বনপর্ব: ৪৮। দুর্য্যোধনের প্রায়োপবেশন
শোকে অভিভূত হয়ে নিজের পরাভবের বিষয় ভাবতে ভাবতে দুর্যোধন তাঁর চতুরঙ্গ বলের পশ্চাতে যেতে লাগলেন। পথে এক স্থানে যখন তিনি বিশ্রাম করছিলেন তখন কর্ণ তাঁর কাছে এসে বললেন, রাজা, ভাগ্যক্রমে তুমি কামরূপী গন্ধর্ব- দের জয় করেছ, ভাগ্যক্রমে আবার তোমার সঙ্গে আমার মিলন হ'ল। আমি শরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলাম, গন্ধর্বরা আমার পশ্চাদ্ধাবন করেছিল, সেজন্যই আমি যুদ্ধ-স্থল থেকে চ'লে গিয়েছিলাম। এই অমানুষিক যুদ্ধে তুমি ও তোমার ভ্রাতারা জয়ী হয়ে অক্ষতদেহে ফিরে এসেছ দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।
অধোমুখে গদ্গদম্বরে দুর্যোধন বললেন, কর্ণ, তুমি প্রকৃত ঘটনা জান না। বহুক্ষণ যুদ্ধের পর গন্ধর্বরা আমাদের পরাস্ত করে এবং স্ত্রী পুত্র অমাত্য প্রভৃতি সহ বন্ধন ক'রে আকাশপথে হরণ ক'রে নিয়ে যায়। পাণ্ডবগণ সংবাদ পেয়ে আমাদের উদ্ধার করতে আসেন। তার পর চিত্রসেন আর অর্জুন আমাকে যুধিষ্ঠিরের কাছে নিয়ে যান, যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে আমরা মুক্তি পেয়েছি। চিত্রসেন যখন বললেন যে আমরা সপত্নীক পাণ্ডবদের দুর্দশা দেখতে এসেছিলাম তখন লজ্জায় আমার ভূগর্ভে প্রবেশ করতে ইচ্ছা হ'ল। এর চেয়ে যুদ্ধে মরাই আমার পক্ষে ভাল হ'ত। আমি হস্তিনাপুরে যাব না, এইখানেই প্রায়োপবেশনে প্রাণত্যাগ করব, তোমরা ফিরে যাও। দুঃশাসন, কর্ণ আর শকুনির সহায়তায় তুমিই রাজ্যশাসন ক'রো।
দুঃশাসন কাতর হয়ে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পদতলে পড়ে বললেন, এ কখনই হ'তে পারে না। কর্ণ বললেন, রাজা, তোমার চিত্তদৌর্বল্য আজ দেখলাম। সেনানায়কগণ অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধে শত্রুহস্তে বন্দী হন, আবার নিজ সৈন্য কর্তৃক মুক্তও হন। তোমারই রাজ্যবাসী পাণ্ডবরা তোমাকে মুক্ত করেছে, তাতে দুঃখ কিসের? পাণ্ডবরা তোমার দাস, সেকারণেই তোমার সহায় হয়েছে।
শকুনি বললেন, আমি তোমাকে বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী করেছি, কিন্তু তুমি নির্বুদ্ধিতার জন্য সে সমস্ত ত্যাগ ক'রে মরতে চাচ্ছ। পাণ্ডবরা তোমার উপকার করেছে তাতে তোমার আনন্দিত হওয়াই উচিত। তুমি পাণ্ডবদের সঙ্গে সৌভ্রাত্র কর, তাদের পৈতৃক রাজ্য ফিরিয়ে দাও (১), তাতে তোমার যশ ধর্ম ও সুখ লাভ হবে।
দুর্যোধন কিছুতেই প্রবোধ মানলেন না, প্রায়োপবেশনের সংকল্পও ছাড়লেন না। তখন তাঁর সুহৃদগণ বললেন, রাজা, তোমার যে গতি আমাদেরও তাই, আমরা তোমাকে ছেড়ে যাব না। তার পর দুর্যোধন আচমন করে শুচি হলেন এবং কুশচীর ধারণ ক'রে মৌনী হয়ে স্বর্গলাভের কামনায় কুশশয্যায় শয়ন করলেন।
দেবগণ কর্তৃক পরাজিত হয়ে দানবগণ পাতালে বাস করছিল। দুর্যোধনের প্রায়োপবেশনের ফলে তাদের স্বপক্ষের ক্ষতি হবে জেনে তারা এক যজ্ঞ করলে। যজ্ঞ সমাপ্ত হ'লে এক অদ্ভুত কৃত্যা মুখব্যাদান করে উত্থিত হয়ে বললে, কি করতে হবে? দানবরা বললে, দুর্যোধন প্রায়োপবেশন করেছেন, তাঁকে এখানে নিয়ে এস। নিমেষমধ্যে কৃত্যা দুর্যোধনকে পাতালে নিয়ে এল। দানবরা তাঁকে বললে, ভরত-কুলপালক রাজা দুর্যোধন, আত্মহত্যায় অধোগতি ও যশোহানি হয়, প্রায়োপবেশনের সংকল্প ত্যাগ কর। আমরা মহাদেবের তপস্যা ক'রে তোমাকে পেয়েছি, তিনি তোমার পূর্বকায় (নাভির ঊর্ধ্ব দেহ) বজ্রের ন্যায় দৃঢ় ও অস্ত্রের অভেদ্য করেছেন, আর পার্বতী তোমার অধঃকায় পুষ্পের ন্যায় কোমল ও নারীদের মনোহর করেছেন। মহেশ্বর-মহেশ্বরী তোমার দেহ নির্মাণ করেছেন সেজন্য তুমি দিব্যপুরুষ, মানুষ নও। তোমাকে সাহায্য করার জন্য দানব ও অসুরগণ ভূতলে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁরা ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ প্রভৃতির দেহে প্রবেশ করবেন, তার ফলে ভীষ্মাদি দয়া ত্যাগ ক'রে তোমার শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন, পথে ভ্রাতা বন্ধু শিষ্য কাউকেও নিষ্কৃতি দেবেন না। নিহত নরকাসুরের আত্মা কর্ণের দেহে অধিষ্ঠান ক'রে কৃষ্ণ ও অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন। আমরা সংশপ্তক নামে বহু সহস্র দৈত্য ও রাক্ষস নিযুক্ত করেছি, তারা অর্জুনকে বধ করবে। তুমি শত্রুহীন হয়ে পৃথিবী ভোগ করবে, অতএব শোক ত্যাগ করে স্বগৃহে যাও। তুমি আমাদের আর পাণ্ডবগণ দেবতাদের অবলম্বন।
দানবগণ দুর্যোধনকে প্রিয়বাক্যে আশ্বাস দিয়ে আলিঙ্গন করলে। কৃত্যা তাঁকে পূর্বস্থানে রেখে এল। এইরূপ স্বপ্নদর্শনের পর দুর্যোধনের দৃঢ়বিশ্বাস হ'ল যে পাণ্ডবগণ যুদ্ধে পরাজিত হবেন। তিনি স্বপ্নের বৃত্তান্ত প্রকাশ করলেন না। রাত্রিশেষে কর্ণ কৃতাঞ্জলি হয়ে সহাস্যে তাঁকে বললেন, রাজা, ওঠ, মরলে শত্রু-জয় করা যায় না, জীবিত থাকলেই শত্রু হয়। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, যুদ্ধে অর্জুনকে বধ করব। তার পর দুর্যোধন সদলে হস্তিনাপুরে ফিরে গেলেন।