ভীষ্মপর্ব: ১৭। ভীষ্মের পতন
( দশম দিনের যুদ্ধ )
পরদিন সূর্যোদয় হ'লে পাণ্ডবগণ সর্বশত্রুজয়ী ব্যূহ রচনা ক'রে শিখণ্ডীকে সম্মুখে রেখে যুদ্ধ করতে গেলেন। ভীম অর্জুন দ্রৌপদীপুত্রগণ অভিমন্যু সাত্যকি চেকিতান ও ধৃষ্টদ্যুম্ন ব্যূহের বিভিন্ন স্থানে রইলেন। যুধিষ্ঠির নকুল-সহদেব বিরাট কেকয়-পঞ্চভ্রাতা ও ধৃষ্টকেতু পশ্চাতে গেলেন। ভীষ্ম কৌরবসেনার অগ্রভাগে রইলেন; দুর্যোধনাদি দ্রোণ অশ্বত্থামা কৃপ ভগদত্ত কৃতবর্মা শকুনি বৃহদ্বল প্রভৃতি পশ্চাতে গেলেন।
শিখণ্ডীকে অগ্রবর্তী ক'রে অর্জুন প্রভৃতি শরবর্ষণ করতে করতে ভীষ্মের প্রতি ধাবিত হলেন। ভীম নকুল সহদেব সাত্যকি প্রভৃতি মহারথগণ কৌরবসেনা ধ্বংস করতে লাগলেন। ভীষ্ম জীবনের আশা ত্যাগ ক'রে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন, তাঁর শরাঘাতে পাণ্ডবপক্ষের বহু রথী অশ্বারোহী গজারোহী ও পদাতি বিনষ্ট হ'ল। শিখণ্ডী তাঁকে শরাঘাত করলে ভীষ্ম একবার মাত্র তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত ক'রে সহাস্যে বললেন, তুমি আমাকে প্রহার কর বা না কর আমি তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করব না, বিধাতা তোমাকে শিখণ্ডিনী রূপে সৃষ্টি করেছিলেন, এখনও তুমি তাই আছ। ক্রোধে ওষ্ঠপ্রান্ত লেহন ক'রে শিখণ্ডী বললেন, মহাবাহু, আপনার পরাক্রম যে ভয়ংকর তা আমি জানি, জামদগ্ন্য পরশুরামের সঙ্গে আপনার যুদ্ধের বিষয়ও জানি, তথাপি নিজের এবং পাণ্ডবগণের প্রিয়সাধনের জন্য নিশ্চয়ই আপনাকে বধ করব। আপনি যুদ্ধ করুন বা না করুন, আমার কাছ থেকে জীবিত অবস্থায় মুক্তি পাবেন না, অতএব এই পৃথিবী ভাল ক'রে দেখে নিন।
অর্জুন শিখণ্ডীকে বললেন, তুমি ভীষ্মকে আক্রমণ কর, আমি তোমাকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করব, তোমাকে কেউ পীড়ন করতে পারবে না। আজ যদি ভীষ্মকে বধ না ক'রে ফিরে যাও তবে তুমি আর আমি লোকসমাজে হাস্যস্পদ হব।
অর্জুনের শঙ্খধ্বনে কৌরবসেনা ত্রস্ত হ'য়ে পালাচ্ছে দেখে দুর্যোধন ভীষ্মকে বললেন, পিতামহ, অগ্নি যেমন বন দগ্ধ করে সেইরূপ অর্জুন আমার সেনা বিধ্বস্ত করছেন, ভী: সাত্যকি নকুল-সহদেব অভিমন্যু ধৃষ্টদ্যুম্ন ঘটোৎকচ প্রভৃতিও সৈন্য নিপীড়ন করছেন, আপনি রক্ষা করুন। মুহূর্তকাল চিন্তা করে ভীষ্ম বললেন, দুর্যোধন, আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে প্রতিদিন দশ সহস্র ক্ষত্রিয় বিনষ্ট করে রণস্থল হ'তে ফিরব, সেই প্রতিজ্ঞা আমি পালন করেছি। আজ আমি আর এক মহৎ কর্ম করব, হয় নিহত হয়ে রণভূমিতে শয়ন করব, না হয় পাণ্ডবগণকে বধ করব। রাজা, তুমি আমাকে অন্নদান করেছ, সেই মহৎ ঋণ আজ তোমার সেনার সম্মুখে নিহত হ'য়ে শোধ করব।
