উদ্যোগপর্ব: ২০। কর্ণ-কুন্তী-সংবাদ

কৃষ্ণ চলে গেলে বিদুর কুন্তীকে বললেন, আপনি জানেন, যুদ্ধ নিবারণের জন্য আমি সর্বদা চেষ্টা করেছি, কিন্তু দুর্যোধন আমার কথা শোনে নি। বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্র পুত্রের বশবর্তী হয়ে অধর্মের পথে চলেছেন। কৃষ্ণ অকৃতকার্য হয়ে ফিরে গেলেন, এখন পাণ্ডবগণ যুদ্ধের উদ্যোগ করবেন। কৌরবদের দুর্নীতির ফলে বীরগণ বিনষ্ট হবেন, এই চিন্তা করে আমি দিবারাত বিনিদ্র হয়ে আছি।

কুন্তী দুঃখার্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, যুদ্ধ হ'লেও দোষ, না হ'লেও দোষ। দুর্যোধনাদির পক্ষে ভীষ্ম দ্রোণ আর কর্ণ থাকবেন, এজন্যই আমার ভয়। হয়তো দ্রোণ তাঁর শিষ্যের সঙ্গে যুদ্ধ কামনা করেন না, পিতামহ ভীষ্ম হয়তো পাণ্ডবগণের প্রতি স্নেহশীল হবেন। অবিবেচক দুর্মতি কর্ণই দুর্যোধনের বশবর্তী হয়ে পাণ্ডবদের বিশেষ করে, তার জন্যই আমার ভয়। কন্যাকালে যাকে আমি গর্ভে ধারণ করেছি সেই কর্ণ কি আমার হিতকর বাক্য শুনবে না?

এই চিন্তা ক'রে কুন্তী গঙ্গাতীরে গেলেন। দয়ালু সত্যনিষ্ঠ কর্ণ সেখানে পূর্বমুখ ও ঊর্ধ্ববাহু হয়ে জপ করছিলেন। সূর্যতাপে পীড়িত হয়ে শুষ্ক পদ্মমালার ন্যায় কুন্তী কর্ণের উত্তরীয়বস্ত্রের পশ্চাতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কর্ণ মধ্যাহ্নকাল পর্যন্ত জপ করলেন, তার পর পিছনে ফিরে কুন্তীকে দেখতে পেলেন। তিনি সবিস্ময়ে প্রণাম ক'রে কৃতাঞ্জলিপুটে বললেন, আমি অধিরথ-রাধার পুত্র কর্ণ, আপনাকে অভিবাদন করছি, আজ্ঞা করুন আমাকে কি করতে হবে।

কুন্তী বললেন, কর্ণ, তুমি কৌন্তেয়, রাধার গর্ভজাত নও, অধিরথ তোমার পিতা নন, সূতকুলেও তোমার জন্ম হয় নি। বৎস, রাজা কুন্তিভোজের গৃহে আমার কন্যা অবস্থায় তুমি আমার প্রথম পুত্ররূপে জন্মেছিলে। তুমি পার্থ(১), জগৎপ্রকাশক তপনদেব তোমার জনক। তুমি কবচকুন্ডল ধারণ ক’রে দেবশিশুর ন্যায় শ্রীমণ্ডিত হয়ে আমার পিতার গৃহে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলে। পুত্র, তুমি নিজের ভ্রাতাদের না চিনে মোহবশে দুর্যোধনাদির সেবা করছ, তা উচিত নয়। যে রাজলক্ষ্মী অর্জুন পূর্বে অর্জন করেছিলেন, ধৃতরাষ্ট্রগণ যা লোভবশে হরণ করেছে, তা তুমি সবলে অধিকার করে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে ভোগ কর। কৌরবগণ আজ দেখুক যে কর্ণার্জুন সৌভ্রাত্র-বন্ধনে মিলিত হয়েছেন। কৃষ্ণ-বলরামের ন্যায় মিলিত হলে তোমাদের অসাধ্য কি থাকতে পারে? তুমি সর্বগুণসম্পন্ন, আমার পুত্রদের সর্বজ্যেষ্ঠ; তুমি পার্থ, তোমাকে যেন কেউ সূতপুত্র না বলে।

