বিরাটপর্ব: ৩। বিরাটভবনে যুধিষ্ঠিরাদির আগমন

বিরাট রাজার সভায় প্রথমে ব্রাহ্মণবেশী যুধিষ্ঠির উপস্থিত হলেন। তাঁর রূপ মেঘাবৃত সূর্য্য ও ভস্মাবৃত অগ্নির ন্যায়, তিনি বৈদূর্য্যখচিত স্বর্ণময় পাশক বস্ত্রাঞ্চলে বেঁধে বাহুমূলে ধারণ করে আছেন। তাঁকে দেখে বিরাট তাঁর সভাসদগণকে বললেন, ইনি কে? এঁকে ব্রাহ্মণ মনে হয় না, বোধ হয় ইনি কোনও রাজা; সঙ্গে গজ বাজি রথ না থাকলেও এঁকে ইন্দ্রের ন্যায় দেখাচ্ছে। যুধিষ্ঠির নিকটে এসে বললেন, মহারাজ, আমি বৈয়াঘ্ৰপদ্য-গোত্রীয় ব্রাহ্মণ, আমার সৰ্ব্বস্ব বিনষ্ট হয়েছে, জীবিকার জন্য আপনার কাছে এসেছি। পূৰ্ব্বে আমি যুধিষ্ঠিরের সখা ছিলাম। আমার নাম কঙ্ক, আমি দ্যূতক্রীড়ায় নিপুণ।

বিরাট বললেন, যা চাও তাই তোমাকে দেব, তুমি রাজা হবার যোগ্য, এই মৎস্যদেশ শাসন কর। দ্যূতকারগণ আমার প্রিয়, আমি তোমার বশবর্ত্তী হয়ে থাকব। যুধিষ্ঠির বললেন, মৎস্যরাজ, এই বর দিন যেন দ্যূতক্রীড়ায় নীচ লোকের সঙ্গে আমার বিবাদ না হয়, এবং আমি যাকে পরাজিত করব সে তার ধন আটকে রাখতে পারবে না। বিরাট বললেন, কেউ যদি তোমার অপ্রিয় আচরণ করে তবে আমি তাকে নিশ্চয় বধ করব, যদি সে ব্রাহ্মণ হয় তবে নির্বাসিত করব। সমাগত প্রজাবৃন্দ শোন — যেমন আমি তেমনই কঙ্ক এই রাজ্যের প্রভু। কঙ্ক, তুমি আমার সখা এবং আমার সমান, তুমি প্রচুর পানভোজন ও বস্ত্র পাবে, আমার ভবনের সকল দ্বার তোমার জন্য উদ্ঘাটিত থাকবে, ভিতরে বাইরে সর্বত্র তুমি পরিদর্শন করতে পারবে। কেউ যদি অর্থাভাবের জন্য তোমার কাছে কিছু প্রার্থনা করে তবে আমাকে জানিও, যা প্রয়োজন তাই আমি দান করব।

তার পর সিংহবিক্রম ভীম এলেন, তাঁর পরিধানে কৃষ্ণ বস্ত্র, হাতে খান্তা হাতা ও কোষমৃদু কৃষ্ণবর্ণ অসি। বিরাট সভাস্থ লোকেদের জিজ্ঞাসা করলেন, সিংহের ন্যায় উন্নতস্কন্ধ অতি রূপবান কে এই যুবা? ভীম কাছে এসে বিনীতবাক্যে বললেন, মহারাজ, আমি পাচক, আমার নাম বল্লব, আমি উত্তম ব্যঞ্জন রাঁধতে পারি, পূর্বে রাজা যুধিষ্ঠির আমার প্রস্তুত সূপ প্রভৃতি ভোজন করতেন। আমার তুল্য বলবানও কেউ নেই, আমি বাহুযুদ্ধে পটু, হস্তী ও সিংহের সঙ্গে যুদ্ধ ক’রে আমি আপনাকে তুষ্ট করব। বিরাট বললেন, তোমাকে আমি পাকশালার কর্মে নিযুক্ত করলাম, সেখানে যেসব পাচক আছে তুমি তাদের অধ্যক্ষ হবে। কিন্তু এই কর্ম তোমার উপযুক্ত নয়, তুমি আসমুদ্র পৃথিবীর রাজা হবার যোগ্য।

