দ্রোণপর্ব: ২। দ্রোণের অভিষেক ও দুর্য্যোধনকে বরদান

দুর্যোধন কর্ণকে বললেন, বয়স বিক্রম শাস্ত্রজ্ঞান ও যোদ্ধার উপযুক্ত সমস্ত গুণের জন্য ভীষ্ম আমার সেনাপতি হয়েছিলেন। তিনি দশ দিন শত্রুনাশ ও আমাদের রক্ষা ক’রে স্বর্গযাত্রায় প্রস্তুত হয়েছেন। এখন তুমি কাকে সেনাপতি করা উচিত মনে কর? কর্ণ বললেন, এখানে যেসকল পরন্তপশ্রেষ্ঠ আছেন তাঁরা প্রত্যেকে সেনাপতিত্বের যোগ্য, কিন্তু সকলেই এককালে সেনাপতি হতে পারেন না। এ’রা পরস্পরকে স্পর্ধা করেন, একজনকে সেনাপতি করলে আর সকলে ক্ষুণ্ণ হয়ে যুদ্ধে বিরত হবেন। দ্রোণ সকল যোদ্ধার শিক্ষক, স্থবির, মাননীয়, এবং শ্রেষ্ঠ অস্ত্রধর, ইনি ভিন্ন আর কেউ সেনাপতি হতে পারেন না। এমন যোদ্ধা নেই যিনি যুদ্ধে দ্রোণের অনুবর্তী হবেন না। দুর্যোধন তখনই দ্রোণকে সেনাপতি হবার জন্য অনুরোধ করলেন। দ্রোণ বললেন, রাজা, আমি ষড়ঙ্গ বেদ ও মনুর নীতিশাস্ত্রে অভিজ্ঞ; পাশুপত অস্ত্র ও বিবিধ বাণের প্রয়োগও জানি। তোমার বিজয়কামনায় আমি পাণ্ডবদের সঙ্গে যুদ্ধ করব, কিন্তু ধৃষ্টদ্যুম্নকে বধ করব না, কারণ সে আমাকে বধ করবার জন্যই সৃষ্ট হয়েছে। আমি বিপক্ষের সকল সৈন্য বিনষ্ট করব, কিন্তু পাণ্ডবরা আমার সঙ্গে হৃষ্টমনে যুদ্ধ করবেন না। দুর্যোধন দ্রোণাচার্যকে যথাবিধি সেনাপতিত্বে অভিষিক্ত করলেন। দ্রোণ বললেন, রাজা, কুরুশ্রেষ্ঠ গাঙ্গেয় ভীষ্মের পর আমাকে সেনাপতির পদ দিয়ে তুমি আমাকে সম্মানিত করেছ, তার যোগ্য ফল লাভ কর। তুমি অভীষ্ট বর চাও, আজ তোমার কোন্ কামনা পূর্ণ করব বল। দুর্যোধন বললেন, রথিশ্রেষ্ঠ, এই বর দিন যে যুধিষ্ঠিরকে জীবিত অবস্থায় আমার কাছে ধরে আনবেন। দ্রোণ বললেন, যুধিষ্ঠির ধন্য, তুমি তাঁকে ধরে আনতে বলছ, বধ করতে চাচ্ছ না। আমি তাঁকে মারব এ বোধ হয় তুমি অসম্ভব মনে কর, অথবা ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের দ্বেষ্টা কেউ নেই তাই তুমি তাঁর জীবনরক্ষা করতে চাও। অথবা পাণ্ডবগণকে জয় ক’রে তুমি তাঁদের রাজ্যাংশ ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছা কর। যুধিষ্ঠির ধন্য, তাঁর জন্ম সফল, অজাতশত্রু নামও সার্থক, কারণ তাঁকে তুমি স্নেহ কর।

দ্রোণের এই কথা শুনে দুযোধন তাঁর হৃদ্‌গত অভিপ্রায় প্রকাশ ক’রে ফেললেন, কারণ বৃহস্পতিতুল্য লোকেও মনোভাব গোপন করতে পারেন না। দুযোধন বললেন, আচার্য, যুধিষ্ঠিরকে মারলে আমার বিজয়লাভ হবে না, অন্য পাণ্ডবরা আমাদের হত্যা করবে। তাদের যদি একজনও অবশিষ্ট থাকে তবে সে আমাদের নিঃশেষ করবে। কিন্তু যদি সত্যপ্রতিজ্ঞ যুধিষ্ঠিরকে ধরে আনা যায় তবে তাঁকে পুনর্বার দ্যূতক্রীড়ায় পরাস্ত করলে তাঁর অনুগত ভ্রাতারাও আবার বনে যাবে। এইপ্রকার জয়ই দীর্ঘকাল স্থায়ী হবে, সেজন্য ধর্মরাজকে বধ করতে ইচ্ছা করি না।

দুর্যোধনের কুটিল অভিপ্রায় জেনে বুদ্ধিমান দ্রোণ চিন্তা ক’রে এই বাক্ছলযুক্ত বর দিলেন — যুদ্ধকালে অর্জুন যদি যুধিষ্ঠিরকে রক্ষা না করেন তবে ধ’রে নিও যে যুধিষ্ঠির আমাদের বশে এসেছেন। বৎস, অর্জুন সুরাসুরেরও অজেয়, তাঁর কাছ থেকে আমি যুধিষ্ঠিরকে হরণ করতে পারব না। অর্জুন আমার শিষ্য, কিন্তু যুবা, পুণ্যবান ও একাগ্রচিত্ত, তিনি ইন্দ্র ও রুদ্রের নিকট অনেক অস্ত্র লাভ করেছেন এবং তোমার প্রতি তাঁর ক্রোধ আছে। তুমি যে উপায়ে পার অর্জুনকে অপসারিত ক’রো, তা হ’লেই ধর্মরাজ বিজিত হবেন। অর্জুন বিনা যুধিষ্ঠির যদি মুহূর্ত্তকালও যুদ্ধক্ষেত্রে আমার সম্মুখে থাকেন তবে তাঁকে নিশ্চয় তোমার বশে আনব।

দ্রোণের এই কথা শুনে নির্বোধ ধার্তরাষ্ট্রগণ মনে করলেন যে যুধিষ্ঠির ধরাই পড়েছেন। তাঁরা জানতেন যে দ্রোণ পাণ্ডবদের পক্ষপাতী। তাঁর প্রতিজ্ঞা দৃঢ় করবার জন্য দুর্যোধন দ্রোণের বরদানের সংবাদ সৈন্যগণের মধ্যে ঘোষণা করলেন।