন্যায় সমুখিত হ'ল。 ইন্দ্র দেবসেনাকে কাৰ্ত্তিকের হস্তে সম্প্রদান করলেন। সেই সময়ে ছয় ঋষিপত্নী এসে কাৰ্ত্তিককে বললেন, পুত্র, আমরা তোমার জননী এই মনে করে আমাদের স্বামীরা অকারণে আমাদের ত্যাগ করেছেন এবং পুণ্যস্থান থেকে পরিচ্যুত করেছেন, তুমি আমাদের রক্ষা কর। কাৰ্ত্তিক বললেন, আপনারা আমার মাতা, আমি আপনাদের পুত্র, আপনারা যা চান তাই হবে।
স্কন্দের পালিকা মাতৃগণকে এবং স্কন্দ থেকে উৎপন্ন কতকগুলি কুমার-কুমারীকে স্কন্দগ্রহ(১) বলা হয়, তাঁরা ষোড়শ বৎসর বয়স পর্যন্ত শিশুদের নানাপ্রকার অমঙ্গল ঘটান। এইসকল গ্রহের শান্তি এবং কাৰ্ত্তিকের পূজা করলে মঙ্গল আয়ু ও বীৰ্য্য লাভ হয়।
স্বাহা কাৰ্ত্তিকের কাছে এসে বললেন, আমি দক্ষকন্যা স্বাহা, তুমি আমার আপন পুত্র। অগ্নি জানেন না যে আমি বাল্যকাল থেকে তাঁর অনুরাগিণী। আমি তাঁর সঙ্গেই বাস করতে ইচ্ছা করি। কাৰ্ত্তিক বললেন, দেবী, শিবগণ হোমাগ্নিতে হব্য-কব্য অর্পণ করবার সময় 'স্বাহা' বলবেন, তার ফলেই অগ্নির সঙ্গে আপনার সৰ্ব্বদা বাস হবে।
তার পর হরপাৰ্ব্বতী সূর্য্যের ন্যায় দীপ্তমান রথে চ'ড়ে দেবাসুরের বিবাদস্থল ভদ্রবটে যাত্রা করলেন। দেবসেনায় পরিবৃত হয়ে কাৰ্ত্তিকও তাঁদের সঙ্গে গেলেন। সহসা নানাপ্রহরণধারী ঘোরাকৃতি অসুরসৈন্য মহাদেব ও দেবগণকে আক্রমণ করলে। মহিষ নামক এক মহাবল দানব এক বিপুল পৰ্বত নিক্ষেপ করলে, তার আঘাতে দশ সহস্র দেবসৈন্য নিহত হ'ল। ইন্দ্রাদি দেবগণ ভয়ে পলায়ন করলেন। মহিষ দ্রুতবেগে অগ্রসর হয়ে রুদ্রের রথ ধরলে। তখন কাৰ্ত্তিক রথারোহণে এসে প্রজ্বলিত শক্তি অস্ত্র নিক্ষেপ করে মহিষের মুণ্ডচ্ছেদ করলেন।
প্রায় সমস্ত দানব তাঁর শরঘাতে বিনষ্ট হ'ল; যারা অবশিষ্ট রইল, কার্ত্তিকের পার্ষদগণ তাদের খেয়ে ফেললে। যুদ্ধস্থান দানবশূন্য হ'লে ইন্দ্র কার্ত্তিককে আলিঙ্গন ক'রে বললেন, মহাবাহু, এই মহিষদানব ব্রহ্মার নিকট বর পেয়ে দেবগণকে তৃণতুল্য জ্ঞান করত, তুমি এই দেবশত্রু ও তার তুল্য শত শত দানবকে সংহার করেছ। তুমি উমাপতি শিবের ন্যায় প্রভাবশালী, ত্রিভুবনে তোমার কীর্ত্তি অক্ষয় হয়ে থাকবে।