অসিতনয়না দ্রৌপদী তাঁর কুঞ্চিত কেশপাশ মস্তকের দক্ষিণ পার্শ্বে তুলে কৃষ্ণবর্ণ পরিধেয় বস্ত্র দিয়ে আবৃত ক’রে বিচরণ করছিলেন। বিরাট রাজার মহিষী কেকয়রাজকন্যা সুদেষ্ণা প্রাসাদের উপর থেকে দেখতে পেয়ে তাঁকে ডেকে আনলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, ভদ্রে, তুমি কে, কি চাও? দ্রৌপদী উত্তর দিলেন, রাজ্ঞী, আমি সৈরিন্ধ্রী, যিনি আমাকে পোষণ করবেন আমি তাঁর কর্ম করব। সুদেষ্ণা বললেন, ভাবিনী, তুমি নিজেই দাসদাসীকে আদেশ দেবার যোগ্য। তোমার পায়ের গ্রন্থি উচ্চ নয়, দুই ঊরু ঠেকে আছে, তোমার নাভি কণ্ঠস্বর ও স্বভাব নিম্ন, স্তন নিতম্ব ও নাসিকা উন্নত, পদতল করতল ও ওষ্ঠ রক্তবর্ণ, তুমি হংসগদ্গদভাষিণী, সুকেশী সুস্তনী। তুমি কাশ্মীরী তুরঙ্গমীর ন্যায় সুদর্শনা। তুমি কে? যক্ষী দেবী গন্ধর্বী না অপ্সরা?

দ্রৌপদী বললেন, সত্য বলছি আমি সৈরিন্ধ্রী। কেশসংস্কার, চন্দনাদি পেষণ, বিচিত্র মালারচনা প্রভৃতি কর্ম জানি। আমি পূর্বে কৃষ্ণের প্রিয়া ভার্যা সত্যভামা এবং পাণ্ডবমহিষী কৃষ্ণার পরিচর্যা করতাম। তাঁদের কাছে আমি উত্তম খাদ্য ও প্রয়োজনীয় বসন পেতাম। দেবী সত্যভামা আমার নাম মালিনী রেখেছিলেন। সুদেষ্ণা বললেন, রাজা যদি তোমার প্রতি লুব্ধ না হন তবে আমি তোমাকে মাথায় ক’রে রাখব। এই রাজভবনে যেসকল নারী আছে তারা একদৃষ্টিতে তোমাকে দেখছে, পুরুষরা মোহিত হবে না কেন? এখানকার বৃক্ষগুলিও যেন তোমাকে নমস্কার করছে। সুন্দরী, তোমার অলৌকিক রূপ দেখলে বিরাট রাজা আমাকে ত্যাগ ক'রে সর্বান্তঃকরণে তোমাতেই আসক্ত হবেন। কর্কটকী (স্ত্রী-কাঁকড়া) যেমন নিজের মরণের নিমিত্তই গর্ভধারণ করে, তোমাকে আশ্রয় দেওয়া আমার পক্ষে সেইরূপ। দ্রৌপদী বললেন, বিরাট রাজা বা অন্য কেউ আমাকে পাবেন না, কারণ পাঁচজন মহাবলশালী গন্ধর্ব যুবা আমার স্বামী, তাঁরা সর্বদা আমাকে রক্ষা করেন। আমি এখন ব্রতপালনের জন্যই কষ্ট স্বীকার করছি। যিনি আমাকে উচ্ছিষ্ট দেন না এবং আমাকে দিয়ে পা ধোয়ান না তাঁর উপর আমার গন্ধর্ব পতিরা তুষ্ট হন। যে পুরুষ সামান্য স্ত্রীর ন্যায় আমাকে কামনা করে সে সেই রাত্রিতেই পরলোকে যায়। সুদেষ্ণা বললেন, আনন্দদায়িনী, তুমি যেমন চাও সেই ভাবেই তোমাকে রাখব, কারও চরণ বা উচ্ছিষ্ট তোমাকে স্পর্শ করতে হবে না।

