উদ্যোগপর্ব: ২। কৃষ্ণ-সকাশে দুর্য্যোধন ও অর্জ্জুন — বলরাম ও দুর্য্যোধন

অন্যান্য দেশে দূত পাঠাবার পর অর্জুন স্বয়ং দ্বারকায় যাত্রা করলেন। পাণ্ডবগণ কি করছেন তার সমস্ত সংবাদ দুর্যোধন তাঁর গুপ্তচরদের কাছে পেতেন। কৃষ্ণ-বলরাম প্রভাত সভভবনে ফিরে গেছেন শুনে দুর্যোধন অল্প সৈন্য নিয়ে অশ্বারোহণে দ্রুতবেগে দ্বারকায় এলেন। অর্জুনও সেই দিন সেখানে উপস্থিত হলেন। কৃষ্ণ নিদ্রিত আছেন জেনে দুর্যোধন ও অর্জুন তাঁর শয়নকক্ষে গেলেন। প্রথমে দুর্যোধন এসে কৃষ্ণের মস্তকের নিকটে একটি উৎকৃষ্ট আসনে বসলেন, তার পর অর্জুন এসে কৃষ্ণের পাদদেশে বিনীতভাবে কৃতাঞ্জলি হয়ে রইলেন।

জাগরিত হয়ে কৃষ্ণ প্রথমে অর্জুনকে দেখলেন, তার পর পিছন দিকে দৃষ্টিপাত ক'রে সিংহাসনে উপবিষ্ট দুর্যোধনকে দেখলেন। তিনি স্বাগত সম্ভাষণ ক'রে দুজনের আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করলে দুর্যোধন সহাস্যে বললেন, মাধব, আসন্ন যুদ্ধে তুমি আমার সহায় হও। আমার আর অর্জুনের সঙ্গে তোমার সমান সখ্য, সমান সম্বন্ধ (১)। আমি আগে তোমার কাছে এসেছি, সাধুজন প্রথাগতকেই বরণ করেন, তুমি সজ্জনশ্রেষ্ঠ, অতএব সদাচার রক্ষা কর।

(১) কৃষ্ণ অর্জুনের মামাতো ভাই, কৃষ্ণভগিনী সুভদ্রা অর্জুনের পত্নী; কৃষ্ণপুত্র শাম্ব দুর্যোধনের জামাতা।

কৃষ্ণ বললেন, রাজা, তুমি প্রথমে এসেছ তাতে আমার সন্দেহ নেই, কিন্তু আমি ধনঞ্জয়কেই প্রথমে দেখেছি, অতএব ধনঞ্জয়কেই সাহায্য করব। যারা বয়ঃকনিষ্ঠ তাদের অভীষ্টপূরণ আগে করা উচিত, সেজন্য প্রথমে অর্জুনকে বলছি। — নারায়ণ নামে খ্যাত আমার দশ কোটি গোপ যোদ্ধা আছে, তাদের দৈহিক বল আমারই তুল্য। পার্থ, তুমি সেই দুর্ধর্ষ নারায়ণী সেনা চাও, না যুদ্ধবিমুখ নিরস্ত্র আমাকে চাও? তুমি বার বার ভেবে দেখ — যুদ্ধে সাহায্যের জন্য দশ কোটি যোদ্ধা নেবে, কিংবা কেবল সচিবরূপে আমাকে নেবে?

কৃষ্ণ যুদ্ধ করবেন না জেনেও অর্জুন তাকেই বরণ করলেন। দুর্যোধন দশ কোটি যোদ্ধা নিলেন এবং পরম আনন্দে মনে করলেন যেন কৃষ্ণকেই পেয়েছেন। তার পর বলরামের কাছে গিয়ে দুর্যোধন তাঁর আসবার কারণ জানালেন। বলরাম বললেন, বিরাটভবনে বিবাহের পর আমি যা বলেছিলাম তা বোধ হয় তুমি জান। তোমার জন্যই আমি বার বার কৃষ্ণকে বাধা দিয়ে বলেছিলাম যে দুই পক্ষের সঙ্গেই আমাদের সমান সম্বন্ধ। কিন্তু তিনি আমার মত গ্রহণ করেন নি, আমিও তাঁকে ছেড়ে ক্ষণকালও থাকতে পারি না। কৃষ্ণের মতিগতি দেখে আমি স্থির করেছি যে আমি পার্থের সহায় হব না, তোমারও সহায় হব না। পুরুষশ্রেষ্ঠ, তুমি মহামান্য ভরতবংশে জন্মেছ, যাও, ক্ষত্রধর্ম অনুসারে যুদ্ধ কর। দুর্যোধন বলরামকে আলিঙ্গন করে বিদায় নিলেন। তিনি মনে করলেন যে কৃষ্ণ তাঁর বশে এসেছেন, যুদ্ধেও তাঁর জয় হয়েছে। তার পর তিনি কৃতবর্মা (১) র সঙ্গে দেখা করলেন এবং তাঁর কাছে এক অক্ষৌহিণী সৈন্য লাভ করলেন।

(১) কৃষ্ণ অর্জুনের মামাতো ভাই, কৃষ্ণভগিনী সুভদ্রা অর্জুনের পত্নী; কৃষ্ণপুত্র শাম্ব দুর্যোধনের জামাতা।

দুর্যোধন চলে গেলে কৃষ্ণ অর্জুনকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি যুদ্ধ করব না তথাপি তুমি আমাকে বরণ করলে কেন? অর্জুন বললেন নরোত্তম, তুমি একাকীই আমাদের সমস্ত শত্রু সংহার করতে পার এবং তোমার যশও লোকবিখ্যাত। আমিও শত্রুসংহারে সমর্থ এবং যশের প্রার্থী, এই কারণেই তোমাকে বরণ করেছি। আমার চিরকালের ইচ্ছা তুমি আমার সারথি হবে, এই কার্যে তুমি সম্মত হও। বাসুদেব বললেন, পার্থ, তুমি যে আমার সঙ্গে স্পর্ধা কর তা তোমারই উপযুক্ত। আমি সারথি হয়ে তোমার ইচ্ছা পূর্ণ করব। তার পর কৃষ্ণ ও দাশার্হ (২) বীরগণের সঙ্গে অর্জুন আনন্দিতমনে যুধিষ্ঠিরের কাছে ফিরে এলেন।

(২) সাত্যকি প্রভৃতি।