বনপর্ব: ৪৭। দুর্য্যোধনের ঘোষযাত্রা ও গন্ধর্ব্বহস্তে নিগ্রহ

মার্কণ্ডেয় প্রভৃতি চলে গেলে পাণ্ডবগণ দ্বৈতবনে সরোবরের নিকট গৃহ নির্মাণ করে বাস করতে লাগলেন। সেই সময়ে হস্তিনাপুরে একদিন শকুনি ও কর্ণ দুর্যোধনকে বললেন, রাজা, তুমি এখন শ্রীসম্পন্ন হয়ে রাজ্যভোগ করছ, আর পাণ্ডবরা শ্রীহীন রাজ্যচ্যুত হয়ে বনে বাস করছে। এখন একবার তাদের দেখে এস। পর্বতবাসী যেমন ভূতলবাসীকে দেখে, সমৃদ্ধিশালী লোকে সেইরূপ দুর্দশাপন্ন শত্রুকে দেখে, এর চেয়ে সুখজনক আর কিছুই নেই। তোমার পত্নীরাও বেশভূষায় সুসজ্জিতা হয়ে মৃগচর্মধারিণী দীনা দ্রৌপদীকে দেখে আসুন।

দুর্যোধন বললেন, তোমরা আমার মনের মতন কথা বলেছ, কিন্তু বৃদ্ধ রাজা আমাদের যেতে দেবেন না। শকুনির সঙ্গে পরামর্শ করে কর্ণ বললেন, দ্বৈতবনের কাছে আমাদের গোপরা থাকে, তারা তোমার প্রতীক্ষা করছে। ঘোষযাত্রা (১) সর্বদাই কর্তব্য, ধৃতরাষ্ট্র তোমাকে অনুমতি দেবেন। এই কথার পর তিনজনে সহাস্যে হাতে হাত মেলালেন।

(১) ঘোষ—গোপপল্লী বা বাথান যেখানে অনেক গরু রাখা হয়।

কর্ণ ও শকুনি ধৃতরাষ্ট্রের কাছে গিয়ে বললেন, কুরুরাজ, আপনার গোপ-পল্লীর গরুর গণনা আর বাছুরদের চিহ্নিত করবার সময় এসেছে, মৃগয়ারও এই সময়, অতএব আপনি দুর্যোধনকে যাবার অনুমতি দিন। ধৃতরাষ্ট্র বললেন, মৃগয়া আর গরু দেখে আসা দুইই ভাল, কিন্তু শুনেছি গোপপল্লীর নিকটেই নরব্যাঘ্র পাণ্ডবরা বাস করেন, সেজন্য তোমাদের সেখানে যাওয়া উচিত নয়। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তোমাদের দেখলে ক্রুদ্ধ হবেন না, কিন্তু ভীম অসহিষ্ণু আর যাজ্ঞসেনী তো মূর্তিমতী তেজ। তোমরা দর্প ও মোহের বশে অপরাধ করবে, তার ফলে তপস্বী পাণ্ডবরা তোমাদের দগ্ধ ক'রে ফেলবেন। অর্জুনও ইন্দ্রলোকে অস্ত্রশিক্ষা ক'রে ফিরে এসেছেন। অতএব দুর্যোধন, তুমি নিজে যেয়ো না, পরিদর্শনের জন্য বিশ্বস্ত লোক পাঠাও।

শকুনি বললেন, যুধিষ্ঠির ধর্মজ্ঞ, তিনি আমাদের উপর ক্রুদ্ধ হবেন না, অন্য পাণ্ডবরাও তাঁর অনুগত। আমরা মৃগয়া আর গরু গোনবার জন্যই যেতে চাচ্ছি, পাণ্ডবদের সঙ্গে দেখা করবার জন্য নয়। তাঁরা যেখানে আছেন সেখানে আমরা যাব না। ধৃতরাষ্ট্র অনিচ্ছায় অনুমতি দিলেন। তখন দুর্যোধন কর্ণ শকুনি ও দুঃশাসন প্রভৃতি দ্বৈতবনে যাত্রা করলেন, তাঁদের সঙ্গে অশ্ব-গজ-রথ সমেত বিশাল সৈন্য, বহু স্ত্রীলোক, বিপণি ও শকট সহ বণিকের দল, বেশ্যা, স্তুতিপাঠক, মৃগয়াজীবী প্রভৃতিও গেল। গোপালনস্থানে উপস্থিত হয়ে দুর্যোধন বহু সহস্র গাভী ও বৎস পরিদর্শন গণনা ও চিহ্নিত করলেন এবং গোপালকদের মধ্যে আনন্দে বাস করতে লাগলেন। নৃত্যগীতবাদ্যে নিপুণ গোপ ও গোপকন্যারা দুর্যোধনের মনোরঞ্জন করতে লাগল। তিনি সেই রমণীয় দেশে মৃগয়া দুগ্ধপান ও বিবিধ ভোগবিলাসে রত হয়ে বিচরণ করতে লাগলেন।

