উদ্যোগপর্ব: ২২। পাণ্ডবযূথসজ্জা

২২। পাণ্ডবদলসজ্জা

যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতাদের বললেন, তোমরা কেশবের কথা শুনলে, এখন সেনা বিভাগ কর। সাত অক্ষৌহিণী এখানে সমবেত হয়েছে, তাদের নায়ক — দ্রুপদ, বিরাট, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, সাত্যকি, চেকিতান ও ভীমসেন। এঁরা সকলেই যুদ্ধবিশারদ বীর এবং প্রাণ দিতে প্রস্তুত। সহদেব, তোমার মতে যিনি এই সাত জনের নেতা হবার যোগ্য, যিনি সেনাবিভাগ করতে জানেন এবং যুদ্ধে ভীষ্মের প্রতাপ সইতে পারবেন, তাঁর নাম বল।

সহদেব বললেন, মৎস্যরাজ বিরাটই এই কার্য্যের যোগ্য। ইনি আমাদের সুখে সুখী দুঃখে দুঃখী, বলবান ও অস্ত্রবিশারদ, এঁর সাহায্যেই আমরা রাজ্য উদ্ধার করব। নকুল বললেন, আমাদের শ্বশুর দ্রুপদই সেনানায়ক হবার যোগ্য, ইনি বয়সে ও কুলমর্য্যাদায় শ্রেষ্ঠ, ভরদ্বাজের কাছে অস্ত্রশিক্ষা করেছিলেন এবং সর্বদা দ্রোণ ও ভীষ্মের সহিত স্পর্দ্ধা করেন। দ্রোণের বিনাশকামনায় ইনি ভার্য্যার সহিত ঘোর তপস্যা করেছিলেন (১)। অর্জ্জুন বললেন, যে দিব্য পুরুষ তপস্যার প্রভাবে এবং ঋষিগণের অনুগ্রহে উৎপন্ন হয়েছিলেন, যিনি ধনু খড়্গ ও কবচ ধারণ ক’রে রথারোহণে অগ্নিকুণ্ড থেকে উঠেছিলেন, সেই ধৃষ্টদ্যুম্ন(১)ই সেনাপতিত্বের যোগ্য। ভীম বললেন, সিদ্ধগণ ও মহর্ষিগণ বলেন যে, দ্রুপদপুত্র শিখণ্ডীই ভীষ্মবধের নিমিত্ত জন্মেছেন, ইনি রামের ন্যায় রূপবান, এমন কেউ নেই যে একে অস্ত্রাহত করতে পারে। একেই সেনাপতি করুন।

(১) আদিপর্ব ২১-পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

যুধিষ্ঠির বললেন, কৃষ্ণই আমাদের জয়পরাজয়ের মূল, আমাদের জীবন রাজ্য সুখদুঃখ সবই এঁর অধীন, ইনিই বলুন কে আমাদের সেনাপতি হবেন। এখন

রাত্রি আসন্ন, কাল প্রভাতে আমরা অধিবাস (১) ও কৌতুকমঙ্গল (২) ক’রে যুদ্ধযাত্রা করব।

(১) অস্ত্রপূজা বা নীরাজনা।
(২) রক্ষাসূত্র- বা রাখি-বন্ধন।

অর্জুনের দিকে চেয়ে কৃষ্ণ বললেন, মহারাজ, যাঁদের নাম করা হ’ল তাঁরা সকলেই নেতৃত্ব করবার যোগ্য। আপনি এখন যথাবিধি সৈন্যযোজনা করুন, আপনার পক্ষে যে বীরগণ আছেন তাঁদের সম্মুখে দুর্যোধনাদি কখনও দাঁড়াতে পারবেন না। আমি ধৃষ্টদ্যুম্নকেই সেনাপতি মনোনীত করছি। কৃষ্ণের কথায় পাণ্ডবগণ আনন্দিত হলেন।

