উদ্যোগপর্ব: ৩। শল্য, দুর্য্যোধন ও যুধিষ্ঠির

আমন্ত্রণ পেয়ে মদ্ররাজ শল্য (৩) তাঁর বৃহৎ সৈন্যদল ও মহাবীর পুত্রগণকে নিয়ে পাণ্ডবগণের নিকট যাচ্ছিলেন। এই সংবাদ শুনে দুর্যোধন পথিমধ্যে তাঁর সংবর্ধনার উদ্যোগ করলেন। তাঁর আদেশে শিল্পিগণ স্থানে স্থানে বিচিত্র সভা-মন্ডপ, কূপ, দীর্ঘিকা, পাকশালা প্রভৃতি নির্মাণ করলে। নানাপ্রকার ক্রীড়া এবং খাদ্যপানীয়েরও আয়োজন করা হ'ল। শল্য উপস্থিত হ'লে দুর্যোধনের সচিবগণ তাঁকে দেবতার ন্যায় পূজা করলেন। শল্য বললেন, যুধিষ্ঠিরের কোন্ কৰ্ম্মচারিগণ এই সকল সভা নিৰ্ম্মাণ করেছে? তাদের ডেকে আন, যুধিষ্ঠিরের সম্মতি নিয়ে আমি তাদের পারিতোষিক দিতে ইচ্ছা করি। দুৰ্য্যোধন অন্তরালে ছিলেন, এখন শল্যের কাছে এলেন। দুৰ্য্যোধনই সমস্ত আয়োজন করেছেন জেনে শল্য প্রীত হয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করে বললেন, তোমার কি অভীষ্ট বল, আমি তা পূৰ্ণ করব।

(৩) নকুল-সহদেবের মাতুল।

দুৰ্য্যোধন বললেন, আপনার বাক্য সত্য হ'ক, আপনি আমার সমস্ত সৈন্যের নেতৃত্ব করুন। শল্য বললেন, তাই হবে; আর কি চাও? দুৰ্য্যোধন বললেন, আমি কৃতার্থ হয়েছি, আর কিছু চাই না। শল্য বললেন, দুৰ্য্যোধন, তুমি এখন নিজ দেশে ফিরে যাও, আমি যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। দুৰ্য্যোধন বললেন, মহারাজ, আপনি দেখা করে শীঘ্র আমাদের কাছে আসবেন, আমরা আপনারই অধীন, যে বর দিয়েছেন তা মনে রাখবেন। দুৰ্য্যোধনকে আশ্বাস দিয়ে শল্য উপপ্লব্য নগরে যাত্রা করলেন।

পাণ্ডবগণের শিবিরে এসে শল্য যুধিষ্ঠিরাদিকে আলিঙ্গন ও কুশলপ্রশ্ন করলেন এবং কিছুক্ষণ আলাপের পর দুৰ্য্যোধনকে যে বর দিয়েছেন তা জানালেন। যুধিষ্ঠির বললেন, আপনি দুৰ্য্যোধনের প্রতি তুষ্ট হয়ে যে প্ৰতিশ্ৰুতি দিয়েছেন তা ভালই। এখন আমার একটি উপকার করুন, যদি অকৰ্ত্তব্য মনে করেন তথাপি আমাদের মঙ্গলের জন্য তা আপনাকে করতে হবে। আপনি যুদ্ধে বাসুদেবের সমান, কৰ্ণ আর অর্জ্জুনের যখন দ্বৈরথ যুদ্ধ হবে তখন আপনি নিশ্চয় কৰ্ণের সারথি হবেন। আপনি অর্জ্জুনকে রক্ষা করবেন, এবং যদি আমার প্ৰিয়কাৰ্য্য করতে চান তবে কৰ্ণের তেজ নষ্ট করবেন। মাতুল, অকৰ্ত্তব্য হ'লেও এই কৰ্ম্ম আপনি করবেন।

শল্য বললেন, আমি নিশ্চয়ই দুরাত্মা কৰ্ণের সারথি হব। সে আমাকে কৃষ্ণতুল্য মনে করে, যুদ্ধকালে আমি তাকে এমন প্রতিকূল ও অহিতকর বাক্য বলব যে তার দর্প ও তেজ নষ্ট হবে এবং অর্জ্জুন তাকে অনায়াসে বধ করতে পারবেন। বৎস, তুমি যা বলেছ তা আমি করব, এবং তোমার প্ৰিয়কাৰ্য্য আর যা পারব তাও করব। যুধিষ্ঠির, তুমি ও কৃষ্ণা দ্যূতসভায় যে দুঃখ পেয়েছ, সূতপুত্র কৰ্ণের কাছে যে নিষ্ঠুর বাক্য শুনেছ, জটাসুর ও কীচকের কাছে দ্রৌপদী যে ক্লেশ পেয়েছেন, সে সমস্তের ফল পরিণামে সুখজনক হবে। মহাত্মা ও দেবতারাও দুঃখভোগ করেন, কারণ দৈবই প্রবল। দেবরাজ ইন্দ্রও তাঁর ভাৰ্য্যার সঙ্গে মহৎ দুঃখভোগ করেছিলেন।