দ্বৈতবনের নিকটে এসে দুর্যোধন তাঁর ভৃত্যদের আদেশ দিলেন, তোমরা শীঘ্র বহু ক্রীড়াগৃহ নির্মাণ কর। সেই সময়ে কুবেরভবন থেকে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন ক্রীড়া করবার জন্য দ্বৈতবনের সরোবরের নিকট সদলবলে অবস্থান করছিলেন। দুর্যোধনের লোকেরা দ্বৈতবনের কাছে এলেই গন্ধর্বরা তাদের বাধা দিলে। এই সংবাদ পেয়ে দুর্যোধন তাঁর একদল দুর্ধর্ষ সৈন্যদের বললেন, গন্ধর্বদের তাড়িয়ে দাও। তারা অকৃতকার্য হয়ে ফিরে এলে দুর্যোধন বহু সহস্র যোদ্ধা পাঠালেন। গন্ধর্বগণ মৃদুবাক্যে বারণ করলেও কুরুসৈন্য সবলে দ্বৈতবনে প্রবেশ করলে।

গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর যোদ্ধাদের বললেন, তোমরা ওই অনার্যদের শাসন কর। সশস্ত্র গন্ধর্বসেনার আক্রমণে কুরুসেনা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণও যুদ্ধে বিমুখ হলেন। কিন্তু মহাবীর কর্ণ নিরস্ত হলেন না, তিনি শত শত গন্ধর্ব বধ ক'রে চিত্রসেনের বাহিনীকে বিধ্বস্ত ক'রে দিলেন। তখন দুর্যোধনাদি কর্ণের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন। নিজের সৈন্যদল নিপীড়িত হচ্ছে দেখে চিত্রসেন মায়া অবলম্বন করলেন। গন্ধর্বসেনারা কর্ণের রথ ধ্বংস ক'রে ফেললে, কর্ণ লম্ফ দিয়ে নেমে দুর্যোধনের ভ্রাতা বিকর্ণের রথে উঠে চ'লে গেলেন। কর্ণের পরাজয় এবং কুরুসেনার পলায়ন দেখেও দুর্যোধন যুদ্ধে বিরত হলেন না। তাঁর রথও নষ্ট হ'ল, তিনি ভূপতিত হয়ে চিত্রসেনের হাতে বন্দী হলেন। তখন গন্ধৰ্ব্বরা দুঃশাসন প্রভৃতি এবং তাদের সকলের পত্নীদের ধরে নিয়ে দ্রুতবেগে চলে গেল।

গন্ধৰ্ব্বগণ দুৰ্য্যোধনকে হরণ ক'রে নিয়ে গেলে পরাজিত কুরুসৈন্য বেশ্যা ও বণিক প্রভৃতি পাণ্ডবগণের শরণাপন্ন হ'ল। দুৰ্য্যোধনের বৃদ্ধ মন্ত্রীরা দীনভাবে যুধিষ্ঠিরের সাহায্য ভিক্ষা করলেন। ভীম বললেন, আমরা গজবাজি নিয়ে যুদ্ধ ক'রে অনেক চেষ্টায় যা করতাম গন্ধৰ্ব্বরা তা সম্পন্ন করেছে। দুৰ্য্যোধন যে উদ্দেশ্যে এসেছিল তা সিদ্ধ না হয়ে অন্য প্রকার ঘটেছে। আমরা নিষ্ক্রিয় হয়ে রয়েছি, কিন্তু ভাগ্যক্রমে এমন লোকও আছেন যিনি আমাদের প্রিয়সাধনের ভার স্বয়ং নিয়েছেন। ভীমের এই কৰ্কশ কথা শুনে যুধিষ্ঠির বললেন, এখন নিষ্ঠুরতার সময় নয়, কৌরবগণ ভয়ার্ত্ত ও বিপদগ্রস্ত হয়ে আমাদের শরণ নিয়েছে। জ্ঞাতিদের মধ্যে ভেদ হয়, কলহ হয়, কিন্তু তার জন্য কুলধৰ্ম্ম নষ্ট হ'তে পারে না। দুৰ্য্যোধন আর কুরূনারীদের হরণের ফলে আমাদের কুল নষ্ট হ'তে বসেছে, দুৰ্ব্বুদ্ধি চিত্রসেন আমাদের অবজ্ঞা ক'রে এই দুষ্কাৰ্য্য করেছেন। বীরগণ, তোমরা বিলম্ব ক'রো না, ওঠ, চার ভ্রাতায় মিলে দুৰ্য্যোধনকে উদ্ধার কর। ভীম, বিপন্ন দুৰ্য্যোধন জীবনরক্ষার জন্য তোমাদেরই বাহুবল প্রার্থনা করেছে এর চেয়ে গৌরবের বিষয় আর কি হ'তে পারে? আমি এখন সাদস্ক যজ্ঞে নিযুক্ত আছি, নয়তো বিনা বিচারে নিজেই তার কাছে দৌড়ে যেতাম। তোমরা মিষ্ট কথায় দুৰ্য্যোধনাদির মুক্তি চাইবে, যদি তাতে ফল না হয় তবে বলপ্রয়োগে গন্ধৰ্ব্বরাজকে পরাস্ত করবে।

