ভীষ্মপর্ব: ১৮। শরশয্যায় ভীষ্ম
ভীষ্ম শরশয্যায় শয়ন করলে কৌরব ও পাণ্ডবগণ যুদ্ধে নিবৃত্ত হলেন। সকলে বলতে লাগলেন, ইনি ব্রহ্মবিদ্গণের শ্রেষ্ঠ, এই মহাপুরুষ পিতা শান্তনুকে কামার্ত জেনে নিজে ঊর্ধ্বরেতা হয়েছিলেন। পাণ্ডবসৈন্যমধ্যে সহস্র সহস্র তূর্য ও শঙ্খ বাজতে লাগল, ভীমসেন মহারষে ক্রীড়া করতে লাগলেন। দুঃশাসনের মুখে ভীষ্মের পতনসংবাদ শুনে দ্রোণ মূর্ছিত হলেন এবং সংজ্ঞালাভের পর নিজ সৈন্যগণকে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করলেন। রাজারা বর্ম ত্যাগ ক'রে ভীষ্মের নিকট উপস্থিত হলেন, কৌরব ও পাণ্ডবগণ তাঁকে প্রণাম করে সম্মুখে দাঁড়ালেন।
সকলকে স্বাগত সম্ভাষণ ক'রে ভীষ্ম বললেন, মহর্ষিগণ, তোমাদের দর্শন ক'রে আমি তুষ্ট হয়েছি। আমার মাথা ঝুলছে, উপধান (বালিশ) দাও। রাজারা কোমল উত্তম উপধান নিয়ে এলে ভীষ্ম সহাস্যে বললেন, এসব উপধান বীরশয্যার উপযুক্ত নয়। তিনি অর্জুনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে অর্জুন অশ্রুপূর্ণনয়নে বললেন, পিতামহ, আদেশ করুন কি করতে হবে। ভীষ্ম বললেন, বৎস, তুমি ক্ষত্রধর্ম জান, বীরশয্যার উপযুক্ত উপধান আমাকে দাও। মন্ত্রপূত তিন বাণ গাণ্ডীব ধনু দ্বারা নিক্ষেপ ক'রে অর্জুন ভীষ্মের মাথা তুলে দিলেন। ভীষ্ম তুষ্ট হ'য়ে বললেন, রাজগণ, অর্জুন আমাকে কিরূপ উপধান দিয়েছেন দেখ। উত্তরায়ণের আরম্ভ পর্যন্ত আমি এই শয্যায় শুয়ে থাকব, সূর্য যখন উত্তর দিকে গিয়ে সর্বলোক প্রতপ্ত করবেন তখন আমার প্রিয় সুহৃৎ তুল্য প্রাণ ত্যাগ করব। তোমরা আমার চতুর্দিকে পরিখা খনন করিয়ে দাও।
শল্য উদ্ধারে নিপুণ বৈদ্যগণ চিকিৎসার উপকরণ নিয়ে উপস্থিত হলেন। ভীষ্ম দুর্যোধনকে বললেন, তুমি এঁদের উপযুক্ত ধন দিয়ে সসম্মানে বিদায় কর। বৈদ্যের প্রয়োজন নেই, আমি ক্ষত্রিয়ের প্রশস্ত গতি লাভ করেছি, এই সকল শর সমেত যেন আমাকে দাহ করা হয়। সমাগত রাজারা এবং কৌরব ও পাণ্ডবগণ ভীষ্মকে অভিবাদন ও তিন বার প্রদক্ষিণ করলেন, তার পর তাঁর রক্ষার ব্যবস্থা ক'রে শোকার্ত মনে নিজ নিজ শিবিরে চলে গেলেন।
রাত্রি প্রভাত হ'লে সকলে পুনর্বার ভীষ্মের নিকটে এলেন। বহু সহস্র কন্যা ভীষ্মের দেহে চন্দনচূর্ণ লাজ ও মাল্য অর্পণ করতে লাগল। স্ত্রী বালক বৃদ্ধ তূর্যবাদক নট নর্তক ও শিল্পিগণও তাঁর কাছে এল। কৌরব ও পাণ্ডবগণ বর্ম ও আয়ুধ ত্যাগ ক'রে পূর্বের ন্যায় পরস্পর প্রীতিসহকারে বয়স অনুসারে ভীষ্মের নিকট উপস্থিত হলেন। ধৈর্যবলে বেদনা নিগৃহীত ক'রে ভীষ্ম রাজাদের দিকে দৃষ্টিপাত ক'রে জল চাইলেন। সকলে নানাপ্রকার খাদ্য ও শীতল জলের কলস নিয়ে এলেন। ভীষ্ম বললেন, বৎসগণ, আমি মানুষের ভোগ্য বস্তু নিতে পারি না। তার পর তিনি অর্জুনকে বললেন, তোমার বাণে আমার শরীর গ্রথিত হয়েছে, বেদনায় মুখ শুষ্ক হচ্ছে, তুমি আমাকে বিধিসম্মত জল দাও।
ভীষ্মকে প্রদক্ষিণ ক'রে অর্জুন রথে উঠলেন এবং মন্ত্রপাঠের পর গাণ্ডীবে পর্জ্জন্যাস্ত্রযুক্ত বাণ সন্ধান ক'রে ভীষ্মের দক্ষিণ পার্শ্বের ভূমি বিদ্ধ করলেন। সেখান থেকে অমৃততুল্য দিব্যগন্ধ স্বাদু নির্মল শীতল জলধারা উত্থিত হ'ল, অর্জুন সেই জলে ভীষ্মকে তৃপ্ত করলেন। রাজারা বিস্মিত হ'য়ে উত্তরীয় নাড়তে লাগলেন, চতুর্দিকে তুমুল রবে শঙ্খ ও দুন্দুভি বেজে উঠল।