ভীম নকুল সহদেব ঘটোৎকচ সাত্যকি অভিমন্যু বিরাট দ্রুপদ যুধিষ্ঠির, শিখণ্ডীর পশ্চাতে অর্জুন, এবং সেনাপতি ধৃষ্টদ্যুম্ন সকলেই ভীষ্মকে বধ করবার জন্য ধাবিত হলেন। ভূরিশ্রবা বিকর্ণ কৃপ দুর্মুখ অলম্বুষ, কম্বোজরাজ সুদক্ষিণ, অশ্বত্থামা দ্রোণ দুঃশাসন প্রভৃতি ভীষ্মকে রক্ষা করতে লাগলেন। দ্রোণ তাঁর পুত্র অশ্বত্থামাকে বললেন, বৎস, আমি নানাপ্রকার দুর্নিমিত্ত দেখতে পাচ্ছি, ভীষ্ম ও অর্জুন যুদ্ধে মিলিত হবেন এই চিন্তা ক'রে আমার রোমহর্ষ হচ্ছে মন অবসন্ন হচ্ছে। পাপমতি শঠ শিখণ্ডীকে সম্মুখে রেখে অর্জুন যুদ্ধ ক'রতে এসেছেন, কিন্তু শিখণ্ডী পূর্বে স্ত্রী ছিল এজন্য ভীষ্ম তাকে প্রহার করবেন না। অর্জুন সকল যোদ্ধার শ্রেষ্ঠ, ইন্দ্রাদি দেবগণেরও অজেয়। আজ যুদ্ধে সংক্ষয় মহামারী হবে। পুত্র, উপজীবীর (পর আশ্রিত) জনের প্রাণরক্ষার সময় এ নয়, তুমি স্বৰ্গলাভের উদ্দেশ্যে এবং যশ ও বিজয়ের নিমিত্ত যুদ্ধে যাও। ভীমার্জুন নকুল-সহদেব যাঁর ভ্রাতা, বাসুদেব যাঁর রক্ষক, সেই যুধিষ্ঠিরের ক্রোধই দুর্মতি দুর্যোধনের বাহিনী দগ্ধ করছে। কৃষ্ণের আশ্রয়ে অর্জুন দুর্যোধনের সম্মুখেই তাঁর সৰ্ব সৈন্য দীর্ণ করছেন। বৎস, তুমি অর্জুনের পথে থেকো না, শিখণ্ডী ধৃষ্টদ্যুম্ন ও ধৃ: সেন সঙ্গে যুদ্ধ কর, আমি যুধিষ্ঠিরের দিকে যাচ্ছি। প্রিয়পুত্রের দীর্ঘ জীবন কে না চায়, তথাপি ক্ষত্রধর্ম বিচার ক'রে তোমাকে যুদ্ধে পাঠাচ্ছি।
দশ দিন পাণ্ডববাহিনী নিপীড়িত ক'রে ধর্মাত্মা ভীষ্ম নিজের জীবনের প্রতি বিরক্ত হয়েছিলেন। তিনি স্থির করলেন, আমি আর নরশ্রেষ্ঠগণকে হত্যা করব না। নিকটে যুধিষ্ঠিরকে দেখে তিনি বললেন, বৎস, আমার এই দেহের উপর অত্যন্ত বিরাগ জন্মেছে, আমি যুদ্ধে বহু প্রাণী বধ করেছি। এখন অর্জুন এবং পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণকে অগ্রবর্তী ক'রে আমাকে বধ করবার চেষ্টা কর। ভীষ্মের এই কথা শুনে যুধিষ্ঠির ও ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁদের সৈন্যগণকে বললেন, তোমরা ধাবিত হ’য়ে ভীষ্মকে জয় কর, অর্জুন তোমাদের রক্ষা করবেন।
এই দশম দিনের যুদ্ধে ভীষ্ম একাকী অসংখ্য অশ্ব ও গজ, সাত মহারথ, পাঁচ হাজার রথী, চৌদ্দ হাজার পদাতি এবং বহু গজারোহী ও অশ্বারোহী সংহার করলেন। বিরাট রাজার ভ্রাতা শতানীক এবং বহু সহস্র ক্ষত্রিয় ভীষ্ম কর্তৃক নিহত হলেন। শিখণ্ডীকে সম্মুখে রেখে অর্জুন ভীষ্মকে শরাঘাত করতে লাগলেন। ভীষ্ম ক্ষিপ্রগতিতে বিভিন্ন যোদ্ধাদের মধ্যে বিচরণ করে পাণ্ডবগণের নিকটে এলেন। অর্জুন বার বার ভীষ্মের ধনু ছেদন করলেন। ভীষ্ম ক্রুদ্ধ হ’য়ে অর্জুনের প্রতি এক ভয়ঙ্কর শক্তি-অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন, অর্জুন পাঁচ ভল্লের আঘাতে তা খণ্ড খণ্ড করে দিলেন।