ভীম অর্জ্জুন নকুল সহদেব বৰ্ম্ম ধারণ ক'রে সশস্ত্ৰ হয়ে রথারোহণে যাত্রা করলেন, তাঁদের দেখে কৌরবসৈন্যগণ আনন্দধ্বনি করতে লাগল। গন্ধৰ্ব্বসেনার নিকটে গিয়ে অর্জ্জুন বললেন, আমাদের ভ্রাতা দুৰ্য্যোধনকে ছেড়ে দাও। গন্ধৰ্ব্বরা ঈষৎ হাস্য ক'রে বললে, বৎস, আমরা দেবরাজ ভিন্ন আর কারও আদেশ শুনি না। অর্জ্জুন আবার বললেন, যদি ভাল কথায় না ছাড় তবে বলপ্রয়োগ করব। তার পর গন্ধৰ্ব্ব ও পাণ্ডবগণের যুদ্ধ আরম্ভ হ'ল। অর্জ্জুনের শরবৰ্ষণে গন্ধৰ্ব্বসেনা বিনষ্ট হচ্ছে দেখে চিত্রসেন গদাহস্তে যুদ্ধ করতে এলেন, অর্জ্জুন তাঁর গদা শরাঘাতে কেটে ফেললেন। চিত্রসেন মায়াবলে অন্তৰ্হিত হয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন। অর্জ্জুন ক্রুদ্ধ হয়ে শব্দবেদী বাণ দিয়ে তাঁকে বধ করতে উদ্যত হলেন। তখন চিত্রসেন দৰ্শন দিয়ে বললেন, আমি তোমার সখা।

চিত্রসেনকে দুৰ্ব্বল দেখে অর্জ্জুন তাঁর বাণ সংহরণ ক'রে সহাস্যে বললেন, বীর, তুমি দুৰ্য্যোধনাদি আর তাঁর ভার্য্যাদের হরণ করেছ কেন? চিত্রসেন বললেন, ধনঞ্জয়, দুরাত্মা দুর্যোধন আর কর্ণ তোমাদের উপহাস করবার জন্য এখানে এসেছে জানতে পেরে দেবরাজ ইন্দ্র আমাকে বললেন, যাও, দুর্যোধন আর তার মন্ত্রদাতাদের বেঁধে নিয়ে এস। তাঁর আদেশ অনুসারে আমি এদের সুরলোকে নিয়ে যাব। তার পর চিত্রসেন যুধিষ্ঠিরের কাছে গেলেন এবং তাঁর অনুরোধে দুর্যোধন প্রভৃতিকে মুক্তি দিলেন। যুধিষ্ঠির গন্ধর্বদের প্রশংসা ক'রে বললেন, তোমরা বলবান, তথাপি ভাগ্যক্রমে এদের বধ কর নি। বৎস চিত্রসেন, তোমরা আমার মহা উপকার করেছ, আমার কুলের মর্যাদাহানি কর নি।

চিত্রসেন বিদায় নিয়ে চ'লে গেলেন। ইন্দ্র দিব্য অমৃত বর্ষণ ক'রে নিহত গন্ধর্বগণকে পুনর্জীবিত করলেন। কৌরবগণ তাঁদের স্ত্রীপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে পাণ্ডবদের গুণকীর্তন করতে লাগলেন। যুধিষ্ঠির দুর্যোধনকে বললেন, বৎস, আর কখনও এমন দুঃসাহসের কাজ করো না। এখন তোমরা নিরাপদে স্বচ্ছন্দে গৃহে যাও, মনে কোনও দুঃখ রেখো না। ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরকে অভিবাদন ক'রে দুর্যোধন লজ্জায় ও দুঃখে বিদীর্ণ হয়ে বিকলেন্দ্রিয় আতুরের ন্যায় হস্তিনাপুরে যাত্রা করলেন।