বিরাটপর্ব: ৬। কীচকের পদাঘাত
দ্রৌপদীকে দেখে কীচক আনন্দে ব্যস্ত হয়ে উঠে বললেন, সুকেশী, আজ আমার সুপ্রভাত, তুমি আমার অধীশ্বরী, তোমাকে সুবর্ণহার শাঁখা কুণ্ডল কেয়ূর মণিরত্ন ও কৌষেয় বস্ত্রাদি দেব। তোমার জন্য দিব্য শয্যা প্রস্তুত আছে, সেখানে চল, আমার সঙ্গে মধুমাধবী (মধুজাত মদ্য) পান কর। দ্রৌপদী বললেন, রাজমহিষী আমাকে সুরা আনবার জন্য পাঠিয়েছেন। কীচক বললেন, দাসীরা তা নিয়ে যাবে। এই বলে তিনি দ্রৌপদীর হাত এবং উত্তরীয় বস্ত্র ধরলেন, দ্রৌপদী ঠেলা দিয়ে তাঁকে সরিয়ে দিলেন। কীচক সবলে আবার ধরলেন, দ্রৌপদী কম্পিতদেহে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে প্রবল ধাক্কা দিলেন, পাপাত্মা কীচক ভূমিতে পড়ে গেল। দ্রৌপদী দ্রুতবেগে বিরাট রাজার সভায় এলেন, কীচক সঙ্গে সঙ্গে এসে রাজন্য সমক্ষেই দ্রৌপদীর কেশাকর্ষণ ক'রে তাঁকে পদাঘাত করলেন। তখন সেই সূর্যদত্ত রাক্ষস বায়ুবেগে ধাবিত হয়ে কীচককে আঘাত করলে, কীচক ঘুরতে ঘুরতে ছিন্নমূল বৃক্ষের ন্যায় ভূপতিত হলেন।
রাজসভার যুধিষ্ঠির ও ভীম উপস্থিত ছিলেন। দ্রৌপদীর অপমান দেখে কীচককে বধ করবার ইচ্ছায় ভীম দন্তে দন্ত ঘর্ষণ করতে লাগলেন। পাছে লোক তাঁদের জেনে ফেলে এই ভয়ে যুধিষ্ঠির নিজের অঙ্গুষ্ঠ ভীমের অঙ্গুষ্ঠে ঠেকিয়ে তাঁকে নিবারণ করলেন। দ্রৌপদী তাঁদের দিকে একবার দৃষ্টিপাত ক'রে রোদনয়নে বিরাট রাজাকে যেন দগ্ধ ক'রে বললেন, যাদের শত্রু বহু দূরদেশে বাস ক'রেও ভয়ে নিদ্রা যায় না, তাদেরই আমি মানিনী ভার্যা, সেই আমাকে সূতপুত্র পদাঘাত করেছে! যাঁরা শরণাপন্নকে রক্ষা করেন সেই মহারথগণ আজ কোথায় আছেন? বিরাট যদি কীচককে ক্ষমা ক'রে ধর্ম নষ্ট করেন তবে আমি কি করতে পারি? রাজা, আপনি কীচকের প্রতি রাজবৎ আচরণ করছেন না, আপনার ধর্ম দস্যুর ধর্ম, তা এই রাজসভায় শোভা পাচ্ছে না। কীচক ধর্মজ্ঞ নয়, মৎস্যরাজও ধর্মজ্ঞ নন, যে সভাসদ্গণ তাঁর অনুবর্তী তাঁরাও ধর্মজ্ঞ নন।
সাস্রুনয়না দ্রৌপদীর তিরস্কার শুনে বিরাট বললেন, সৈরিন্ধ্রী, আমার অজ্ঞাতে তোমাদের কি বিবাদ হয়েছে তা আমি জানি না। তথ্য না জেনে আমি কি ক'রে বিচার করব? সভাসদ্গণ দ্রৌপদীর প্রশংসা এবং কীচকের নিন্দা করতে লাগলেন। তাঁরা বললেন, এই সর্বাঙ্গসুন্দরী যাঁর ভার্যা তিনি মহাভাগ্যবান। এরূপ বরবর্ণিনী মর্ত্যলোকে সুলভ নয়, বোধ হয় ইনি দেবী।
ক্রোধে যুধিষ্ঠিরের ললাট ঘর্মাক্ত হ’ল। তিনি বললেন, সৈরিন্ধ্রী, তুমি এখানে থেকো না, দেবী সুদেষ্ণার গৃহে যাও। আমার মনে হয় তোমার গন্ধর্ব পতিদের বিবেচনার এই কাল ক্রোধের উপযুক্ত নয়, নতুবা তাঁরা প্রতিশোধের জন্য দ্রুতবেগে উপস্থিত হতেন। তুমি আর এখানে নটীর ন্যায় রোদন করো না, তাতে এই রাজসভায় যাঁরা দ্যূতক্রীড়া করছেন তাঁদের বিঘ্ন হবে। তুমি যাও, গন্ধর্বগণ তোমার দুঃখ দূর করবেন।
দ্রৌপদী বললেন, যাঁদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ধৃতসত্ত্ব সেই অতীব দয়ালুদের জন্যই আমাকে ব্রতচারিণী হ’তে হয়েছে। আমার অপমানকারীদের বধ করাই তাঁদের উচিত ছিল। দ্রৌপদী অন্তঃপুরে চলে গেলেন। তাঁর রোদনের কারণ শুনে সুদেষ্ণা বললেন, সুকেশী, আমার কথাতেই তুমি কীচকের কাছে সুরা আনতে গিয়ে অপমানিত হয়েছ, যদি চাও তবে তাকে প্রাণদণ্ড দেওয়াব। দ্রৌপদী বললেন, কীচক যাঁদের কাছে অপরাধী তাঁরাই তাকে বধ করবেন, সে আজই পরলোকে যাবে।
দ্রৌপদী নিজের বাসগৃহে গিয়ে গাত্র ও বস্ত্র ধুয়ে ফেললেন। তিনি দুঃখে কাতর হয়ে স্থির করলেন, ভীম ভিন্ন আর কেউ তাঁর প্রিয়কার্য করতে পারবেন না। রাত্রিকালে তিনি শয্যা থেকে উঠে ভীমের গৃহে গেলেন, এবং দুর্গম বনে সিংহী যেমন সিংহকে আলিঙ্গন করে সেইরূপ ভীমকে আলিঙ্গন ক'রে বললেন, ভীমসেন, ওঠ ওঠ, মৃতের ন্যায় শুয়ে আছ কেন? যে জীবিত, তার ভার্যাকে স্পর্শ ক'রে কোনও পাপী বাঁচতে পারে না। পাপিষ্ঠ সেনাপতি কীচক আমাকে পদাঘাত ক'রে এখনও বেঁচে আছে, তুমি কি ক'রে নিদ্রা যাচ্ছ?
ভীম জেগে উঠে বললেন, তুমি ব্যস্ত হয়ে কেন এসেছ? সুখ দুঃখ প্রিয় অপ্রিয় যা ঘটেছে সব বল। কৃষ্ণা, তুমি সর্ব কর্মে আমাকে বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে সর্বদা বিপদ থেকে মুক্ত করব। তোমার বক্তব্য বলে শীঘ্রই নিজ গৃহে চ'লে যাও, যাতে কেউ জানতে না পারে।