ভীষ্মপর্ব: ১২। ভীমের জয়

(ষষ্ঠ দিনের যুদ্ধ)

পরদিন ধৃষ্টদ্যুম্ন মকর ব্যূহ এবং ভীষ্ম ক্রৌঞ্চ ব্যূহ নির্মাণ করলেন। ভীষ্ম-দ্রোণের সঙ্গে ভীমার্জুনের ঘোর যুদ্ধ হতে লাগল, তাঁদের শরবর্ষণে পীড়িত হয়ে দুই পক্ষের অসংখ্য সেনা পালিয়ে গেল।

যুদ্ধের বিবরণ শুনতে শুনতে ধৃতরাষ্ট্র বললেন, সঞ্জয়, আমার সৈন্যগণ বহুগুণসম্পন্ন, তারা অতিবৃদ্ধ বা বালক নয়, কৃশ বা স্থূল নয়, তারা ক্ষিপ্রকারী দীর্ঘাকার দৃঢ়দেহ ও নীরোগ। তারা সর্বপ্রকার অস্ত্রপ্রয়োগে শিক্ষিত এবং হস্তী অশ্ব ও রথ চালনায় নিপুণ। পরীক্ষা ক’রে উপযুক্ত বেতন দিয়ে তাদের নিযুক্ত করা হয়েছে, গোষ্ঠী (আড্ডা) থেকে তাদের আনা হয় নি, বন্ধুদের অনুরোধেও নেওয়া হয় নি। সেনাপতির কর্মে অভিজ্ঞ বিখ্যাত মহারথগণ তাদের নেতা, তথাপি যুদ্ধের বিপরীত ফল দেখা যাচ্ছে। হয়তো দেবতারাই পাণ্ডবপক্ষে যুদ্ধে নেমে আমার সৈন্য সংহার করছেন। বিদুর সর্বদাই হিতবাক্য বলেছেন, কিন্তু আমার মূর্খ পুত্র তা শোনে নি। বিধাতা যা নির্দিষ্ট করেছেন তার অন্যথা হবে না।

সঞ্জয় বললেন, মহারাজ, আপনার দোষেই দ্যূতক্রীড়া হয়েছিল, তার ফল এই যুদ্ধ। আপনি এখন নিজ কর্মের ফল ভোগ করছেন। তার পর সঞ্জয় পুনর্বার যুদ্ধবিবরণ বলতে লাগলেন।

ভীম রথ থেকে নেমে তাঁর সারথিকে অপেক্ষা করতে বললেন এবং কৌরবসেনার মধ্যে প্রবেশ ক’রে গদাঘাতে হস্তী অশ্ব রথী ও পদাতি বিনষ্ট করতে লাগলেন। ভীমের শূন্য রথ দেখে ধৃষ্টদ্যুম্ন উদ্বিগ্ন হয়ে ভীমের কাছে গেলেন এবং তাঁর দেহে বিদ্ধ বাণসকল তুলে ফেলে তাঁকে আলিঙ্গন ক’রে নিজের রথে উঠিয়ে নিলেন। দুর্যোধন ও তাঁর ভ্রাতারা ধৃষ্টদ্যুম্নকে আক্রমণ করলেন। ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রমোহন অস্ত্র প্রয়োগ করলেন, তাতে দুর্যোধনাদি মূর্ছিত হয়ে প’ড়ে গেলেন। এই অবকাশে ভীমসেন বিশ্রাম ও জলপান ক’রে সুস্থ হলেন এবং ধৃষ্টদ্যুম্নের সহযোগে আবার যুদ্ধ করতে লাগলেন। দুর্যোধনাদির অবস্থা শুনে দ্রোণাচার্য সত্বর এলেন এবং প্রজ্ঞাশস্ত্র দ্বারা প্রমোহন অস্ত্রের প্রভাব নষ্ট করলেন।

যুধিষ্ঠিরের আদেশে অভিমন্যু, দ্রৌপদীর পুত্রগণ ও ধৃষ্টকেতু সসৈন্যে ভীম ও ধৃষ্টদ্যুম্নকে সাহায্য করতে এলেন এবং সূচীমুখ ব্যূহ রচনা ক’রে কুরুসেনামধ্যে প্রবেশ করলেন। তখন দ্রোণ ও দুর্যোধনাদির সঙ্গে ভীমসেন ও ধৃষ্টদ্যুম্নের প্রবল যুদ্ধ হচ্ছিল।

অপরাহ্ন আগত হ’ল, ভাস্কর লোহিত বর্ণ ধারণ করলেন। ভীম দুর্যোধনকে বললেন, বহু বর্ষ যার কামনা করেছি সেই কাল এখন এসেছে, যদি যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত না হও তো আজ তোমাকে বধ করব, জননী কুন্তী ও দ্রৌপদীর সকল ক্লেশ এবং বনবাসের কষ্টের প্রতিশোধ নেব। আজ তোমাকে সবান্ধবে বধ ক’রে তোমার সমস্ত পাপের শাস্তি করাব। ভীমের শরাঘাতে দুর্যোধনের ধনু ছিন্ন, সারথি আহত, এবং চার অশ্ব নিহত হ’ল। দুর্যোধন শরবিদ্ধ হয়ে মূর্ছিত হলেন, কৃপাচার্য তাঁকে নিজের রথে উঠিয়ে নিলেন।

অভিমন্যু এবং দ্রৌপদীপুত্র শ্রুতকর্মা, শ্রুতসোম শ্রুতসেন ও শতানীকের শরাঘাতে দুর্যোধনের চার ভ্রাতা বিকর্ণ দুর্মুখ জয়ৎসেন ও দুষ্কর্ণ বিদ্ধ হয়ে ভূপতিত হলেন। সূর্যাস্তের পরেও কিছুক্ষণ যুদ্ধ চলল, তার পর অবহার ঘোষিত হ’লে কৌরব ও পাণ্ডবগণ নিজ নিজ শিবিরে ফিরে গেলেন।