উদ্যোগপর্ব: ২৪। কৌরবযূথসজ্জা

কৃষ্ণ হস্তিনাপুর থেকে চলে গেলে দুর্যোধন কর্ণ প্রভৃতিকে বললেন, বাসুদেব অকৃতকার্য হয়ে ফিরে গেছেন, তিনি নিশ্চয় ক্রুদ্ধ হয়ে পাণ্ডবগণকে যুদ্ধে উত্তেজিত করবেন। তিনি যুদ্ধই চান, ভীমার্জুনও তাঁর মতে চলেন। দ্রুপদ আর বিরাটের সঙ্গেও আমি শত্রুতা করেছি, তাঁরাও কৃষ্ণের অনুবর্তী হবেন। অতএব কুরু-পাণ্ডবের মধ্যে তুমুল রোমহর্ষণ যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। তোমরা অতন্দ্রিত হয়ে যুদ্ধের সমস্ত আয়োজন কর। কুরুক্ষেত্রে বহু সহস্র শিবির স্থাপন করাও, সর্বদিকে যেন প্রচুর অবকাশ রাখা হয়। শিবিরমধ্যে জল কাষ্ঠ ও বিবিধ অস্ত্র এবং উপরে ধ্বজপতাকা থাকবে। খাদ্যাদি আনয়নের পথ যেন শত্রুরা রোধ করতে না পারে।

দুর্যোধনের আদেশে কুরুক্ষেত্রে সেনানিবাস স্থাপিত হ’ল। সমাগত রাজারা উষ্ণীষ উত্তরীয় ও ভূষণ প্রভৃতিতে সজ্জিত হলেন। রথী অশ্বারোহী গজারোহী ও পদাতি সেনাগণ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হল। রাত্রি প্রভাত হ’লে দুর্যোধন একাদশ অক্ষৌহিণী সেনা বিভক্ত করলেন। প্রত্যেক রথে চার অশ্ব যোজিত হ’ল এবং দুই অশ্বরক্ষক ও দুই পৃষ্ঠরক্ষক নিযুক্ত হ’ল। প্রত্যেক হস্তীতে দুই অঙ্কুশধারী, দুই ধনুর্ধারী এবং একজন শক্তি- ও পতাকা-ধারী রইল।

দুর্যোধন কৃতাঞ্জলি হয়ে ভীষ্মকে বললেন, সেনাপতি না থাকলে বিশাল সেনাও পিপীলিকাপুঞ্জের ন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুনেছি একদা ব্রাহ্মণ বৈশ্য ও শূদ্র এই তিন বর্ণের লোক হৈহয় ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যায়, কিন্তু তারা বার বার পরাজিত হয়। তার পর ব্রাহ্মণেরা ক্ষত্রিয়দের জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের পরাজয়ের কারণ কি? ধর্মজ্ঞ ক্ষত্রিয়গণ যথার্থ উত্তর দিলেন — আমরা সকলে একজন মহাবুদ্ধিমানের মতে চলি, আর আপনারা প্রত্যেকে নিজের বুদ্ধিতে পৃথক পৃথক চলেন। তখন ব্রাহ্মণেরা একজন যুদ্ধনিপুণ ব্রাহ্মণকে সেনাপতি করলেন এবং ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হলেন।

তার পর দুর্যোধন বললেন, পিতামহ, আপনি শুক্রাচার্য্য তুল্য যুদ্ধনিপুণ, ধর্মে নিরত এবং আমার হিতৈষী, আপনিই আমাদের সেনাপতি হ’ন। গোবৎস যেমন ঋষভের অনুগমন করে আমরা সেইরূপ আপনার অনুগমন করব। ভীষ্ম বললেন, মহাবাহু, আমার কাছে তোমরা যেমন পাণ্ডবরাও তেমন, তথাপি প্রতিজ্ঞা অনুসারে তোমার জন্যই যুদ্ধ করব। অর্জুন ভিন্ন আমার সমান যোদ্ধা কেউ নেই, তাঁর অনেক দিব্যাস্ত্রও আছে; কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে প্রকাশ্যে যুদ্ধ করবেন না। পাণ্ডুপুত্রদের বিনষ্ট করা আমারও অকর্তব্য। যত দিন তাঁদের হাতে আমি না মরি তত দিন আমি প্রত্যহ পাণ্ডবপক্ষের দশ সহস্র যোদ্ধাকে বধ করব। কিন্তু কর্ণ সর্বদাই আমার সঙ্গে স্পর্ধা করেন, অতএব প্রথম সেনাপতি আমি না হয়ে তিনিই হ’তে পারেন। কর্ণ বললেন, ভীষ্ম জীবিত থাকতে আমি যুদ্ধ করব না, এঁর মৃত্যুর পর আমি অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করব।

দুর্যোধন রাশি রাশি উপহার দিয়ে ভীষ্মকে সেনাপতির পদে যথাবিধি অভিষিক্ত করলেন, শত সহস্র ভেরী ও শঙ্খ বেজে উঠল। এই সময়ে নানাপ্রকার অশুভ লক্ষণ দেখা গেল, বজ্রধ্বনি ভূমিকম্প উল্কাপাত ও রুধিরকর্দমবৃষ্টি হ’ল। যোদ্ধারা নিরুদ্যম হয়ে পড়লেন। তার পর ভীষ্মকে অগ্রবর্তী করে প্রচুর স্কন্ধাবার সহ দুর্যোধন প্রভৃতি কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন।