বনপর্ব: ৪৯। দুর্য্যোধনের বৈষ্ণব যজ্ঞ
দুর্যোধন ফিরে এলে ভীষ্ম তাঁকে বললেন, বৎস, আমার অমত সত্ত্বেও তুমি দ্বৈতবনে গিয়েছিলে। গন্ধর্বরা তোমাকে ধ'রে নিয়ে গিয়েছিল, অবশেষে পাণ্ডবরা তোমাকে মুক্ত করলেন। সূতপুত্র কর্ণ ভয় পেয়ে রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেলেন। মহাত্মা পাণ্ডবদের আর দুর্মতি কর্ণের বিক্রম তুমি দেখেছ, এখন বংশের মঙ্গলার্থে পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি কর। দুর্যোধন হেসে শকুনির সঙ্গে উঠে গেলেন। ভীষ্ম লজ্জিত হয়ে নিজের ভবনে প্রস্থান করলেন।
দুর্যোধন কর্ণকে বললেন, পাণ্ডবদের ন্যায় আমিও রাজসূয় যজ্ঞ করতে ইচ্ছা করি। কর্ণ প্রভৃতি সোৎসাহে এই প্রস্তাবের সমর্থন করলেন, কিন্তু পুরোহিত দুর্যোধনকে বললেন, তোমার পিতা আর যুধিষ্ঠির জীবিত থাকতে তোমাদের বংশে আর কেউ এই যজ্ঞ করতে পারেন না। তবে আর একটি মহাযজ্ঞ আছে যা রাজসূয়ের সমান, তুমি তাই কর। তোমার অধীন করদ রাজারা সুবর্ণ দেবেন, সেই সুবর্ণে লাঙ্গল নির্মাণ ক'রে যজ্ঞভূমি কর্ষণ করতে হবে, তার পর যথাবিধি যজ্ঞ আরম্ভ হবে। এই যজ্ঞের নাম বৈষ্ণব যজ্ঞ, এর অনুষ্ঠান করলে তোমার অভিলাষ সফল হবে।
মহাসমারোহে প্রভূত অর্থব্যয়ে যজ্ঞের আয়োজন হ'ল। দূতেরা দ্রুতগামী রথে রাজা ও ব্রাহ্মণদের নিমন্ত্রণ করতে গেল। দুঃশাসন একজন দূতকে বললেন, শীঘ্র দ্বৈতবনে গিয়ে পাপী পাণ্ডবগণ আর সেখানকার ব্রাহ্মণগণকে নিমন্ত্রণ করে এস। দূতের বার্তা শুনে যুধিষ্ঠির বললেন, রাজা দুর্যোধন ভাগ্যবান তাই এই মহাযজ্ঞ করছেন, এতে তাঁর পূর্বপুরুষদের কীর্তি বৃদ্ধি পাবে। আমরাও তাঁর কাছে যাব বটে, কিন্তু এখন নয়, ত্রয়োদশ বর্ষ পূর্ণ হলে। ভীম বললেন, তের বৎসর পরে যখন যুদ্ধযজ্ঞে অস্ত্রশস্ত্রে অগ্নি প্রজ্বলিত হবে আর সেই অগ্নিতে দুর্যোধনকে ফেলা হবে তখন যুধিষ্ঠির যাবেন; যখন ধার্তরাষ্ট্ররা সেই যজ্ঞাগ্নিতে দগ্ধ হবে আর পাণ্ডবগণ তাতে ক্রোধরূপ হবি অর্পণ করবেন তখন আমি যাব; দূত, এই কথা দুর্যোধনকে জানিও।
যজ্ঞ সমাপ্ত হলে কয়েকজন বায়ুরোগগ্রস্ত লোক দুর্যোধনকে বললে, আপনার এই যজ্ঞ যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞের তুল্য হয় নি। কেউ বললে, ষোল কলার এক কলাও হয় নি। সুহৃদগণ বললেন, এই যজ্ঞ সকল যজ্ঞকে অতিক্রম করেছে। কর্ণ বললেন, রাজা, পাণ্ডবরা যুদ্ধে বিনষ্ট হলে তুমি রাজসূয় যজ্ঞ করবে। আমি যা বলছি শোন — যত দিন অর্জুন নিহত না হবে তত দিন আমি পা ধোব না, মাংস খাব না, সুরাপান করব না, কেউ কিছু চাইলে 'না' বলব না।