উদ্যোগপর্ব: ৬। দ্রুপদ-পুরোহিতের দৌত্য

দ্রুপদের পুরোহিত হস্তিনাপুরে এলে ধৃতরাষ্ট্র ভীষ্ম ও বিদুর তাঁর সম্বর্ধনা করলেন। কুশলজিজ্ঞাসার পর পুরোহিত বললেন, আপনারা সকলেই সনাতন রাজধর্ম জানেন, তথাপি আমার বক্তব্যের অঙ্গরূপে কিছু বলব। ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু একজনেরই পুত্র, পৈতৃক ধনে তাঁদের সমান অধিকার। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ তাঁদের পৈতৃক ধন পেলেন, কিন্তু পাণ্ডুপুত্রগণ পেলেন না কেন? আপনারা জানেন, দুর্যোধন তা অধিকার ক’রে রেখেছেন। তিনি পাণ্ডবগণকে যমালয়ে পাঠাবার অনেক চেষ্টা করেছেন এবং শকুনির সাহায্যে তাঁদের রাজ্য হরণ করেছেন। এই ধৃতরাষ্ট্র পুত্রের কর্ম অনুমোদন ক’রে পাণ্ডবগণকে তের বৎসর নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। দ্যূতসভায় বনবাসে এবং বিরাটনগরে পাণ্ডবগণ ভার্যা সহ বহু ক্লেশ পেয়েছেন। এইসকল নির্যাতন ভুলে গিয়ে তাঁরা কৌরবগণের সঙ্গে সন্ধি করতে ইচ্ছা করেন। এখানে যে সুহৃদবর্গ রয়েছেন তাঁরা পাণ্ডবদের ও দুর্যোধনের আচরণ বিচার ক’রে ধৃতরাষ্ট্রকে অনুরোধ করুন। পাণ্ডবরা বিবাদ করতে চান না, লোকক্ষয় না ক’রেই নিজেদের প্রাপ্য চান। দুর্যোধন যে ভরসায় যুদ্ধ করতে চান তা মিথ্যা, কারণ পাণ্ডবরাই অধিকতর বলশালী। তাঁদের সাত অক্ষৌহিণী সেনা প্রস্তুত আছে, তার উপর সাত্যকি, ভীমসেন আর নকুল-সহদেব সহস্র অক্ষৌহিণীর সমান। আপনাদের পক্ষে যেমন এগার অক্ষৌহিণী আছে, অপর পক্ষে তেমন অর্জুন আছেন। অর্জুন ও বাসুদেব সমস্ত সেনারই অধিক। সেনার বহুলতা, অর্জুনের বিক্রম এবং কৃষ্ণের বুদ্ধিমত্তা জেনে কোন্ লোক পাণ্ডবদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে? অতএব আপনারা কালক্ষেপ করবেন না, ধর্ম ও নিয়ম অনুসারে যা পাণ্ডবগণের প্রাপ্য তা দিন।

পুরোহিতের কথা শুনে ভীষ্ম বললেন, ভাগ্যক্রমে পাণ্ডবগণ ও কুশল আছেন এবং ধর্মপথে থেকে সন্ধিকামনা করছেন। আপনি যা বলেছেন তা সত্য, তবে আপনি ব্রাহ্মণ সেজন্য আপনার বাক্য অতিরিক্ত তীক্ষ্ণ। পাণ্ডবদের বহু কষ্ট দেওয়া হয়েছে এবং ধর্মানুসারে তাঁরা পিতৃধনের অধিকারী এ বিষয়ে কোনও সংশয় নেই। অর্জুন অস্ত্রবিদ্যায় সুশিক্ষিত মহারথ, স্বয়ং ইন্দ্রও যুদ্ধে তাঁর সমকক্ষ নন।

কর্ণ ক্রুদ্ধ হয়ে বাধা দিয়ে দ্রুপদের পুরোহিতকে বললেন, ব্রাহ্মণ, যা হয়ে গেছে তা সকলেই জানে, বার বার সে কথা বলে লাভ কি? দুর্যোধনের জন্যই শকুনি দ্যূতক্রীড়ায় যুধিষ্ঠিরকে জয় করেছিলেন এবং যুধিষ্ঠির পণরক্ষার জন্য বনে গিয়েছিলেন। প্রতিজ্ঞানুযায়ী সময়ের মধ্যে (১) তিনি মূর্খের ন্যায় রাজ্য চাইতে পারেন না। দুর্যোধন ধর্মানুসারে শত্রুকে সমস্ত পৃথিবী দান করতে পারেন, কিন্তু ভয় পেয়ে পাদপরিমিত ভূমিও দেবেন না। পাণ্ডবরা যদি পৈতৃক রাজ্য চান তবে অবশিষ্ট কাল বনবাসে কাটিয়ে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করুন, তার পর নির্ভয়ে দুর্যোধনের ক্রোড়ে আশ্রয় নিন।

(১) কর্ণ বলতে চান যে, অজ্ঞাতবাসের কাল উত্তীর্ণ হবার আগেই পাণ্ডবগণ আত্মপ্রকাশ করেছেন সেজন্য তাঁদের আবার বার বৎসর বনবাসে থাকতে হবে।

ভীষ্ম বললেন, রাধেয়, অহংকার ক’রে লাভ কি, অর্জুন একাকী ছ’জন রথীকে জয় (২) করেছিলেন তা স্মরণ কর। এই ব্রাহ্মণ যা বললেন তা যদি আমরা না করি তবে অর্জুন কর্তৃক নিহত হয়ে আমরা রণভূমিতে ধূলিভক্ষণ করব।

(২) গোহরণকালে।

কর্ণকে ভর্ৎসনা ক’রে ধৃতরাষ্ট্র বললেন, শান্তনুপুত্র ভীষ্ম যা বলেছেন তা সকলের পক্ষে হিতকর। ব্রাহ্মণ, আমি চিন্তা ক’রে পাণ্ডবগণের নিকট সঞ্জয়কে পাঠাব, আপনি আজই অবিলম্বে ফিরে যান। তার পর ধৃতরাষ্ট্র দ্রুপদপুরোহিতকে সসম্মানে বিদায় দিলেন।