বিরাটপর্ব: ১৪। কৌরবগণের পরাজয়

দ্রোণ বললেন, অর্জুনের ধ্বজাগ্র দূর থেকে দেখা যাচ্ছে, তাঁর শঙ্খধ্বনির সঙ্গে ধ্বজস্থিত বানরও ঘোর গর্জন করছে। অর্জুন তাঁর গাণ্ডীব আকর্ষণ করছেন; এই তাঁর দুই বাণ এসে আমার চরণে পড়ল, এই আর দুই বাণ আমার কর্ণ স্পর্শ ক’রে চ’লে গেল। তিনি দুই বাণ দিয়ে আমাকে প্রণাম করলেন, আর দুই বাণে আমাকে কুশলপ্রশ্ন করলেন।

অর্জুন দেখলেন, দ্রোণ ভীষ্ম কর্ণ প্রভৃতি রয়েছেন কিন্তু দুর্যোধন নেই। তিনি উত্তরকে বললেন, এই সৈন্যদল এখন থাকুক, আগে দুর্যোধনের সঙ্গে যুদ্ধ করব। নিরামিষ (১) যুদ্ধ হয় না, আমরা দুর্যোধনকে জয় ক'রে গোধন উদ্ধার ক'রে আবার এদিকে আসব।

(১) যে যুদ্ধে লোভ্য বা আকাঙ্ক্ষিত বস্তু নেই।

অর্জুনকে অন্যদিকে যেতে দেখে দ্রোণ বললেন, উনি দুর্যোধন ভিন্ন অন্য কাউকেও চান না, চল, আমরা পশ্চাতে গিয়ে তাঁকে ধরব।

পতঙ্গপালের ন্যায় শরজালে অর্জুন কুরুসৈন্য আচ্ছন্ন করলেন। তাঁর শঙ্খের শব্দে, রথচক্রের ঘর্ঘর রবে, গাণ্ডীবের টংকারে, এবং ধ্বজাস্থিত অমানুষ ভূতগণের গর্জনে পৃথিবী কম্পিত হ'ল। অপহৃত গরুর দল ঊর্ধ্বপুচ্ছ হয়ে হম্বারবে মৎস্যরাজ্যের দক্ষিণ দিকে ফিরতে লাগল। গোধন জয় ক'রে অর্জুন দুর্যোধনের অভিমুখে যাচ্ছিলেন এমন সময় কুরুপক্ষীয় অন্যান্য বীরগণকে দেখে তিনি উত্তরকে বললেন, কর্ণের কাছে রথ নিয়ে চল।

দুর্যোধনের ভ্রাতা বিকর্ণ এবং আরও কয়েকজন যোদ্ধা কর্ণকে রক্ষা করতে এলেন, কিন্তু অর্জুনের শরে বিধ্বস্ত হয়ে পালিয়ে গেলেন। কর্ণের ভ্রাতা সংগ্রামজিৎ নিহত হলেন, কর্ণও অর্জুনের বজ্রতুল্য বাণে নিপীড়িত হয়ে যুদ্ধের সম্মুখ ভাগ থেকে প্রস্থান করলেন।

ইন্দ্রাদি তেত্রিশ দেবতা এবং পিতৃগণ মহর্ষিগণ গন্ধর্বগণ প্রভৃতি বিমানে ক'রে যুদ্ধ দেখতে এলেন। তাঁদের আগমনে যুদ্ধভূমির ধূলি দূর হ'ল, দিব্যগন্ধ বায়ু বইতে লাগল। অর্জুনের আদেশে উত্তর কৃপাচার্যের কাছে রথ নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর কৃপাচার্যের রথের চার অশ্ব অর্জুনের শরে বিদ্ধ হয়ে লাফিয়ে উঠল, কৃপ পড়ে গেলেন। তাঁর গৌরব রক্ষার জন্য অর্জুন আর শরাঘাত করলেন না; কিন্তু কৃপ আবার উঠে অর্জুনকে দশ বাণে বিদ্ধ করলেন, অর্জুনও কৃপের কবচ ধনু রথ ও অশ্ব বিনষ্ট করলেন, তখন অন্য যোদ্ধারা কৃপকে নিয়ে বেগে প্রস্থান করলেন।

