উদ্যোগপর্ব: ২৩। বলরাম ও রুক্মী

কুরুপাণ্ডবদের ঘোর অনিষ্টকর যুদ্ধ আসন্ন হয়েছে এই সংবাদ পেয়ে অক্রূর উদ্ধব শাম্ব প্রদ্যুম্ন প্রভৃতির সংগে হলায়ুধ বলরাম যুধিষ্ঠিরের ভবনে এলেন। তিনি কৈলাসশিখরের ন্যায় শুভ্রকান্তি, সিংহখেলগতি(১), তাঁর চক্ষু মদ্যপানে আরক্ত, পরিধান নীল কৌষেয় বসন। তাঁকে দেখে সকলে সসম্মানে উঠে দাঁড়ালেন এবং যুধিষ্ঠির তাঁর কর গ্রহণ করলেন। অভিবাদনের পর সকলে উপবিষ্ট হ'লে বলরাম কৃষ্ণের দিকে চেয়ে বললেন, দৈববলে এই যে দারুণ লোকক্ষয়কর যুদ্ধ আসন্ন হয়েছে তার নিবারণ করা অসাধ্য। আমি এই কামনা করি যে আপনারা সকলে নীরোগে অক্ষতদেহে এই যুদ্ধ থেকে উত্তীর্ণ হবেন। মহারাজ যুধিষ্ঠির, আমি কৃষ্ণকে বহু বার বলেছি যে আমাদের কাছে পাণ্ডবরা যেমন দুর্যোধনও তেমন, অতএব তুমি দুর্যোধনকেও সাহায্য ক'রো। কিন্তু কৃষ্ণ আমার কথা শোনেন নি, অর্জুনের প্রতি স্নেহের বশে আপনার পক্ষেই সর্ব শক্তি নিয়োগ করেছেন, একারণে আপনারা অবশ্যই জয়লাভ করবেন। আমি কৃষ্ণকে ছেড়ে অন্য পক্ষে যেতে পারি না, অতএব কৃষ্ণের অভীষ্ট কার্যই করব। গদাযুদ্ধবিশারদ ভীম ও দুর্যোধন আমার শিষ্য, দুজনের উপরেই আমার সমান স্নেহ। কৌরবদের বিনাশ আমি দেখতে পারব না, সেজন্য সরস্বতী তীর্থে ভ্রমণ করতে যাচ্ছি।

(১) ক্রীড়ারত সিংহের ন্যায় ধীর গতি।

বলরাম চলে গেলে ভোজ ও দাক্ষিণাত্য দেশের অধিপতি ভীষ্মকের পুত্র রুক্মী এক অক্ষৌহিণী সেনা নিয়ে উপস্থিত হলেন। ইনি কিম্পুরুষশ্রেষ্ঠ দ্রুমের কাছে ধনুর্বেদ শিখে বিজয় নামক ঐন্দ্রধনু লাভ করেছিলেন। এই ধনু অর্জুনের গাণ্ডীব ও কৃষ্ণের শার্ঙ্গ ধনুর তুল্য। কৃষ্ণ যখন রুক্মিণীহরণ করেন তখন তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে রুক্মী পরাজিত হন।

যুধিষ্ঠির সসম্মানে রুক্মীর সংবর্ধনা করলেন। বিশ্রামের পর রুক্মী বললেন, অর্জুন, যদি ভয় পেয়ে থাক তবে এই যুদ্ধে আমি তোমার সহায় হব। আমার তুল্য বিক্রম কারও নেই, শত্রুসেনার যে অংশের সঙ্গে আমাকে যুদ্ধ করতে দেবে সেই অংশেই আমি বিনষ্ট করব, দ্রোণ কৃপ ভীষ্ম কর্ণকেও আমি বধ করব। অথবা এই রাজারা সকলেই যুদ্ধে বিরত থাকুন, আমিই শত্রুসংহার ক’রে তোমাদের রাজ্য উদ্ধার ক’রে দেব।

অর্জুন রুক্মীকে সহাস্যে বললেন, কুরুকুলে আমার জন্ম, আমি পাণ্ডুর পুত্র, দ্রোণের শিষ্য, বাসুদেব আমার সহায়, আমি গাণ্ডীবধারী, কি ক’রে বলব যে ভয় পেয়েছি? আমি যখন ঘোষযাত্রায় মহাবল গন্ধর্বদের সঙ্গে, নিবাতকবচ ও কালকেয় দানবদের সঙ্গে, এবং বিরাটরাজ্যে বহু কৌরবের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম তখন কে আমার সহায় ছিল? আমি রুদ্র ইন্দ্র কুবের যম বরুণ অগ্নি কৃপ দ্রোণ ও মাধবের অনুগৃহীত; আমার তেজোময় দিব্য গাণ্ডীব ধনু, অক্ষয় তূণ ও বিবিধ দিব্যাস্ত্র আছে, ভয় পেয়েছি এই যশোনাশক বাক্য কি ক’রে বলব? মহাবাহু, আমি ভীত হই নি, আমার সহায়েরও প্রয়োজন নেই, তোমার ইচ্ছা হয় এখানে থাক, না হয় ফিরে যাও।

রুক্মী তাঁর সাগরতুল্য বিশাল সেনা নিয়ে দুর্যোধনের কাছে গেলেন এবং অর্জুনকে যেমন বলেছিলেন সেইরূপই বললেন। বীর্যাভিমানী দুর্যোধনও তাঁকে প্রত্যাখ্যান করলেন। এইরূপে রোহিণীন্দন বলরাম এবং ভীষ্মকপুত্র রুক্মী কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধ থেকে দূরে রইলেন।