ভীষ্ম এই চিন্তা করলেন—কৃষ্ণ যদি এদের রক্ষক না হতেন তবে আমি এক ধনু দিয়েই পাণ্ডবপক্ষ বিনষ্ট করতে পারতাম। পিতা (শান্তনু) যখন সত্যবতীকে বিবাহ করেন তখন তুষ্ট হ’য়ে আমাকে দুই বর দিয়েছিলেন, ইচ্ছামৃত্যু ও যুদ্ধে অবধ্যত্ব। আমার মনে হয় এই আমার মৃত্যুর উপযুক্ত কাল। ভীষ্মের সংকল্প জেনে আকাশ থেকে ঋষিগণ ও বসুগণ বললেন, বৎস, তুমি যা স্থির করেছ তা আমাদেরও প্রীতিকর, তুমি যুদ্ধে বিরত হও। তখন জলকণাযুক্ত সুগন্ধ সুখস্পর্শ বায়ু বইতে লাগল, মহাশব্দে দেবদুন্দুভি বেজে উঠল, ভীষ্মের উপর পুষ্পবৃষ্টি হ’ল। কিন্তু ভীষ্ম এবং ব্যাসদেবের বরে সঞ্জয় ভিন্ন আর কেউ তা জানতে পারলে না।
ভীষ্ম অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধে বিরত হলেন। শিখণ্ডী নয়টি তীক্ষ্ণ বাণ দিয়ে তাঁর বক্ষে আঘাত করলেন, কিন্তু ভীষ্ম বিচলিত হলেন না। তখন অর্জুন ভীষ্মের প্রতি বহু বাণ নিক্ষেপ করতে লাগলেন। ভীষ্ম ঈষৎ হাস্য ক’রে দুঃশাসনকে বললেন, এইসকল মর্মভেদী বজ্রতুল্য বাণ নিরবচ্ছিন্ন হ’য়ে আসছে, এ বাণ শিখণ্ডীর নয়, অর্জুনেরই। ভীষ্ম একটি শক্তি-অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন, অর্জুনের শরাঘাতে তা তিন খণ্ড হ’ল। ভীষ্ম তখন চর্ম (ঢাল) ও খড়্গ নিয়ে রথ থেকে নামবার উপক্রম করলেন। অর্জুনের বাণে চর্ম শত খণ্ডে ছিন্ন হ’ল। যুধিষ্ঠিরের আদেশে পাণ্ডবসৈন্যগণ নানা অস্ত্র নিয়ে চতুর্দিক থেকে ভীষ্মের প্রতি ধাবিত হল, দুর্যোধনাদি ভীষ্মকে রক্ষা করতে লাগলেন।
পঞ্চ পাণ্ডব এবং সাত্যকি ধৃষ্টদ্যুম্ন অভিমন্যু প্রভৃতির বাণে নিপীড়িত হয়ে দ্রোণ অশ্বত্থামা কৃপ শল্য প্রভৃতি ভীষ্মকে পরিত্যাগ করলেন। যিনি সহস্র সহস্র বিপক্ষ যোদ্ধাকে সংহার করেছেন সেই ভীষ্মের গায়ে দুই অঙ্গুলি পরিমাণ স্থানও অবিদ্ধ রহিল না। সূর্যাস্তের কিঞ্চিৎ পূর্বে অর্জুনের শরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হ'য়ে ভীষ্ম পূর্ব দিকে মাথা রেখে রথ থেকে পড়ে গেলেন। আকাশে দেবগণ এবং ভূতলে রাজগণ হা হা ক'রে উঠলেন। উন্মূলিত ইন্দ্রধ্বজের ন্যায় ভীষ্ম রণভূমি অনুনাদিত করে নিপতিত হলেন, কিন্তু শরে আবৃত থাকায় তিনি ভূমি স্পর্শ করলেন না। দক্ষিণ দিকে সূর্য দেখে ভীষ্ম বুঝলেন এখন দক্ষিণায়ন। তিনি আকাশ থেকে এই বাক্য শুনলেন—মহাত্মা নরশ্রেষ্ঠ গাঙ্গেয় দক্ষিণায়নে কি ক'রে প্রাণত্যাগ করবেন? ভীষ্ম বললেন, ভূতলে পতিত থেকেই আমি উত্তরায়ণের প্রতীক্ষায় প্রাণধারণ করব।
মানসসরোবরবাসী মহর্ষিগণ হংসের রূপ ধ'রে ভীষ্মকে দর্শন করতে এলেন। ভীষ্ম বললেন, হংসগণ, সূর্য দক্ষিণায়নে থাকতে আমি মরব না, উত্তরায়ণেই দেহত্যাগ করব, পিতা শান্তনুর বরে মৃত্যু আমার ইচ্ছাধীন।
কৌরবগণ কিংকৰ্তব্যবিমূঢ় হলেন। কৃপ দুর্যোধন প্রভৃতি দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোদন করতে লাগলেন, তাঁদের আর যুদ্ধে মন গেল না; যেন ঊরুস্তম্ভে আক্রান্ত হ'য়ে রইলেন। বিজয়ী পাণ্ডবগণ শঙ্খধ্বনি ও সিংহনাদ করতে লাগলেন। শান্তনুপুত্র ভীষ্ম যোগস্থ হ'য়ে মহোপনিষৎ জপে নিরত থেকে মৃত্যুকালের প্রতীক্ষায় রইলেন।