(১) পৃথা বা কুন্তীর পুত্র।

তখন কর্ণ তাঁর পিতা ভাস্করের এই স্নেহবাক্য শুনতে পেলেন — তোমার জননী পৃথা সত্য বলেছেন, তাঁর কথা শোন, তোমার মঙ্গল হবে। মাতাপিতার অনুরোধেও কর্ণ বিচলিত হলেন না। তিনি কুন্তীকে বললেন, ক্ষত্রিয়জননী, আপনার বাক্যে আমার শ্রদ্ধা নেই, আপনার অনুরোধও ধর্মসঙ্গত মনে করি না। আপনি আমাকে ত্যাগ করে ঘোর অন্যায় করেছেন, তাতে আমার যশ ও কীর্তি নষ্ট হয়েছে। জন্মে ক্ষত্রিয় হ’লেও আপনার জন্য আমি ক্ষত্রিয়োচিত সংস্কার পাই নি, কোন্ শত্রু এর চেয়ে অধিক অপকার করতে পারে? আপনি যথাকালে আমাকে দয়া করেন নি, আজ কেবল নিজের হিতের জন্যই আমাকে উপদেশ দিচ্ছেন। কৃষ্ণের সহিত মিলিত অর্জুনকে কে না ভয় করে? এখন যদি আমি পাণ্ডবপক্ষে যাই তবে সকলেই বলবে আমি ভয় পেয়ে এমন করেছি। কেউ জানে না যে আমি পাণ্ডবদের ভ্রাতা। এখন যুদ্ধকালে যদি আমি পাণ্ডবপক্ষে যাই তবে ক্ষত্রিয়রা আমাকে কি বলবেন? ধার্তরাষ্ট্রগণ আমার সর্ব কামনা পূর্ণ করেছেন, আমাকে সম্মানিত করেছেন, এখন আমি কি করে তা নিষ্ফল করতে পারি? যাঁরা আমাকে শ্রদ্ধা করেন, যাঁরা আমার ভরসাতেই শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাবেন, তাঁদের মনোরথ আমি কি করে ছিন্ন করব? যে সকল অস্থিরমতি পাপাত্মা রাজার অনুগ্রহে পুষ্ট ও কৃতার্থ হয়ে কার্যকালে কর্তব্য পালন করে না, সেই কৃতঘ্নদের ইহলোক নেই পরলোকও নেই। আমি সৎপুরুষোচিত অনৃশংসতা ও চরিত্র রক্ষা করে আপনার পুত্রদের সঙ্গে যথশক্তি যুদ্ধ করব, আপনার বাক্য হিতকর হলেও তা পালন করতে পারি না। কিন্তু আপনার আগমন ব্যর্থ হবে না, সমর্থ হলেও আমি আপনার সকল পুত্রকে বধ করব না। কেবল অর্জুনকে নিহত করে অভীষ্ট ফল লাভ করব, অথবা তাঁর হাতে নিহত হয়ে যশোলাভ করব। যশস্বিনী, যেই মরুক, অর্জুন অথবা আমাকে নিয়ে আপনার পাঁচ পুত্রই থাকবে। শোকার্ত্তা কুন্তী কম্পিতদেহে পুত্রকে আলিঙ্গন করে বললেন, কর্ণ, তুমি যা বললে তাই হবে, কুরুকুলের ক্ষয় হবে, দৈবই প্রবল। অর্জুন ভীম অন্য চার ভ্রাতাকে তুমি অভয় দিয়েছ এই প্রতিজ্ঞা মনে রেখো। কুন্তী শুভাশীর্বাদ করলেন, কর্ণও তাঁকে অভিবাদন করলেন, তারপর দুজনে দুদিকে চলে গেলেন।