বিরাটপর্ব: ৭। ভীমের নিকট দ্রৌপদীর বিলাপ
দ্রৌপদী বললেন, যুধিষ্ঠির যার স্বামী সে শোক পাবেই। তুমি আমার সব দুঃখ জান, তবে আবার জিজ্ঞাসা করছ কেন? দ্যূতসভায় দুঃশাসন সকলের সমক্ষে আমাকে দাসী বলেছিল, সেই স্মৃতি আমাকে দগ্ধ করছে। বনবাসকালে সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ আমার চুল ধ’রে টেনেছিল, কে তা সইতে পারে? আজ মৎস্যরাজের সমক্ষেই কীচক আমাকে পদাঘাত করেছে, সেই অপমানের পর আমার ন্যায় কোন্ নারী জীবিত থাকতে পারে? বিরাট রাজার সেনাপতি ও শ্যালক দুর্মতি কীচক সর্বদা আমাকে বলে—তুমি আমার ভার্যা হও। ভীম, তোমার দ্যূতাসক্ত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার জন্যই আমি অনন্ত দুঃখ ভোগ করছি। তিনি যদি সহস্র স্বর্ণমুদ্রা বা স্বর্ণ রৌপ্য বস্ত্র যান অশ্বাদি পশু পণ রাখতেন তবে বহু বৎসর দিবারাত্র খেললেও নিঃস্ব হতেন না। তিনি খেলায় প্রমত্ত হয়ে ঐশ্বর্য হারিয়েছেন, এখন মৃগের ন্যায় নীরব হয়ে আছেন, মৎস্যরাজের পরিচারক হয়ে নরকভোগ করছেন। তুমি পাচক হয়ে বিরাটের সেবা কর দেখলে আমার মন অবসন্ন হয়। সুদেষ্ণার সমক্ষে তুমি সিংহ-ব্যাঘ্র-মহিষের সঙ্গে যুদ্ধ কর, তা দেখলে আমি মোহগ্রস্ত হই। আমার সেই অবস্থা দেখে তিনি তাঁর সখিনীদের বলেন, এক স্থানে বাস করার ফলে এই সৈরিন্ধ্রী পাচক বল্লবের প্রতি অনুরক্ত হয়েছে, সেজন্য তাকে হিংস্র পশুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে দেখলে শোকার্ত হয়; স্ত্রীলোকের মন দুজ্ঞেয়, তবে এরা দুজনেই সুন্দর এবং পরস্পরের যোগ্য। দেব দানব ও নাগগণের বিজেতা অর্জুন এখন নপুংসক সেজে শাঁখা আর কুণ্ডল প’রে বেণী ঝুলিয়ে কন্যাদের নৃত্য শেখাচ্ছেন। যাঁকে যত্ন করবার ভার কুন্তী আমাকে দিয়েছিলেন, সেই সদ্স্বভাব লজ্জাশীল মিষ্টভাষী সহদেব রক্তবসন পরে গোপগণের অগ্রণী হয়ে বিরাটকে অভিবাদন করছেন এবং রাত্রিকালে গোবৎসের চর্মের উপর শুয়ে নিদ্রা যাচ্ছেন। রূপবান বুদ্ধিমান অস্ত্রবিশারদ নকুল এখন রাজার অশ্বরক্ষক হয়েছেন। দ্যূতাসক্ত যুধিষ্ঠিরের জন্যই আমি সৈরিন্ধ্রী হয়ে সুদেষ্ণার শৌচকার্যের সহায় হয়েছি। পাণ্ডবগণের মহিষী এবং দ্রুপদের দুহিতা হয়েও আমি এই দুর্দশায় পড়েছি। কুন্তী ভিন্ন আর কারও জন্য আমি চন্দনাদি পেষণ করি নি। নিজের জন্যও নয়, এখন আমার দুই হাতে কত কড়া পড়েছে দেখ। কুন্তী বা তোমাদের কাউকেও আমি ভয় করি নি, এখন কিঙ্করী হয়ে আমাকে বিরাটের সম্মুখে সলজ্জে দাঁড়াতে হয়—আমার প্রস্তুত বিলেপন তিনি ভাল বলবেন কিনা এই সংশয়ে; অন্যের পেষা চন্দন আবার তাঁর রোচে না। ভীম, আমি দেবতাদের অপ্রিয় কোনও কার্য করি নি, আমার মরা উচিত, অভাগিনী ব'লেই বেঁচে আছি।
শোকবিহ্বলা দ্রৌপদীর হাত ধ'রে ভীম সজলনয়নে বললেন, ধিক্ আমার বাহুবল, ধিক্ অর্জুনের গাণ্ডীব, তোমার রক্তাভ করযুগলে কড়া পড়েছে তাও দেখতে হ'ল! আমি সভামধ্যেই বিরাটের নিগ্রহ করতাম, পদাঘাতে কীচকের মস্তক চূর্ণ করতাম, মৎস্যরাজের লোকদেরও শাস্তি দিতাম, কিন্তু ধর্মরাজ কটাক্ষ ক'রে আমাকে নিবারণ করলেন। কল্যাণী, তুমি আর অর্দ্ধমাস কষ্ট সয়ে থাক, তার পর ত্রয়োদশ বর্ষ পূর্ণ হ'লে তুমি রাজাদের রাণী হবে।
দ্রৌপদী বললেন, আমি দুঃখ সইতে না পেরেই অশ্রুমোচন করছি, রাজা যুধিষ্ঠিরকে তিরস্কার করা আমার উদ্দেশ্য নয়। পাছে বিরাট আমার রূপে অভিভূত হন এই আশঙ্কায় সুদেষ্ণা উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন, তা জেনে এবং নিজের দুর্ব্বুদ্ধিবলে দুরাত্মা কীচক আমাকে প্রার্থনা করছে। তোমরা যদি কেবল অজ্ঞাতবাসের প্রতিজ্ঞা পালনেই রত থাক, তবে আমি আর তোমাদের ভার্য্যা থাকব না। মহাবল ভীমসেন, তুমি জটাসুরের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করেছিলে, জয়দ্রথকে জয় করেছিলে, এখন আমার অপমানকারী পাপিষ্ঠ কীচককে বধ কর, প্রস্তরের উপর মৎকুণের ন্যায় তার মস্তক চূর্ণ কর। সে জীবিত থাকতে যদি সূর্যোদয় হয় তবে আমি বিষ আলোড়ন ক'রে পান করব, তার বশীভূত হব না। এই ব'লে দ্রৌপদী ভীমের বক্ষে লগ্ন হয়ে কাঁদতে লাগলেন।