ভীষ্ম দুর্যোধনকে বললেন, বৎস, তুমি অর্জুনকে জয় করতে পারবে না, তাঁর সঙ্গে সন্ধি কর। পাণ্ডবদের সঙ্গে তোমার সৌহার্দ্য হ'ক, তুমি তাদের অর্ধ রাজ্য দাও, যুধিষ্ঠির ইন্দ্রপ্রস্থে যান, তুমি মিত্রদ্রোহী হ’য়ে অকীর্তি ভোগ কোরো না। আমার মৃত্যুতেই প্রজাদের শান্তি হ’ক, রাজারা প্রীতির সহিত মিলিত হ’ন, পিতা পুত্রকে, মাতুল ভাগিনেয়কে, ভ্রাতা ভ্রাতাকে লাভ করুন। মুমূর্ষু লোকের যেমন ঔষধে রুচি হয় না, দুর্যোধনের সেইরূপ হিতবাক্যে রুচি হ’ল না।
ভীষ্ম নীরব হ’লে সকলে পুনর্বার নিজ নিজ শিবিরে ফিরে গেলেন। এই সময়ে কর্ণ কিঞ্চিৎ ভীত হয়ে ভীষ্মের কাছে এলেন এবং তাঁর চরণে পতিত হয়ে বাষ্পরুদ্ধকন্ঠে বললেন, কুরুশ্রেষ্ঠ, আমি রাধেয় কর্ণ, নিরপরাধ হয়েও আমি আপনার বিদ্বেষভাজন। ভীষ্ম সবলে তাঁর চক্ষু উন্মীলিত ক’রে দেখলেন, তাঁর সন্নিকটে আর কেউ নেই। তিনি রক্ষীদের সরিয়ে দিলেন এবং এক হস্তে পিতার ন্যায় কর্ণকে আলিঙ্গন ক’রে সস্নেহে বললেন, তুমি যদি আমার কাছে না আসতে তবে নিশ্চয়ই তা ভাল হ’ত না। আমার সঙ্গে স্পর্ধা করতে সেজন্য তুমি আমার অপ্রিয় হও নি। আমি নারদের কাছে শুনেছি তুমি কুন্তীপুত্র, সূর্য হতে তোমার জন্ম। সত্য বলছি, তোমার প্রতি আমার বিদ্বেষ নেই। তুমি অকারণে পাণ্ডবদের দ্বেষ কর, নীচস্বভাব দুর্যোধনের আশ্রয়ে থেকে তুমি পরশ্রীকাতর হয়েছ। তোমার তেজোহানি করবার জন্যই আমি তোমাকে কুরুসভায় বহুবার কটু কথা শুনিয়েছি। আমি তোমার দুঃসহ বীরত্ব, বদান্যতা এবং দানের বিষয় জানি, অস্ত্রপ্রয়োগে তুমি কৃষ্ণের তুল্য। পূর্বে তোমার উপর আমার যে ক্রোধ ছিল তা দূর হয়েছে। পাণ্ডবগণ তোমার সহোদর, তুমি তাঁদের সঙ্গে মিলিত হও, আমার পতনেই শত্রুতার অবসান হ’ক, পৃথিবীর রাজারা নিরাময় হ’ন।
কর্ণ বললেন, মহাবাহু, আপনি যা বললেন তা আমি জানি। কিন্তু কুন্তী আমাকে ত্যাগ করলে সূতজাতীয় অধিরথ আমাকে বর্ধিত করেছিলেন। আমি দুর্যোধনের ঐশ্বর্য ভোগ করেছি, তা নিষ্ফল করতে পারি না। বাসুদেব যেমন পাণ্ডবদের জয়ের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আমিও সেইরূপ দুর্যোধনের জন্য ধন শরীর পুত্র দ্বারা সমস্তই উৎসর্গ করেছি। আমি ক্ষত্রিয়, রোগ ভোগ করে মরতে চাই না, সেজন্যই দুর্যোধনকে আশ্রয় ক’রে পাণ্ডবদের ক্রোধ বৃদ্ধি করেছি। যা অবশ্যম্ভাবী তা নিবারণ করা যাবে না। এই দারুণ শত্রুতার অবসান করা আমার অসাধ্য, আমি স্বধর্ম রক্ষা ক’রেই ধনঞ্জয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করব। পিতামহ, আমি যুদ্ধে কৃতনিশ্চয় হয়েছি, আমাকে অনুমতি দিন। হঠাৎ বা চপলতার বশে আপনাকে যে কটু বাক্য বলেছি বা অন্যায় করেছি তা ক্ষমা করুন।
ভীষ্ম বললেন, কর্ণ, তুমি যদি এই দারুণ বৈরভাব দূর করতে না পার তবে অনুমতি দিচ্ছি, স্বর্গকামনায় যুদ্ধ কর। আক্রোশ ত্যাগ কর, সদাচার রক্ষা কর, নিরহংকার হয়ে যথাশক্তি যুদ্ধ ক'রে ক্ষত্রিয়োচিত লোক লাভ কর। ধর্মযুদ্ধ ভিন্ন ক্ষত্রিয়ের পক্ষে মঙ্গলকর আর কিছু নেই। দুই পক্ষের শান্তির জন্য আমি দীর্ঘকাল বহু যত্ন করেছি, কিন্তু তা সফল হ'ল না।
ভীষ্মকে অভিবাদন ক'রে কর্ণ সরোদনে রথে উঠে দুর্যোধনের কাছে চলে গেলেন।