বনপর্ব: ৫৭। যক্ষ-যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নোত্তর
একদিন এক ব্রাহ্মণ যুধিষ্ঠিরের কাছে এসে বললেন, আমার অরণি আর মন্থ (১) গাছে টাঙ্গানো ছিল, এক হরিণ এসে তার শিঙে আটকে নিয়ে পালিয়ে গেছে। আপনারা তা উদ্ধার করে দিন যাতে আমাদের অগ্নিহোত্রের হানি না হয়। যুধিষ্ঠির তখনই তাঁর ভ্রাতাদের সঙ্গে হরিণের অন্বেষণে যাত্রা করলেন। তাঁরা হরিণকে দেখতে পেয়ে নানাপ্রকার বাণ নিক্ষেপ করলেন কিন্তু বিদ্ধ করতে পারলেন না। তার পর সেই হরিণকে আর দেখা গেল না। পাণ্ডবগণ শ্রান্ত হয়ে দুঃখিত-মনে বনমধ্যে এক বটগাছের শীতল ছায়ায় বসলেন।
নকুল বললেন, আমাদের বংশে কখনও ধর্মলোপ হয় নি, আলস্যের ফলে কোনও কার্য অসিদ্ধ হয় নি, আমরা কোনও প্রার্থীকে ফিরিয়ে দিই নি; কিন্তু আজ আমাদের শক্তির সম্বন্ধে সংশয় উপস্থিত হ’ল কেন? যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন, বিপদ কতপ্রকার হয় তার সীমা নেই, কারণও জানা যায় না; ধর্মই পাপপুণ্যের ফল ভাগ করে দেন। ভীম বললেন, দুঃশাসন দ্রৌপদীর অপমান করেছিল তথাপি তাকে আমি বধ করি নি, সেই পাপে আমাদের এই দশা হয়েছে। অর্জুন বললেন, সূতপুত্র কর্ণের তীক্ষ্ণ কটু বাক্য সহ্য করেছিলাম, তারই এই ফল। সহদেব বললেন, শকুনি যখন দ্যূতে জয়ী হয় তখন আমি তাকে হত্যা করি নি সেজন্য এমনে হয়েছে।
পাণ্ডবগণ তৃষার্ত হয়েছিলেন। যুধিষ্ঠিরের আদেশে নকুল বটগাছে উঠে চারিদিক দেখে জানালেন, জলের ধারে জন্মায় এমন অনেক গাছ দেখা যাচ্ছে, সারসের রবও শোনা যাচ্ছে, অতএব নিকটেই জল পাওয়া যাবে। যুধিষ্ঠির বললেন, তুমি শীঘ্র গিয়ে তূণে করে জল নিয়ে এস।
নকুল জলের কাছে উপস্থিত হয়ে পান করতে গেলেন, এমন সময়ে শুনলেন অন্তরীক্ষ থেকে কে বলছে— বৎস, এই জল আমার অধিকারে আছে, আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও তার পর পান করো। পিপাসার্ত নকুল সেই কথা অগ্রাহ্য করে জলপান করলেন এবং তখনই ভূপতিত হলেন।
নকুলের বিলম্ব দেখে যুধিষ্ঠির সহদেবকে পাঠালেন। সহদেবও আকাশ- বাণী শুনলেন এবং জলপান ক'রে ভূপতিত হলেন। তার পর যুধিষ্ঠির একে একে অর্জুন ও ভীমকে পাঠালেন, তাঁরাও পূর্ববৎ জলপান ক'রে ভূপতিত হলেন। ভ্রাতারা কেউ ফিরে এলেন না দেখে যুধিষ্ঠির উদ্বিগ্ন হয়ে সেই জনহীন মহাবনে প্রবেশ করলেন এবং এক স্বর্ণময়-পদ্মশোভিত সরোবর দেখতে পেলেন। সেই সরোবরের তীরে ধনুর্বাণ বিক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে