বিরাটপর্ব: ১৫। অর্জ্জুন ও উত্তরের প্রত্যাবর্ত্তন — বিরাটের পুত্রগর্ব্ব

যেসকল কৌরবসৈন্য পালিয়ে গিয়ে বনে লুকিয়েছিল তারা ক্ষুধাতৃষ্ণায় কাতর হয়ে কম্পিতদেহে অর্জুনকে প্রণাম ক'রে বললে, পাৰ্থ, আমরা এখন কি করব? অর্জুন তাদের আশ্বাস দিয়ে বললেন, তোমাদের মঙ্গল হ'ক, তোমরা নির্ভয়ে প্রস্থান কর। তারা অর্জুনের আয়ু, কীৰ্ত্তি ও যশ বৃদ্ধির আশীর্বাদ করে চ'লে গেল।

অর্জুন উত্তরকে বললেন, বৎস, তুমি রাজধানীতে গিয়ে তোমার পিতার নিকট এখন আমাদের পরিচয় দিও না, তা হ'লে তিনি ভয়ে প্রাণত্যাগ করবেন। তুমি নিজেই যুদ্ধ ক'রে কৌরবদের পরাস্ত করেছ এবং গোধন উদ্ধার করেছ এই কথা ব'লো। উত্তর বললেন, সব্যসাচী, আপনি যা করেছেন তা আর কেউ পারে না, আমার তো সে শক্তি নেইই। তথাপি আপনি আদেশ না দিলে আমি পিতাকে প্রকৃত ঘটনা জানাব না।

অর্জুন বিক্ষতদেহে শ্মশানে শমীবৃক্ষের নিকটে এলেন। তখন তাঁর ধ্বজস্থিত মহাকপি ও ভূতগণ আকাশে চ’লে গেল, দৈবী মায়াও অন্তর্হিত হ’ল। উত্তর রথের উপরে পূর্বের ন্যায় সিংহধ্বজ বসিয়ে দিলেন এবং পাণ্ডবগণের অস্ত্রাদি শমীবৃক্ষে রেখে রথ চালালেন। নগরের পথে এসে অর্জুন বললেন, রাজপুত্র, দেখ, গোপালকগণ তোমাদের সমস্ত গরু ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা এখানে অশ্বদের স্নান করিয়ে জল খাইয়ে বিশ্রামের পর অপরাহ্নে বিরাটনগরে যাব। তুমি কয়েকজন গোপকে ব’লে দাও তারা শীঘ্র নগরে গিয়ে তোমার জয় ঘোষণা করুক। অর্জুন আবার বৃহন্নলার বেশ ধারণ করলেন এবং অপরাহ্নে উত্তরের সারথি হয়ে নগরে যাত্রা করলেন।

ওদিকে বিরাট রাজা ত্রিগর্তদের পরাজিত ক’রে চার জন পাণ্ডবের সঙ্গে রাজধানীতে ফিরে এলেন। তিনি শুনলেন, কৌরবরা রাজ্যের উত্তর দিকে এসে গোধন হরণ করেছে, রাজকুমার উত্তর বৃহন্নলাকে সঙ্গে নিয়ে ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ কর্ণ দুর্যোধন ও অশ্বত্থামার সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেছেন। বিরাট অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁর সৈন্যদলকে বললেন, তোমরা শীঘ্র গিয়ে দেখ কুমার জীবিত আছেন কিনা; নপুংসক যার সারথি তার বাঁচা অসম্ভব মনে করি। যুধিষ্ঠির সহাস্যে বললেন, মহারাজ, বৃহন্নলা যদি সারথি হয় তবে শত্রুরা আপনার গোধন নিতে পারবে না, তার সাহায্যে আপনার পুত্র কৌরবগণকে এবং দেবসুর প্রভৃতিকেও জয় করতে পারবেন।

এমন সময় উত্তরের দূতরা এসে বিজয়সংবাদ দিলে। বিরাট আনন্দে রোমাঞ্চিত হয়ে মন্ত্রীদের আজ্ঞা দিলেন, রাজমার্গ পতাকা দিয়ে সাজাও, দেবতাদের পূজা দাও, কুমারগণ যোদ্ধৃগণ ও সালঙ্কারা গণিকাগণ বাদ্যসহকারে আমার পুত্রের প্রত্যুদগমন করুক, হস্তীর উপরে ঘণ্টা বাজিয়ে সমস্ত চতুষ্পথে আমার জয় ঘোষণা করা হ’ক, উত্তম বেশভূষায় সজ্জিত হয়ে বহু কুমারীদের সঙ্গে উত্তরা বৃহন্নলাকে আনতে যাক। তার পর বিরাট বললেন, সৈরিন্ধ্রী, পাশা নিয়ে এস; কক্ষক, খেলবে এস। যুধিষ্ঠির বললেন, মহারাজ, শুনেছি হৃষ্ট অবস্থায় দ্যূতক্রীড়া অনিষ্টকর। দ্যূতে বহু দোষ, তা বর্জন করাই ভাল। পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠিরের কথা শুনে থাকবেন, তিনি তাঁর বিশাল রাজ্য এবং দেবতুল্য ভ্রাতাদেরও দ্যূতক্রীড়ায় হারিয়েছিলেন। তবে আপনি যদি নিতান্ত ইচ্ছা করেন তবে খেলব।