দ্রোণাচার্যের সম্মুখীন হয়ে অর্জুন অভিবাদন ক'রে স্মিতমুখে সবিনয়ে বললেন, আমরা বনবাস সমাপ্ত ক'রে শত্রুর উপর প্রতিশোধ নিতে এসেছি, আপনি আমাদের উপর ক্রুদ্ধ হ'তে পারেন না। আপনি যদি আগে আমাকে প্রহার করেন তবেই আমি প্রহার করব। দ্রোণ অর্জুনের প্রতি অনেকগুলি বাণ নিক্ষেপ করলেন। তখন দুজনে প্রবল যুদ্ধ হ'তে লাগল, অর্জুনের বাণবর্ষণে দ্রোণ আচ্ছন্ন হলেন। অশ্বত্থামা বাধা দিতে এলেন। তিনি মনে মনে অর্জুনের প্রশংসা করলেন কিন্তু ক্রুদ্ধও হইলেন। অর্জুন অশ্বত্থামার দিকে অগ্রসর হয়ে দ্রোণকে সরে যাবার পথ দিলেন, দ্রোণ বিক্ষতদেহে বেগে প্রস্থান করলেন।

অর্জুনের সঙ্গে কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর অশ্বত্থামার বাণ নিঃশেষ হয়ে গেল, তখন অর্জুন কর্ণের দিকে ধাবিত হলেন। দুইজনে বহুক্ষণ যুদ্ধের পর অর্জুনের শরে কর্ণের বক্ষ বিদ্ধ হ'ল, তিনি বেদনায় কাতর হয়ে উত্তর দিকে পলায়ন করলেন।

তার পর অর্জুন উত্তরকে বললেন, তুমি ওই হিরন্ময় ধ্বজের নিকট রথ নিয়ে চল, ওখানে পিতামহ ভীষ্ম আমার প্রতীক্ষা করছেন। উত্তর বললেন, আমি বিহ্বল হয়েছি, আপনাদের অস্ত্রক্ষেপণ দেখে আমার বোধ হচ্ছে যেন দশ দিক ঘুরছে, বসা রুধির আর মেদের গন্ধে আমার মূর্ছা আসছে, ভয়ে হৃদয় বিদীর্ণ হচ্ছে, আমার আর কশা ও বল্গা ধরবার শক্তি নেই। অর্জুন বললেন, ভয় পেয়ো না, স্থির হও, তুমিও এই যুদ্ধে অদ্ভুত কর্মকৌশল দেখিয়েছ। ধীর হয়ে অশ্বচালনা কর, ভীষ্মের নিকটে আমাকে নিয়ে চল, আজ তোমাকে আমার বিচিত্র অস্ত্রশিক্ষা দেখাব। উত্তর আশ্বস্ত হয়ে ভীষ্মরক্ষিত সৈন্যের মধ্যে রথ নিয়ে গেলেন।

ভীষ্ম ও অর্জুন পরস্পরের প্রতি প্রাজাপত্য ঐন্দ্র আগ্নেয় বারুণ বায়ব্য প্রভৃতি দারুণ অস্ত্র নিক্ষেপ করতে লাগলেন। পরিশেষে ভীষ্ম শরাঘাতে অচৈতন্যপ্রায় হলেন, তাঁর সারথি তাঁকে যুদ্ধভূমি থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল। তার পর দুর্যোধন রথারোহণে এসে অর্জুনকে আক্রমণ করলেন। তিনি বহুক্ষণ যুদ্ধের পর বাণবিদ্ধ হয়ে রুধির বমন করতে করতে পলায়ন করলেন। অর্জুন তাঁকে বললেন, কীর্তি ও বিপুল যশ পরিত্যাগ ক'রে চ'লে যাচ্ছ কেন? তোমার দুর্যোধন নাম আজ মিথ্যা হল, তুমি যুদ্ধ ত্যাগ করে পালাচ্ছ।

