উদ্যোগপর্ব: ১৯। কৃষ্ণ-কর্ণ-সংবাদ
যেতে যেতে কৃষ্ণ কর্ণকে বললেন, রাধেয়, তুমি বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের সেবা করেছ এবং তাঁদের কাছে ধর্মশাস্ত্রের সূক্ষ্ম তত্ত্বসকল শিখেছ। কুমারী কন্যার গর্ভে দুইপ্রকার পুত্র হয়, কানীন (১) ও সহোঢ় (২)। শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতগণ বলেন, কন্যাকে যে বিবাহ করে সেই লোকই এই দুইপ্রকার পুত্রের পিতা। কর্ণ, তুমি কানীন পুত্র এবং ধর্মানুসারে পাণ্ডুরই পুত্র। অতএব তুমিই রাজা হও, তোমার পিতৃপক্ষীয় পাণ্ডবগণ এবং মাতৃপক্ষীয় বৃষ্ণিগণ দুই পক্ষকেই তোমার সহায় বলে জেনো। তুমি আজ আমার সঙ্গে চল, পাণ্ডবরা জানুন যে তুমি যুধিষ্ঠিরের অগ্রজ। তোমার পাঁচ ভ্রাতা, দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্র এবং অভিমন্যু তোমার চরণ ধারণ করবেন; সমাগত রাজারা এবং অন্ধক ও বৃষ্ণিবংশীয় সকলেই তোমার পদানত হবেন। রাজা ও রাজকন্যারা তোমার অভিষেকের জন্য হিরণ্ময় রজতময় ও মৃন্ময় কুম্ভ এবং ওষধি বীজ রত্ন প্রভৃতি উপকরণ নিয়ে আসবেন দ্রৌপদীও ষষ্ঠ (৩) কালে তোমার সঙ্গে মিলিত হবেন। আমরা তোমাকে পৃথিবীর রাজপদে অভিষিক্ত করব, যুধিষ্ঠির যুবরাজ হবেন এবং শ্বেতচামরহস্তে তোমার পশ্চাতে থাকবেন। ভীমসেন তোমার মস্তকে শ্বেত ছত্র ধরবেন, অর্জুন তোমার রথ চালাবেন, অভিমন্যু সর্বদা তোমার কাছে থাকবেন। নকুল, সহদেব, দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্র, পাঞ্চালগণ ও মহারথ শিখণ্ডী তোমার অনুগমন করবেন। কুন্তীপুত্র, তুমি ভ্রাতৃগণে বেষ্টিত হয়ে রাজ্য-শাসন কর, কুন্তী ও মিত্রগণ আনন্দিত হন, পাণ্ডব ভ্রাতাদের সঙ্গে তোমার সৌহাদ্দ হ’ক।
কর্ণ বললেন, কৃষ্ণ, তুমি যা বললে তা আমি জানি, ধর্মশাস্ত্র অনুসারে আমি পাণ্ডুরই পুত্র। কুন্তী কন্যা অবস্থায় সূর্যের ঔরসে আমাকে গর্ভে ধারণ করেন এবং হিতচিন্তা না করে আমাকে ত্যাগ করেন। সূতবংশীয় অধিরথ আমাকে তাঁর গৃহে আনেন, স্নেহবশে তখনই তাঁর পত্নী রাধার স্তনদুগ্ধ ক্ষরিত হয়েছিল, তিনি আমার মলমূত্রও ঘেঁটেছিলেন। আমি কি ক’রে তাঁর পিণ্ডলোপ করতে পারি? অধিরথ আমাকে পুত্র মনে করেন, আমিও তাঁকে পিতা মনে করি। তিনি আমার জাতকর্মাদি করিয়াছেন, তাঁর নিয়ত রাধা-প্রাণা আমাকে বসুসেন নাম দিয়েছেন, তাঁর আশ্রয়েই যৌবনলাভ ক’রে আমি বিবাহ করেছি। পত্নীদের সঙ্গে আমার প্রেমের বন্ধন আছে, তাঁদের গর্ভে আমার পুত্র-পৌত্রও হয়েছে। গোবিন্দ, সমস্ত পৃথিবী এবং রাশি রাশি সুবর্ণ পেলেও আমি সেই সম্বন্ধ মিথ্যা