এবং তাঁর ভ্রাতারা প্রাণহীন নিশ্চেষ্ট হয়ে পড়ে আছেন দেখে যুধিষ্ঠির শোকাকুল হয়ে বিলাপ করতে লাগলেন। ভ্রাতাদের গাত্রে অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন নেই, ভূমিতে অন্য কারও পদচিহ্ন নেই দেখে যুধিষ্ঠির ভাবলেন কোনও মহাপ্রাণী এ’দের বধ করেছে, অথবা দুর্যোধন বা শকুনি এই গুপ্তহত্যা করিয়েছে। যুধিষ্ঠির সরোবরে নেমে জলপান করতে গেলেন এমন সময় উপর থেকে শুনলেন — আমি মৎস্যশৈবালভোজী বক, আমিই তোমার ভ্রাতাদের পরলোকে পাঠিয়েছি। আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে যদি জলপান কর তবে তুমিও সেখানে যাবে। যুধিষ্ঠির বললেন, আপনি কোন্ দেবতা? মহাপর্বততুল্য আমার চার ভ্রাতাকে আপনি নিপাতিত করেছেন, আপনার অভিপ্রায় কি তা বুঝতে পারছি না, আমার অত্যন্ত ভয় হচ্ছে, কৌতূহলও হচ্ছে। ভগবান, আপনি কে? যুধিষ্ঠির এই উত্তর শুনলেন—আমি যক্ষ।
তখন তালবৃক্ষের ন্যায় মহাকায় বিকটাকার সূর্য ও অগ্নির ন্যায় তেজস্বী এক যক্ষ বককে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে মেঘগম্ভীরস্বরে বললেন, রাজা, আমি বহুবার বারণ করেছিলাম তথাপি তোমার ভ্রাতারা জলপান করতে গিয়েছিল, তাই তাদের মেরেছি। যুধিষ্ঠির, তুমি আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও তার পর জলপান ক'রো। যুধিষ্ঠির বললেন যক্ষ, তোমার অধিকৃত বস্তু আমি নিতে চাই না। তুমি প্রশ্ন কর, আমি নিজের বুদ্ধি অনুসারে উত্তর দেব।
তার পর যক্ষ একে একে অনেকগুলি প্রশ্ন করলেন, যুধিষ্ঠিরও তার উত্তর দিলেন। যক্ষ —
যক্ষ। কে সূর্যকে ঊর্ধ্বে রেখেছে? কে সূর্যের চতুর্দিকে ভ্রমণ করে? কে তাঁকে অস্তে পাঠায়? কোথায় তিনি প্রতিষ্ঠিত আছেন?
যুধিষ্ঠির। ব্রহ্ম সূর্যকে ঊর্ধ্বে রেখেছেন, দেবগণ তাঁর চতুর্দিকে বিচরণ করেন, ধর্ম তাঁকে অস্তে পাঠায়, সত্যে তিনি প্রতিষ্ঠিত আছেন।
য। ব্রাহ্মণের দেবত্ব কি কারণে হয়? কোন্ ধর্মের জন্য তাঁরা সাধু? তাঁদের মানুষভাব কেন হয়? অসাধুভাব কেন হয়?
যূ। বেদাধ্যয়নের ফলে তাঁদের দেবত্ব, তপস্যার ফলে সাধুতা; তাঁরা মরেন এজন্য তাঁরা মানুষ, পরনিন্দার ফলে তাঁরা অসাধু হন।
য। ক্ষত্রিয়ের দেবত্ব কি? সাধুধর্ম কি? মানুষভাব কি? অসাধুভাব কি?
যূ। অস্ত্রনিপুণতাই ক্ষত্রিয়ের দেবত্ব, যজ্ঞই সাধুধর্ম, ভয় মানুষভাব, শরণাগতকে পরিত্যাগই অসাধুভাব।
য। পৃথিবী অপেক্ষা গুরুতর কে? আকাশ অপেক্ষা উচ্চতর কে? বায়ু অপেক্ষা শীঘ্রতর কে? তৃণ অপেক্ষা বহুতর কে?