খেলতে খেলতে বিরাট বললেন, দেখ, আমার পুত্র কৌরববীরগণকেও জয় করেছে। যুধিষ্ঠির বললেন, বৃহন্নলা যার সারথি সে জয়ী হবে না কেন। বিরাট ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, নীচ ব্রাহ্মণ, তুমি আমার পুত্রের সমান জ্ঞান ক’রে একটা নপুংসকের প্রশংসা করছ, কি বলতে হয় তা তুমি জান না, আমার অপমান করছ। নপুংসক কি ক’রে ভীষ্মদ্রোণাদিকে জয় করতে পারে? তুমি আমার বয়স্য সেজন্য অপরাধ ক্ষমা করলাম, যদি বাঁচতে চাও তবে আর এমন কথা বলো না। যুধিষ্ঠির বললেন, মহারাজ, ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ প্রভৃতি মহারথগণের সঙ্গে বৃহন্নলা ভিন্ন আর কে যুদ্ধ করতে পারেন? ইন্দ্রাদি দেবগণও পারেন না। বিরাট বললেন, বহুবার নিষেধ করলেও তুমি বাক্য সংযত করছ না; শাসন না করলে কেউ ধর্মপথে চলে না। এই বলে বিরাট অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে যুধিষ্ঠিরের মুখে পাশা দিয়ে আঘাত করলেন। যুধিষ্ঠিরের নাক দিয়ে রক্ত পড়তে লাগল, তিনি হাত দিয়ে তা ধ’রে দ্রৌপদীর দিকে চাইলেন। দ্রৌপদী তখনই একটি জলপূর্ণ স্বর্ণপাত্র এনে নিঃসৃত রক্ত ধরলেন। এই সময়ে দ্বারপাল এসে সংবাদ দিলে যে রাজপুত্র উত্তর এসেছেন, তিনি বৃহন্নলার সঙ্গে দ্বারে অপেক্ষা করছেন। বিরাট বললেন, তাঁদের শীঘ্র নিয়ে এস।

অর্জুনের এই প্রতিজ্ঞা ছিল যে কোনও লোক যদি যুদ্ধ ভিন্ন অন্য কারণে যুধিষ্ঠিরের রক্তপাত করে তবে সে জীবিত থাকবে না। এই প্রতিজ্ঞা স্মরণ করে যুধিষ্ঠির দ্বারপালকে বললেন, কেবল উত্তরকে নিয়ে এস বৃহন্নলাকে নয়। উত্তর এসে পিতাকে প্রণাম ক’রে দেখলেন, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এক প্রান্তে ভূমিতে বসে আছেন, তাঁর নাসিকা রক্তাক্ত, দ্রৌপদী তাঁর কাছে রয়েছেন। উত্তর ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, মহারাজ, কে এই পাপকার্য করেছে? বিরাট বললেন আমি এই কুটিলকে প্রহার করেছি, এ আরও শাস্তির যোগ্য; তোমার প্রশংসাকালে এ একটা নপুংসকের প্রশংসা করছিল। উত্তর বললেন, মহারাজ, আপনি অকার্য করেছেন, শীঘ্র এ’কে প্রসন্ন করুন, ইনি যেন ব্রহ্মশাপে আপনাকে সবংশে দগ্ধ না করেন। পুত্রের কথায় বিরাট যুধিষ্ঠিরের নিকট ক্ষমা চাইলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, রাজা, আমি পূর্বেই ক্ষমা করেছি, আমার ক্রোধ নেই। যদি আমার রক্ত ভূমিতে পড়ত তবে আপনি রাজ্য সমেত বিনষ্ট হতেন।

যুধিষ্ঠিরের রক্তস্রাব থামলে অর্জুন এলেন এবং প্রথমে রাজাকে তাঁর পর যুধিষ্ঠিরকে অভিবাদন করলেন। বৃহন্নলাবেশী অর্জুনকে শুনিয়ে শুনিয়ে বিরাট তাঁর পুত্রকে বললেন, বৎস, তোমার তুল্য পুত্র আমার হয় নি, হবেও না। মহাবীর কর্ণ, কালাগ্নির ন্যায় দুঃসহ ভীষ্ম, ক্ষত্রিয়গণের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য, তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা, বিপক্ষের ভয়প্রদ কৃপাচার্য, মহাবল দুর্যোধন —এদের সঙ্গে তুমি কি ক’রে যুদ্ধ করলে? এইসকল নরশ্রেষ্ঠকে পরাজিত ক’রে তুমি গোধন উদ্ধার করেছ, যেন শার্দূলের কবল থেকে মাংস কেড়ে এনেছ।

উত্তর বললেন, আমি গোধন উদ্ধার করি নি, শত্রুঞ্জয়ও করি নি। আমি ভয় পেয়ে পালাচ্ছিলাম, এক দেবপুত্র আমাকে নিবারণ করলেন। তিনিই রথে উঠে ভীষ্মাদি ছয় রথীকে পরাস্ত ক'রে গোধন উদ্ধার করেছেন। সিংহের ন্যায় দৃপ্তকায় সেই যুবা কৌরবগণকে উপহাস ক'রে তাঁদের বসন হরণ করেছেন। বিরাট বললেন, সেই মহাবাহু দেবপুত্র কোথায়? উত্তর বললেন, পিতা, তিনি অন্তর্হিত হয়েছেন, বোধ হয় কাল বা পরশু দেখা দেবেন।

বৃহন্নলাবেশী অর্জুন বিরাটের অনুমতি নিয়ে তাঁর কন্যা উত্তরাকে কৌরবগণের মহার্ঘ বিচিত্র সূক্ষ্ম বসনগুলি দিলেন। তার পর তিনি নির্জনে উত্তরের সঙ্গে মন্ত্রণা ক'রে যুধিষ্ঠিরাদির আত্মপ্রকাশের উদ্যোগ করলেন।