করতে পারি না, সুখের লোভে বা ভয় পেয়েও নয়। আমি দুর্যোধনের আশ্রয়ে তের বৎসর নিষ্কণ্টক রাজ্য ভোগ করেছি; সূতগণের সঙ্গে আমি বহু বন্ধ করেছি, তাঁদের সঙ্গে আমার বিবাহাদি সম্বন্ধও আছে। আমার ভরসাতেই দুর্যোধন যুদ্ধের উদ্যোগ করেছেন, দ্বৈরথ যুদ্ধে অর্জুনের প্রতিযোদ্ধা রূপে আমাকেই বরণ করেছেন। মৃত্যু বা বন্ধনের ভয়ে অথবা লোভের বশে আমি তাঁর সঙ্গে মিথ্যাচরণ করতে পারি না। তুমি যা বললে তা অবশ্য হিতৈষীর জন্যই। মধুসূদন, তুমি আমাদের এই আলোচনা গোপনে রেখো, ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির যদি জানতে পারেন যে আমিই কুন্তীর প্রথম পুত্র তবে আর তিনি রাজ্য নেবেন না। যদি আমিই সেই রাজ্য পাই তবে দুর্যোধনকেই সমর্পণ করব। অতএব যুধিষ্ঠিরই রাজ্য লাভ করুন, হৃষীকেশ তাঁর নেতা এবং অর্জুন তাঁর যোদ্ধা হয়ে থাকুন। কেশব, ত্রিলোকের মধ্যে পুণ্যতম স্থান কুরুক্ষেত্রে বিশাল ক্ষত্রিয়মন্ডল যেন অস্ত্রযুদ্ধেই নিহত হন, সমস্ত ক্ষত্রিয়ই যেন স্বর্গলাভ করেন।
মৃদু হাস্য ক’রে কৃষ্ণ বললেন, কর্ণ, আমি তোমাকে পৃথিবীর রাজ্য দিতে চাই, কিন্তু তুমি তা নেবে না। পাণ্ডবদের জয় হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তুমি ফিরে গিয়ে ভীষ্ম দ্রোণ ও কৃষ্ণকে বলো, এই মাস (১) অতি শুভকাল, এখন পশুখাদ্য ও ইন্ধন সুলভ, শস্য পরিপুষ্ট, বৃক্ষ সকল ফলবান, মক্ষিকা অল্প, পথে কর্দম নেই, জল স্বাদ হয়েছে, শীত বা গ্রীষ্ম অধিক নয়। সাত দিন পরে অমাবস্যা, সেই দিন সংগ্রাম আরম্ভ হ'ক। যুদ্ধের জন্য সমাগত রাজাদের বলো যে তাঁদের অভীষ্ট পূর্ণ হবে, দুর্যোধনের অনুগামী রাজা ও রাজপুত্রগণ অস্ত্রাঘাতে নিহত হয়ে উত্তম গতি লাভ করবেন।
কর্ণ বললেন, মহাবাহু, সব জেনেও কেন আমাকে ভোলাতে চাচ্ছ? এই পৃথিবীর ধ্বংস আসন্ন, দুর্যোধন দুঃশাসন শকুনি আর আমি তার নিমিত্তস্বরূপ। আমি দারুণ স্বপ্ন ও দুর্লক্ষণ দেখেছি, তুমি যেন রুধিরার্দ্র পৃথিবীকে হাতে ধরে নিক্ষেপ করছ, অস্থিস্তূপের উপরে উঠে যুধিষ্ঠির যেন সুবর্ণপাত্রে ঘৃতপায়স ভোজন করছেন এবং তোমার প্রদত্ত পৃথিবী গ্রাস করছেন। কৃষ্ণ বললেন, আমার কথা যখন তোমার হৃদয়ে প্রবেশ করল না তখন অবশ্যই পৃথিবীর বিনাশ হবে। কর্ণ বললেন, কৃষ্ণ, এই মহাযুদ্ধ থেকে উত্তীর্ণ হয়ে আমরা কি আবার তোমাকে দেখতে পাব? অথবা স্বর্গেই আমাদের মিলন হবে? এখন আমি যাচ্ছি। এই বলে কর্ণ কৃষ্ণকে গাঢ় আলিঙ্গন ক'রে রথ থেকে নামলেন এবং নিজের রথে উঠে দীনমনে প্রস্থান করলেন। কৃষ্ণ ও সাত্যকি তাঁদের সারথিকে বললেন, শীঘ্র চল।