যূ। মাতা পৃথিবী অপেক্ষা গুরুতর, পিতা আকাশ অপেক্ষা উচ্চতর, মন বায়ু অপেক্ষা শীঘ্রতর, চিন্তা তৃণ অপেক্ষা বহুতর।
য। সুপ্ত হয়েও কে চক্ষু মুদ্রিত করে না? জন্মগ্রহণ করেও কে স্পন্দিত হয় না? কার হৃদয় নেই? বেগ দ্বারা কে বৃদ্ধি পায়?
যূ। মৎস্য নিদ্রাকালেও চক্ষু মুদ্রিত করে না, অণ্ড প্রসূত হয়েও স্পন্দিত হয় না, পাষাণর হৃদয় নেই, নদী বেগ দ্বারা বৃদ্ধি পায়।
য। প্রবাসী, গৃহবাসী, আতুর ও মুমূর্ষু—এদের মিত্র কারা?
যূ। প্রবাসীর মিত্র সঙ্গী, গৃহবাসীর মিত্র ভার্যা, আতুরের মিত্র চিকিৎসক, মুমূর্ষুর মিত্র দান।
য। কি ত্যাগ করলে লোকপ্রিয় হওয়া যায়? কি ত্যাগ করলে শোক হয় না? কি ত্যাগ করলে মানুষ ধনী হয়? কি ত্যাগ করলে সুখী হয়?
যূ। অভিমান ত্যাগ করলে লোকপ্রিয় হওয়া যায়, ক্রোধ ত্যাগ করলে শোক হয় না, কামনা ত্যাগ করলে লোকে ধনী হয়, লোভ ত্যাগ করলে সুখী হয়।
তার পর যক্ষ বললেন, বার্তা কি? আশ্চর্য কি? পন্থা কি? সুখী কে? আমার এই চার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে জলপান কর।
যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন,
অস্মিন্ মহামোহময়ে কটাহে
সূর্যাগ্নিনা রাত্রিদিনেন্ধনেন।
মাসর্তুদর্বী পরিঘট্টনেন
ভূতানি কালঃ পচতীতি বার্তা॥
— এই মহামোহরূপ কটাহে কাল প্রাণিসমূহকে পাক করছে, সূর্য তার অগ্নি, রাত্রিদিন তার ইন্ধন, মাস-ঋতু তার আলোড়নের দর্বী (হাতা); এই বার্তা।
অহন্যহনি ভূতানি গচ্ছন্তি যমমন্দিরম্। শেষাঃ স্থিরত্বমিচ্ছন্তি কিমাশ্চর্যামতঃ পরম্॥ — প্রাণিগণ প্রত্যহ যমালয়ে যাচ্ছে, তথাপি অবশিষ্ট সকলে চিরজীবী হ’তে চায়, এর চেয়ে আশ্চর্য কি আছে?
