ভীষ্মপর্ব: ৯। কৃষ্ণের ক্রোধ

(তৃতীয় দিনের যুদ্ধ)

রাত্রি প্রভাত হ’লে কুরুপিতামহ ভীষ্ম গরুড় ব্যূহ এবং পাণ্ডবগণ অর্ধচন্দ্র ব্যূহ রচনা করলেন। দুই পক্ষের যুদ্ধ আরম্ভ হ’ল, দ্রোণরক্ষিত কৌরবব্যূহ এবং ভীমার্জুনরক্ষিত পাণ্ডবব্যূহ কোনোটি বিচ্ছিন্ন হ’ল না, সৈন্যগণ ব্যূহের অগ্রভাগ থেকে নির্গত হয়ে যুদ্ধ করতে লাগল। মনুষ্য অশ্ব ও হস্তীর মৃতদেহে এবং মাংসশোণিতের কদমে রণভূমি অগম্য হয়ে উঠল। জগতের বিনাশসূচক অসংখ্য কবন্ধ চতুর্দিকে উঠতে লাগল। কুরুপক্ষে ভীষ্ম দ্রোণ জয়দ্রথ পুরুমিত্র বিকর্ণ ও শকুনি, এবং পাণ্ডবপক্ষে ভীমসেন ঘটোৎকচ সাত্যকি চেদিরাজ ও দ্রৌপদীর পুত্রগণ বিপক্ষের সৈন্য বিদ্রাবিত করতে লাগলেন। ভীমের শরাঘাতে দুর্যোধন অচেতন হয়ে রথের উপর পড়ে গেলেন। তাঁর সারথি তাঁকে সত্তরে রণভূমি থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল, তাঁর সৈন্যরাও ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাল।

সংজ্ঞালাভ ক’রে দুর্যোধন ভীষ্মকে বললেন, পিতামহ, আপনি, অস্ত্রজ্ঞ গণের শ্রেষ্ঠ দ্রোণ, এবং মহাধনুর্ধর কৃপ জীবিত থাকতে আমাদের সৈন্য পালাচ্ছে, এ অতি অসংগত মনে করি। পাণ্ডবগণ কখনও আপনাদের সমান নয়, তারা নিশ্চয় আপনার অনুগ্রহভাজন তাই আমাদের সৈন্যক্ষয় আপনি উপেক্ষা করছেন। আপনার উচিত ছিল পূর্বেই আমাকে বলা যে পাণ্ডব, সাত্যকি ও ধৃষ্টদ্যুম্নের সঙে আপনি যুদ্ধ করবেন না। আপনার ড্রোণের ও কৃপের মনোভাব পূর্বে জানতে পারলে আমি কর্ণের সঙ্গেই কর্তব্য স্থির করতাম। যদি আপনারা আমাকে ত্যাগ না করে থাকেন তবে এখন যথাশক্তি যুদ্ধ করুন।

ক্রোধে চক্ষু বিস্ফারিত ক’রে ভীষ্ম সহাস্যে বললেন, রাজা, তোমাকে আমি বহু বার বলেছি যে পাণ্ডবগণ ইন্দ্রাদি দেবতারও অজেয়। আমি বৃদ্ধ, তথাপি যথাশক্তি যুদ্ধ করব, আজ আমি একাকীই পাণ্ডবগণকে তাদের সৈন্য ও রথ, সমেত প্রত্যাহত করব। ভীষ্মের এই প্রতিজ্ঞা শুনে দুর্যোধন ও তাঁর ভ্রাতারা আনন্দিত হয়ে শঙ্খ ও ভেরী বাজালেন।

সেই দিনে পূর্বাহ্ণ অতীত হলে ভীষ্ম বৃহৎ সৈন্যদল নিয়ে এবং দুর্যোধনাদি কর্তৃক রক্ষিত হয়ে পাণ্ডবসৈন্যের প্রতি ধাবিত হলেন। তাঁর শরবর্ষণে পীড়িত হয়ে পাণ্ডবগণের মহাসেনা প্রকম্পিত হ’ল, মহারথগণ পালাতে লাগলেন, অর্জুন প্রভৃতি চেষ্টা করেও তাদের নিবারণ করতে পারলেন না। পাণ্ডবসেনা ভগ্ন হ’ল, পালাবার সময়েও দু’জন একত্র রইল না, সকলে বিমূঢ় হয়ে হাহাকার করতে লাগল।

কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, পার্থ, তোমার আকাঙ্ক্ষিত কাল উপস্থিত হয়েছে, যদি মোহগ্রস্ত না হও তবে ভীষ্মকে প্রহার কর। অর্জুনের অনুরোধে কৃষ্ণ ভীষ্মের কাছে রথ নিয়ে গেলেন। তখন ভীষ্ম ও অর্জুনের ঘোর যুদ্ধ হতে লাগল। অর্জুনের হস্তলাঘব দেখে ভীষ্ম বললেন, সাধু পার্থ, সাধু পাূপুত্র! বৎস, আমি অতিশয় প্রীত হয়েছি, আমার সঙ্গে যুদ্ধ কর। এই সময়ে কৃষ্ণ অশ্বচালনায় পরম কৌশল দেখালেন, তিনি ভীষ্মের বাণ ব্যর্থ করে দ্রুতবেগে মণ্ডলাকারে রথ চালাতে লাগলেন।