অর্জুনের তীক্ষ্ণ বাক্য শুনে দুর্যোধন ফিরে এলেন। ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ প্রভৃতিও তাঁকে রক্ষা করতে এলেন এবং অর্জুনকে বেষ্টন ক'রে সবদিক থেকে শরবর্ষণ করতে লাগলেন। তখন অর্জুন ইন্দ্রদত্ত সম্মোহন অস্ত্র প্রয়োগ করলেন, কুরুপক্ষের সকলের সংজ্ঞা লুপ্ত হ'ল। উত্তরার অনুরোধ স্মরণ করে অর্জুন বললেন, উত্তর, তুমি রথ থেকে নেমে দ্রোণ আর কৃপের শুক্ল বস্ত্র, কর্ণের পীত বস্ত্র, এবং অশ্বত্থামা ও দুর্যোধনের নীল বস্ত্র খুলে নিয়ে এস। ভীষ্ম বোধ হয় সংজ্ঞাহীন হন নি, কারণ তিনি আমার অস্ত্র প্রতিষেধের উপায় জানেন, তুমি তাঁর বাম দিক দিয়ে যাও। দ্রোণ প্রভৃতির বস্ত্র নিয়ে এসে উত্তর পুনর্বার রথে উঠলেন এবং অর্জুনকে নিয়ে রণভূমি থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন।

অর্জুনকে যেতে দেখে ভীষ্ম তাঁকে শরাঘাত করলেন, অর্জুন ভীষ্মের অশ্বসকল বধ ক'রে তাঁর পার্শ্বদেশ দশ বাণে বিদ্ধ করলেন। দুৰ্য্যোধন সংজ্ঞালাভ ক'রে বললেন, পিতামহ, অর্জুনকে অস্ত্রাঘাত করুন, যেন ও চ'লে যেতে না পারে। ভীষ্ম হেসে বললেন, তোমার বুদ্ধি আর বিক্রম এতক্ষণ কোথায় ছিল? তুমি যখন ধনুৰ্বাণ ত্যাগ ক'রে নিস্পন্দ হয়ে পড়ে ছিলে তখন অর্জুন কোনও নৃশংস কৰ্ম্ম করেন নি, তিনি ত্রিলোকের রাজ্যের জন্যও স্বধৰ্ম্ম ত্যাগ করেন না, তাই তোমরা সকলে এই যুদ্ধে নিহত হও নি। এখন তুমি নিজের দেশে ফিরে যাও, অর্জুনও গরু নিয়ে প্রস্থান করুন। দুৰ্য্যোধন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে যুদ্ধের ইচ্ছা ত্যাগ ক'রে নীরব হলেন, অন্যান্য সকলেই ভীষ্মের বাক্য অনুমোদন ক'রে দুৰ্য্যোধনকে নিয়ে ফিরে যাবার ইচ্ছা করলেন।

কুরুবীরগণ চ'লে যাচ্ছেন দেখে অর্জুন প্রীত হলেন এবং গুরুজনদের মিষ্টবাক্যে সম্মান জানিয়ে কিছুদূর অনুগমন করলেন। তিনি পিতামহ ভীষ্ম ও দ্রোণাচার্য্যকে আনতমস্তকে প্রণাম জানালেন, অশ্বত্থামা কৃপ ও মান্য কৌরবগণকে বিচিত্র বাণ দিয়ে অভিবাদন করলেন, এবং শরাঘাতে দুৰ্য্যোধনের রত্নভূষিত মুকুট ছেদন করলেন। তার পর অর্জুন উত্তরকে বললেন, রথের অশ্ব ঘুরিয়ে নাও, তোমার গোধন উদ্ধার হয়েছে, এখন আনন্দে রাজধানীতে ফিরে চল।