তার পর সহদেব গোপবেশ ধারণ ক'রে বিরাটের সভায় এলেন। রাজা বললেন, বৎস, তুমি কে, কোথা থেকে আসছ, কি চাও? সহদেব গোপভাষায় গম্ভীরস্বরে উত্তর দিলেন, আমি অরিষ্টনেমি নামক বৈশ্য, পূর্বে পাণ্ডবদের গোপরীক্ষক ছিলাম। তাঁরা এখন কোথায় গেছেন জানি না, আমি আপনার কাছে থাকতে চাই। যুধিষ্ঠিরের বহু লক্ষ গাভী ও বহু সহস্র বৃষ ছিল, আমি তাদের পরীক্ষা করতাম। লোকে আমাকে তন্তিপাল বলত। আমি দশযোজনব্যাপী গরুর দলও গণনা করতে এবং তাদের ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান বলতে পারি, যে উপায়ে গোবংশের বৃদ্ধি হয় এবং রোগ না হয় তাও জানি। আমি সুলক্ষণ বৃষ চিনতে পারি যাদের মূত্র আঘ্রাণ করলে বন্ধ্যাও প্রসব করে। বিরাট বললেন, আমার বিভিন্ন জাতীয় এক এক লক্ষ পশু আছে। সেই সমস্ত পশুর ভার তোমার হাতে দিলাম, তাদের পালকগণও তোমার অধীন থাকবে।

তার পর সভাস্থ সকলে দেখলেন, একজন রূপবান বিশালকায় পুরুষ আসছেন, তাঁর কর্ণে দীর্ঘ কুণ্ডল, হস্তে শঙ্খ ও সুবর্ণ নির্মিত বলয়, কেশরাশি উন্মুক্ত। নপুংসকবেশী অর্জুনকে বিরাট বললেন, তুমি হস্তিযূথপতির ন্যায় বলবান সুদর্শন যুবা, অথচ বাহুতে বলয় এবং কর্ণে কুণ্ডল প’রে বেণী উন্মুক্ত ক’রে এসেছ। যদি রথে চড়ে যোদ্ধার বেশে কবচ ও ধনুর্বাণ ধারণ ক’রে আসতে তবেই তোমাকে মানাত। তোমার মত লোক ক্লীব হতে পারে না এই আমার বিশ্বাস। আমি বৃদ্ধ হয়েছি, রাজ্যভার থেকে মুক্তি চাই, তুমিই এই মৎস্যদেশ শাসন কর।

অর্জুন বললেন, মহারাজ, আমি নৃত্য-গীত-বাদ্যে নিপুণ, আপনার কন্যা উত্তরার শিক্ষার ভার আমাকে দিন। আমার এই ক্লীবরূপ কেন হয়েছে সেই দুঃখময় বৃত্তান্ত আপনাকে পরে বলব। আমার নাম বৃহন্নলা, আমি পিতৃমাতৃহীন, আমাকে আপনার পুত্র বা কন্যা জ্ঞান করবেন। রাজা বললেন, বৃহন্নলা, তোমার অভীষ্ট কর্মের ভার তোমাকে দিলাম, তুমি আমার কন্যা এবং অন্যান্য কুমারীদের নৃত্যাদি শেখাও। অনন্তর বিরাট রাজা অর্জুনের ক্লীবত্ব সম্বন্ধে নিঃসন্দহ হয়ে তাঁকে অন্তঃপুরে পাঠিয়ে দিলেন। অর্জুন রাজকন্যা উত্তরা ও তাঁর সহচরীদের নৃত্য-গীত-বাদ্য শিখিয়ে এবং প্রিয়কার্য করে তাঁদের প্রীতিভাজন হলেন।

তার পর আকাশচ্যুত সূর্যের ন্যায় নকুলকে আসতে দেখে মৎস্যরাজ বিরাট বললেন, এই দেবতুল্য পুরুষটি কে? এ সাগ্রহে আমার অশ্বসকল দেখছে, নিশ্চয় এই লোক অশ্বতত্ত্বজ্ঞ। রাজার কাছে এসে নকুল বললেন, মহারাজের জয় হোক, সভাস্থ সকলের শুভ হোক। আমি যুধিষ্ঠিরের অশ্বদলের তত্ত্বাবধান করতাম, আমার নাম গ্রন্থিক। অশ্বের স্বভাব, শিক্ষাপ্রণালী, চিকিৎসা এবং দুষ্ট অশ্বের সংশোধন আমার জানা আছে। বিরাট বললেন, আমার যত অশ্ব আছে সে সকলের তত্ত্বাবধানের ভার তোমাকে দিলাম, সারথি প্রভৃতিও তোমার অধীন হবে। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন যুধিষ্ঠিরের দর্শন পেয়েছি। ভৃত্যের সাহায্য বিনা তিনি এখন কি ক’রে বনে বাস করছেন?

সাগর পর্যন্ত পৃথিবীর যাঁরা অধিপতি ছিলেন সেই পাণ্ডবগণ এইরূপে কষ্ট স্বীকার ক’রে মৎস্যরাজ্যে অজ্ঞাতবাস করতে লাগলেন।