যুদ্ধসজ্জা আরম্ভ হ’ল, সৈন্যগণ চঞ্চল হয়ে কোলাহল করতে লাগল, হস্তী ও অশ্বের রব, রথচক্রের ঘর্ঘর ও শঙ্খদুন্দুভির নিনাদে সর্ব দিক ব্যাপ্ত হ’ল। সেই বিশাল সৈন্যসমাগম মহাতরঙ্গময় সমুদ্রের ন্যায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। বর্মে ও অস্ত্রে সজ্জিত যোদ্ধারা আনন্দিত হয়ে চলতে লাগলেন, যুধিষ্ঠির তাঁদের মধ্যভাগে রইলেন, দুর্বল সৈন্য ও পরিচারকগণও তাঁর সঙ্গে চলল। শকট, বিপণি, বেশ্যাদের বস্ত্রগৃহ, কোষ, যন্ত্রায়ুধ ও চিকিৎসকগণ সঙ্গে সঙ্গে গেল। দ্রৌপদী তাঁর দাসদাসী ও অন্যান্য স্ত্রীদের নিয়ে উপপ্লব্য নগরেই রইলেন।

পাণ্ডুবাহিনী কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত হ’ল। যুধিষ্ঠির শ্মশান, দেবালয়, মহর্ষিদের আশ্রম ও তীর্থস্থান পরিহার করলেন এবং যেখানে প্রচুর ঘাস ও কাঠ পাওয়া যায় এমন এক সমতল স্নিগ্ধ স্থানে সেনা সন্নিবেশ করলেন। পবিত্র হিরণ্বতী নদীর নিকটে পরিখা খনন করিয়ে কৃষ্ণ সেখানে রাজাদের শিবির স্থাপন করলেন। শত শত বেতনভোগী শিল্পী এবং চিকিৎসার উপকরণ সহ বৈদ্যগণ শিবিরে রইলেন। প্রতি শিবিরে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র, মধু, ঘৃত, সর্জরস (ধূনা), জল, ঘাস, তুষ ও অঙ্গার রাখা হ’ল।

কৌরবসভার যে কথাবার্তা হয়েছিল তার সম্বন্ধে যুধিষ্ঠির আরও জানতে চাইলে কৃষ্ণ বললেন, মহারাজ, দুর্বুদ্ধি দুর্যোধন আপনার প্রস্তাব এবং ভীষ্ম বিদুর ও আমার কথা সমস্তই অগ্রাহ্য করেছে, কর্ণের ভরসায় সে মনে করে তার জয়লাভ হবেই। সে আমাকে বন্দী করবার আদেশ দিয়েছিল, কিন্তু তার ইচ্ছা পূর্ণ হয় নি। ভীষ্ম-দ্রোণও ন্যায়সংগত কথা বলেন নি, বিদুর ছাড়া সকলেই দুর্যোধনের অনুবর্তী।

যুধিষ্ঠির দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ ক'রে বললেন, যে অনর্থ নিবারণের জন্য আমি বনবাস স্বীকার ক'রে বহু দুঃখ পেয়েছি, সেই মহা অনর্থই উপস্থিত হ'ল। যাঁরা অবধ্য তাঁদের সংগে কি ক'রে যুদ্ধ করব? গুরুজন ও বৃদ্ধদের হত্যা ক'রে আমাদের কিরূপ বিজয়লাভ হবে? অর্জুন বললেন, মহারাজ, কৃষ্ণ কুন্তী ও বিদুর কখনও অধর্ম করতে বলবেন না; যুদ্ধ না ক'রে ফিরে যাওয়া আপনার অকর্তব্য। ঈষৎ হাস্য ক'রে কৃষ্ণ বললেন, ঠিক কথা।

দ্রুপদ বিরাট সাত্যকি ধৃষ্টদ্যুম্ন ধৃষ্টকেতু শিখণ্ডী ও মগধরাজ সহদেব—এই সাত জনকে যুধিষ্ঠির যথাবিধি অভিষিক্ত ক'রে সেনাপতির পদ দিলেন। তার পর তিনি ধৃষ্টদ্যুম্নকে সর্বসেনাপতি, অর্জুনকে সেনাপতিপতি, এবং কৃষ্ণকে অর্জুনের নিয়ন্তা ও অশ্বচালক নিযুক্ত করলেন।