ভীষ্মপর্ব: ১৩। বিরাটপুত্র শঙ্খের মৃত্যু — ইরাবান ও নকুল-সহদেবের জয়
(সপ্তম দিনের যুদ্ধ)
রক্তাভদেহে চিন্তাকুলমনে দুর্যোধন ভীষ্মের কাছে গিয়ে বললেন, পাণ্ডবরা আমাদের ব্যূহবদ্ধ বীর সৈন্যগণকে নিপীড়িত ক’রে হৃষ্ট হয়েছে। আমাদের মকর ব্যূহের ভিতরে এসে ভীম আমাকে পরাস্ত করেছে, তার ক্রোধ দেখে আমি মূর্ছিত হয়েছিলাম, এখনও আমি শান্তি পাচ্ছি না। সত্যসন্ধ পিতামহ, আপনার প্রসাদে যেন পাণ্ডবগণকে বধ ক’রে আমি জয়লাভ করতে পারি। ভীষ্ম হেসে বললেন, রাজপুত্র, আমি নিজের মনোভাব গোপন করছি না, সর্বপ্রযত্নে তোমাকে বিজয়ী ও সুখী করতে ইচ্ছা করি। কিন্তু পাণ্ডবদের সহায় হয়ে যাঁরা ক্রোধবিষ উদ্গার করছেন তাঁরা সকলেই মহারথ অস্ত্রবিশারদ ও বলগর্বিত, তুমি পূর্বে তাঁদের সঙ্গে শত্রুতাও করেছিলে। তোমার জন্য আমি প্রাণপণে যুদ্ধ করব, নিজের জীবনরক্ষার চেষ্টা করব না। পাণ্ডবগণ ইন্দ্রের তুল্য বিক্রমশালী, বাসুদেব তাঁদের সহায়, তাঁরা দেবগণেরও অজেয়। তথাপি আমি তোমার কথা রাখব, হয় আমি পাণ্ডবদের জয় করব নতুবা তাঁরা আমাকে জয় করবেন।
ভীষ্ম দুর্যোধনকে বিশল্যকরণী ওষধি দিলেন, তার প্রয়োগে দুর্যোধন সুস্থ হলেন। পরদিন ভীষ্ম মণ্ডল ব্যূহ এবং যুধিষ্ঠির বজ্র ব্যূহ রচনা করলেন। যুদ্ধকালে অর্জুনের বিক্রম দেখে দুর্যোধন স্বপক্ষের রাজাদের বললেন, শান্তনুপুত্র ভীষ্ম জীবনের মায়া ত্যাগ করে অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন, আপনারা সকলে ভীষ্মকে রক্ষা করুন। রাজারা তখনই সসৈন্যে ভীষ্মের কাছে গেলেন।
দ্রোণ ও বিরাট পরস্পরকে শরাঘাত করতে লাগলেন। বিরাটের অশ্ব ও সারথি বিনষ্ট হলে তিনি তাঁর পুত্র শঙ্খের রথে উঠলেন। দ্রোণ এক আশীবিষতুল্য বাণ নিক্ষেপ করলেন, তার আঘাতে শঙ্খ নিহত হয়ে পড়ে গেলেন। তখন ভীত বিরাট কালান্তক যমতুল্য দ্রোণকে ত্যাগ করে চলে গেলেন।
সাত্যকির ঐন্দ্র অস্ত্রে রাক্ষস অলম্বুষ রণস্থল থেকে বিতাড়িত হ’ল। ধৃষ্টদ্যুম্নের শরাঘাতে দুর্যোধনের রথের অশ্ব বিনষ্ট হ’ল, শকুনি তাঁকে নিজের রথে তুলে নিলেন। অবন্তিদেশীয় বিন্দ ও অনুবিন্দ অর্জুনপুত্র ইরাবানের (১) সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। অনুবিন্দের চার অশ্ব নিহত হ’ল, তিনি বিন্দের রথে উঠলেন। ইরাবান বিন্দের সারথিকে বধ করলেন, তখন বিন্দের অশ্বসকল উদ্ভ্রান্ত হয়ে রথ নিয়ে চার দিকে ছুটতে লাগল। ভগদত্তের সহিত যুদ্ধে ঘটোৎকচ পরাস্ত হয়ে পালিয়ে গেলেন। শল্য ও তাঁর দুই ভাগিনেয় নকুল-সহদেব পরম প্রীতি সহকারে যুদ্ধ করতে লাগলেন। শল্য সহাস্যে বাণ দ্বারা নকুলের রথধ্বজ ও ধনু ছিন্ন এবং সারথি ও অশ্ব নিপাতিত করলেন, নকুল সহদেবের রথে উঠলেন। তখন সহদেব মহাবেগে এক শর নিক্ষেপ ক’রে মাতুলের দেহ ভেদ করলেন, শল্য অচেতন হয়ে রথমধ্যে পড়ে গেলেন, তাঁর সারথি তাঁকে নিয়ে রণস্থল থেকে চলে গেল।
চেকিতান ও কৃপাচার্য্যের রথ নষ্ট হওয়ায় তাঁরা ভূমিতে যুদ্ধ করছিলেন। তাঁরা পরস্পরের খড়্গাঘাতে আহত হয়ে মূর্চ্ছিত হলেন, শিশুপালপুত্র করকর্ষ ও শকুনি নিজ নিজ রথে তাঁদের তুলে নিলেন।
ভীষ্ম শিখণ্ডীর ধনুচ্ছেদ করলেন। যুধিষ্ঠির ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, শিখণ্ডী, তুমি তোমার পিতার সম্মুখে প্রতিজ্ঞা করেছিলে যে ভীষ্মকে বধ করবে। তোমার প্রতিজ্ঞা যেন মিথ্যা না হয়, স্বধর্ম যশ ও কুলমর্য্যাদা রক্ষা কর। ভীষ্মের কাছে পরাস্ত হয়ে তুমি নিরুৎসাহ হয়েছ। ভ্রাতা ও বন্ধুদের ছেড়ে কোথায় যাচ্ছ? তোমার বীর খ্যাতি আছে, তবে ভীষ্মকে ভয় করছ কেন?
যুধিষ্ঠিরের ভর্ৎসনায় লজ্জিত হয়ে শিখণ্ডী পুনর্ব্বার ভীষ্মের প্রতি ধাবিত হলেন। শল্য আগ্নেয় অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন, শিখণ্ডী তা বরুণাস্ত্র দিয়ে প্রতিহত করলেন। তার পর শিখণ্ডী ভীষ্মের সম্মুখীন হলেন, কিন্তু তাঁর পূর্ব্বের স্ত্রীত্ব স্মরণ করে ভীষ্ম শিখণ্ডীকে অগ্রাহ্য করলেন।
সূর্য্যাস্ত হ’লে পাণ্ডব ও কৌরবগণ রণস্থল ত্যাগ করে নিজ নিজ শিবিরে গিয়ে পরস্পরের প্রশংসা করতে লাগলেন। তার পর তাঁরা দেহ থেকে শল্য (বাণাগ্র প্রভৃতি) তুলে ফেলে নানাবিধ জলে স্নান করে স্বস্ত্যয়ন করলেন। স্তুতিপাঠক বন্দী এবং গায়ক ও বাদকগণ তাঁদের মনোরঞ্জন করতে লাগল। সমস্ত শিবির যেন স্বর্গতুল্য হ’ল, কেউ যুদ্ধের আলোচনা করলেন না। তার পর তাঁরা শ্রান্ত হয়ে নিদ্রিত হলেন।