ভীষ্মের পরাক্রম এবং অর্জুনের মৃদু যুদ্ধ দেখে ভগবান কেশব এই চিন্তা করলেন — যুধিষ্ঠির বলহীন হয়েছেন, তাঁর মহাসৈন্য ভগ্ন হয়ে পালাচ্ছে এবং কৌরবগণ হৃষ্ট হয়ে দ্রুতবেগে আসছে। তীক্ষ্ণ শরে আহত হয়েও অর্জুন নিজের কর্তব্য বুঝছেন না, ভীষ্মের গৌরব তাঁকে অভিভূত করেছে। আজ আমিই ভীষ্মকে বধ ক’রে পাণ্ডবদের ভার হরণ করব।

সাত্যকি দেখলেন, কৌরবগণের শত সহস্র অশ্বারোহী গজারোহী রথী ও পদাতি অর্জুনকে বেষ্টন করছে এবং ভীষ্মের শরবর্ষণে পীড়িত হয়ে বহু পাণ্ডবসৈন্য পালিয়ে যাচ্ছে। সাত্যকি বললেন, ক্ষত্রিয়গণ, কোথায় যাচ্ছ? পলায়ন সজ্জনের ধর্ম নয়, প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করো না, বীরধর্ম পালন কর। কৃষ্ণ বললেন, সাত্যকি, যারা যাচ্ছে তারা যাক, যারা আছে তারাও যাক। দেখ, আজ আমিই অনুচর সহ ভীষ্ম-দ্রোণকে নিপাতিত করব। এই পার্থসারথির কাছে কোনও কৌরব নিস্তার পাবে না, আজ আমি ভীষ্ম-দ্রোণাদি এবং ধার্তরাষ্ট্রগণকে বধ ক’রে অজাতশত্রু যুধিষ্ঠিরকে রাজপদে বসাব।

স্মরণমাত্র কৃষ্ণের হস্তাগ্রে সুদর্শন চক্র আরূঢ় হ’ল। তিনি রথ থেকে লাফিয়ে নেমে সেই ক্ষুরধার সূর্যপ্রভ সহস্রবর্তুলা চক্র ঘূর্ণিত করলেন, এবং সিংহ যেমন মদমত্ত হস্তীকে বধ করতে যায় সেইরূপ ভীষ্মের দিকে ধাবিত হলেন। কৃষ্ণের অঙ্গে লম্বমান পীতবর্ণ উত্তরীয়, তিনি বিদ্যুৎবেষ্টিত মেঘের ন্যায় সগর্জনে দজ্ঞোত্থে চক্ৰহস্তে আসছেন, এই দেখে কৌরবগণের বিনাশের ভয়ে সকলে আর্তনাদ ক’রে উঠল। ভীষ্ম তাঁর ধনুর জ্যকর্ষণে ক্ষান্ত হলেন এবং ধীরভাবে কৃষ্ণকে বললেন, দেবেশ জগন্নিবাস চক্ৰপাণি মাধব, এস এস, তোমাকে নমস্কার করি। সর্বশরণ্য লোকনাথ, আমাকে রথ থেকে নিপাতিত কর। কৃষ্ণ, তোমার হস্তে নিহত হলে আমি ইহলোকে ও পরলোকে শ্রেয়োলাভ করব। তুমি আমার প্রতি ধাবিত হয়েছ তাতেই আমি সর্বলোকের নিকট সম্মানিত হয়েছি।

অর্জুন রথ থেকে লাফিয়ে নেমে কৃষ্ণের দুই বাহু ধরলেন এবং প্রবল বায়ূতে বৃক্ষ যেমন চালিত হয় সেইরূপ কৃষ্ণ কর্তৃক কিছূদূর বেগে চালিত হলেন, তার পর কৃষ্ণের দুই চরণ ধরে তাকে সবলে নিবৃত্ত করলেন। অর্জুন প্রণাম ক’রে বললেন, কেশব, তুমিই পাণ্ডবদের গতি, ক্রোধ সংবরণ কর। আমি পুত্র ও ভ্রাতাদের নামে শপথ করছি, আমার প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘন করব না, তোমার নিয়োগ অনুসারে কৌরবগণকে বধ করব। কৃষ্ণ প্রসন্ন হয়ে আবার রথে উঠলেন এবং পাঞ্চজন্য শঙ্খ বাজিয়ে সর্ব দিক ও আকাশ নিনাদিত করলেন।

তার পর অর্জুন অতি ভয়ংকর মাহেন্দ্র অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। কৌরব-পক্ষের বহু পদতি অশ্ব রথ ও গজ বিনষ্ট হ’ল, রণভূমিতে রক্তের নদী বইতে লাগল। সূর্যাস্ত হলে ভীষ্ম দ্রোণ দুর্যোধন প্রভৃতি যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত হলেন। কৌরব সৈন্যগণ বলতে লাগল, আজ অর্জুন দশ হাজার রথী, সাত শ হস্তী এবং সমস্ত প্রাচ্য সৌবীর ক্ষুদ্রক ও মালব সৈন্য নিপাতিত করেছেন, তিনি একাকীই ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ ভূরিশ্রবা শল্য প্রভৃতি বীরগণকে জয় করেছেন। এই ব’লে তারা বহু সহস্র মশাল জ্বেলে ত্রস্ত হয়ে শিবিরে চলে গেল।