ভীষ্মপর্ব: ৮। ভীমার্জ্জনের কৌরবসেনাদলন

(দ্বিতীয় দিনের যুদ্ধ)

প্রথম দিনের যুদ্ধের পর যুধিষ্ঠির শোকার্ত হয়ে কৃষ্ণকে বললেন, গ্রীষ্মকালে অগ্নি যেমন তৃণরাশি দগ্ধ করে সেইরূপ ভীষ্ম আমাদের সৈন্য ধ্বংস করছেন। যম ইন্দ্র বরুণ ও কুবেরকেও জয় করা যায়, কিন্তু ভীষ্মকে জয় করা অসম্ভব। কেশব, আমি বুদ্ধির দোষে ভীষ্মরূপ অগাধ জলে মগ্ন হয়েছি। আমি বরং বনে যাব, সাক্ষাৎ মৃত্যুস্বরূপ ভীষ্মের কবলে আমার মিত্র এই নরপতিগণকে ফেলতে চাই না। মাধব, কিসে আমার মঙ্গল হবে বল। আমি দেখছি সব্যসাচী অর্জুন যুদ্ধে উদাসীন হয়ে আছেন, একমাত্র ভীমই ক্ষত্রধর্ম স্মরণ ক'রে যথাশক্তি যুদ্ধ করছেন, গদাঘাতে শত্রুর সৈন্য রথ অশ্ব ও হস্তী বিনষ্ট করছেন। কিন্তু এই সরল যুদ্ধে শত শত বৎসরেও ভীম শত্রুসেনা ক্ষয় করতে পারবেন না।

কৃষ্ণ বলিলেন, ভরতশ্রেষ্ঠ, আপনার শোক করা উচিত নয়; আমি, মহারথ সাত্যকি, বিরাট ও দ্রুপদ সকলেই আপনার প্রিয়কারী। এই রাজারা এবং এঁদের সৈন্যদল আপনার অনুরক্ত। এও শুনেছি যে শিখণ্ডী ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হবেন। কৃষ্ণের এই কথা শুনে যুধিষ্ঠির ধৃষ্টদ্যুম্নকে বললেন, তুমি বাসুদেবতুল্য যোদ্ধা, কার্তিকেয় যেমন দেবগণের সেনাপতি, সেইরূপ তুমি আমাদের সেনাপতি। পুরুষ- শার্দূল, তুমি কৌরবগণকে সংহার কর, আমরা সকলে তোমার অনুগমন করব। ধৃষ্টদ্যুম্ন বললেন, মহারাজ, মহাদেবের বিধানে আমিই দ্রোণের হন্তা, ভীষ্ম কৃপ দ্রোণ শল্য জয়দ্রথ সকলের সঙ্গেই আজ আমি যুদ্ধ করব।

যুধিষ্ঠিরের উপদেশে ধৃষ্টদ্যুম্ন ক্রৌঞ্চারুণ নামক ব্যুহ রচনা করলেন। পরদিন পুনর্বার যুদ্ধ আরম্ভ হ'ল, অভিমন্যু ভীমসেন সাত্যকি কেকয়রাজ বিরাট ধৃষ্টদ্যুম্ন এবং চেদি ও মৎস্য সেনার উপর ভীষ্ম শরবর্ষণ করতে লাগলেন। দুই পক্ষেরই ব্যুহ চঞ্চল হ'ল, পাণ্ডবদের বহু সৈন্য হত হ'ল, রথারোহী সৈন্য পালাতে লাগল। তখন অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন, ভীষ্মের কাছে রথ নিয়ে চল! অর্জুনের রথ বহু পতাকায় শোভিত, তার অশ্বসকল বলাকার ন্যায় শুভ্র, চক্রের ঘর্ঘর মেঘধ্বনির তুল্য, ধ্বজের উপর মহাকপি গর্জন করছেন। কৌরবপক্ষে ভীষ্ম কৃপ দ্রোণ শল্য দুর্যোধন ও বিকর্ণ এবং পাণ্ডবপক্ষে অর্জুন সাত্যকি বিরাট ধৃষ্টদ্যুম্ন ও দ্রৌপদীর পুত্রগণ যুদ্ধে নিরত হলেন।

অর্জুন বহু কৌরব সৈন্য বধ করছেন দেখে দুর্যোধন ভীষ্মকে বললেন, গাঙ্গেয়, আপনি ও রথিশ্রেষ্ঠ দ্রোণ জীবিত থাকতেও অর্জুন আমাদের সমস্ত সৈন্য উচ্ছেদ করছে, আমার হিতকামী কর্ণও আপনার জন্য অস্ত্রত্যাগ করেছেন। অর্জুন যাতে নিহত হয় আপনি সেই চেষ্টা করুন। এই কথা শুনে ভীষ্ম বললেন, ক্ষত্রধর্মকে ধিক! এই ব'লে তিনি অর্জুনের সম্মুখীন হলেন। তাঁদের ধনুর নিনাদে এবং রথচক্রের ঘর্ঘরে ভূমি কম্পিত শব্দিত ও বিদীর্ণ হতে লাগল। দেবতা গন্ধর্ব চারণ ও ঋষিগণ বললেন, এই দুই মহারথই অজেয়, এঁদের যুদ্ধ প্রলয়কাল পর্যন্ত চলবে।

ধৃষ্টদ্যুম্ন ও দ্রোণের মধ্যে ঘোর যুদ্ধ হতে লাগল। পাণ্ডবপক্ষীয় চেদি- সৈন্য বিপক্ষের কলিঙ্গ ও নিষাদ-সৈন্য কর্তৃক পরাভূত হয়েছে দেখে ভীমসেন কলিঙ্গসৈন্যের উপর শরাঘাত করতে লাগলেন। কলিঙ্গরাজ শ্রুতায়ু এবং তাঁর পুত্র শত্রুদেব ও ভানুম্মান ভীমকে বাধা দিতে এলেন। ভীম অসংখ্য সৈন্য বধ করছেন দেখে ভীষ্ম তাঁর কাছে এলেন এবং শরাঘাতে ভীমের অশ্বসকল বিনষ্ট করলেন। ভীম ভীষ্মের সারথিকে বধ করলেন, ভীষ্মের চার অশ্ব বায়ুবেগে তাঁর রথ নিয়ে রণভূমি থেকে চ’লে গেল। কলিঙ্গরাজ শ্রুতায়ু ও তাঁর দুই পুত্র ভীমের হস্তে সসৈন্যে নিহত হ’লেন।

দুর্যোধনপুত্র লক্ষ্মণের সংগে অভিমন্যুর যুদ্ধ হতে লাগল, দুর্যোধন ও অর্জুন নিজ নিজ পুত্রকে সাহায্য করতে এলেন। অর্জুনের শরাঘাতে অসংখ্য সৈন্য নিহত হ’তে এবং বহু যোদ্ধা পালাচ্ছে দেখে ভীষ্ম দ্রোণকে বললেন, এই কালান্তক যম তুল্য অর্জুনকে আজ কিছুতেই জয় করা যাবে না, আমাদের যোদ্ধারা ভ্রান্ত ও ভীত হয়েছে।

বিজয়ী পাণ্ডবগণ সিংহনাদ করতে লাগলেন। এই সময়ে সূর্যাস্ত হওয়ায় অবহার ঘোষিত হল।