বেদাঃ বিভিন্নাঃ স্মৃতয়ো বিভিন্না নাসৌ মুনির্ষস্য মতং ন ভিন্নম্। ধর্মস্য তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াং মহাজনো যেন গতঃ স পন্থাঃ॥ —বেদ বিভিন্ন, স্মৃতি বিভিন্ন, এমন মুনি নেই যাঁর মত ভিন্ন নয়। ধর্মের তত্ত্ব গুহায় নিহিত, অতএব মহাজন (১) যাতে গেছেন তাই পন্থা।
দিবসস্যষ্টমে ভাগে শাকং পচতি যো নরঃ। অনৃণী চাপ্রবাসী চ স বারিচর মোদতে॥ — হে জলচর বক, যে লোক ঋণী ও প্রবাসী না হয়ে দিবসের অষ্টম ভাগে (সন্ধ্যাকলে) শাক রন্ধন করে সেই সুখী।
যক্ষ বললেন, তুমি আমার প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়েছ; এখন বল, পুরুষ কে? সর্বধনেশ্বর কে? যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন, দিবং স্পৃশতি দ্যুমিষ্ণু শব্দঃ পুণ্যেন কর্মণা। যাবৎ স শব্দো ভবতি তাবৎ পুরুষ উচ্যতে॥ তুল্যে প্রিয়াপ্রিয়ে যস্য সুখদুঃখে তথৈব চ। অতীতানাগতে চোভে স বৈ সর্বধনেশ্বরঃ॥ — পুণ্যকর্মের শব্দ (প্রশংসাবাদ) স্বর্গ ও পৃথিবী স্পর্শ করে; যত কাল সেই শব্দ থাকে তত কালই লোকে পুরুষরূপে গণ্য হয়। প্রিয়-অপ্রিয়, সুখ-দুঃখ, অতীত ও ভবিষ্যৎ যিনি তুল্য জ্ঞান করেন তিনিই সর্বধনেশ্বর।
যক্ষ বললেন, রাজা, তুমি এক ভ্রাতার নাম বল যাকে বাঁচাতে চাও। যুধিষ্ঠির বললেন, মহাবাহু নকুল জীবনলাভ করুন। যক্ষ বললেন, ভীমসেন তোমার প্রিয় এবং অর্জুন তোমার অবলম্বন; এদের ছেড়ে দিয়ে বৈমাত্র ভ্রাতা নকুলের জীবন চাচ্ছ কেন? যুধিষ্ঠির বললেন, যদি আমি ধর্ম নষ্ট করি তবে ধর্মই আমাকে বিনষ্ট করবেন। যক্ষ, কুন্তী ও মাদ্রী দু’জনেই আমার পিতার ভার্যা, এ’দের দু’জনেরই পুত্র থাকুক এই আমার ইচ্ছা, আমি দুই মাতাকেই তুল্য জ্ঞান করি। যক্ষ বললেন, ভরতশ্রেষ্ঠ, তুমি অর্থ ও কাম অপেক্ষা আনৃশংসতাই শ্রেষ্ঠ মনে কর, অতএব তোমার সকল ভ্রাতাই জীবনলাভ করুন।
ভীমাদি সকলেই গাত্রোত্থান করলেন, তাঁদের ক্ষুৎপিপাসা দূরে হ’ল। যুধিষ্ঠির যক্ষকে বললেন, আপনি অপরাজিত হয়ে এই সরোবরের তীরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আপনি কোন্ দেবতা? আমার এই মহাবীর ভ্রাতাদের নিপাতিত করতে পারেন এমন যোদ্ধা আমি দেখি না। এ’রা সুখে অক্ষতদেহে জাগরিত হয়েছেন। বোধ হয় আপনি আমাদের সুহৃৎ বা পিতা।
যক্ষ বললেন, বৎস, আমি তোমার জনক ধর্ম। তুমি বর চাও। যুধিষ্ঠির বললেন, যাঁর অরণি ও মন্থ হরিণ নিয়ে গেছে সেই ব্রাহ্মণের অগ্নিহোত্র যেন লুপ্ত না হয়। ধর্ম বললেন, তোমাকে পরীক্ষা করবার জন্য আমিই মৃগরূপে অরণি ও মন্থ হরণ করেছিলাম, এখন তা ফিরিয়ে দিচ্ছি। তুমি অন্য বর চাও। যুধিষ্ঠির বললেন, আমাদের দ্বাদশ বৎসর বনে অতিবাহিত হয়েছে, এখন ত্রয়োদশ বৎসর উপস্থিত। আমরা যেখানেই থাকি, কোনও লোক যেন আমাদের চিনতে না পারে। ধর্ম বললেন, তাই হবে, তোমরা নিজ রূপে বিচরণ করলেও কেউ চিনতে পারবে না। তোমরা ত্রয়োদশ বৎসর বিরাট রাজার নগরে অজ্ঞাত হয়ে থেকো, তোমরা যেমন ইচ্ছা সেইপ্রকার রূপ ধারণ করতে পারবে।
তার পর পাণ্ডবগণ আশ্রমে ফিরে গিয়ে ব্রাহ্মণকে অরণি ও মন্থ দিলেন।