দ্রোণপর্ব: ৩। অর্জ্জুনের জয়

(একাদশ দিনের যুদ্ধ)

বিশ্বস্ত চরের নিকট সংবাদ পেয়ে যুধিষ্ঠির অর্জুনকে বললেন, তুমি দ্রোণের অভিপ্রায় শুনলে, যাতে তা সফল না হয় তার জন্য যত্ন কর। দ্রোণের প্রতিজ্ঞায় ছিদ্র আছে, আবার সেই ছিদ্র তিনি তোমার উপরেই রেখেছেন। অতএব আজ তুমি আমার কাছে থেকেই যুদ্ধ কর, যেন দুর্যোধনের অভীষ্ট সিদ্ধ না হয়।

অর্জুন বললেন, মহারাজ, দ্রোণকে বধ করা যেমন আমার অকর্তব্য, আপনাকে পরিত্যাগ করাও সেইরূপ। প্রাণ গেলেও আমি দ্রোণের আততায়ী হব না, আপনাকেও ত্যাগ করব না। আমি জীবিত থাকতে দ্রোণ আপনাকে নিগৃহীত করতে পারবেন না।

পাণ্ডব ও কৌরবগণের শিবিরে শঙ্খ ভেরী মৃদঙ্গ প্রভৃতি রণবাদ্য বেজে উঠল, দুই পক্ষের সৈন্যদল ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে পরস্পরের সম্মুখে এল। অনন্তর দ্রোণ ও ধৃষ্টদ্যুম্নের মধ্যে তুমুল সংগ্রাম আরম্ভ হ’ল। স্বর্ণময় উজ্জ্বল রথে আরূঢ় হয়ে দ্রোণ তাঁর সৈন্যদলের অগ্রভাগে বিচরণ করতে লাগলেন, তাঁর শরক্ষেপে পাণ্ডববাহিনী ত্রস্ত হ’ল। যুধিষ্ঠিরপ্রমুখ যোদ্ধারা সকল দিক থেকে দ্রোণের প্রতি ধাবিত হলেন। সহদেব ও শকুনি, দ্রোণাচার্য ও দ্রুপদ, ভীমসেন ও বিবিংশতি, নকুল ও তাঁর মাতুল শল্য, ধৃষ্টকেতু ও কৃপ, সাত্যকি ও কৃতবর্মা, ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সুশর্মা, বিরাট ও কর্ণ, শিখণ্ডী ও ভূরিশ্রবা, ঘটোৎকচ ও অলম্বুষ, অভিমন্যু ও বৃহদ্বল—এঁদের মধ্যে ঘোর যুদ্ধ হতে লাগল। অভিমন্যু বৃহদ্বলকে রথ থেকে নিপাতিত ক’রে খড়্গ ও চর্ম নিয়ে পিতার মহাশত্রু জয়দ্রথের প্রতি ধাবিত হলেন। জয়দ্রথ পরাস্ত হ’লে শল্য অভিমন্যুকে আক্রমণ করলেন। শল্যের সারথি নিহত হ’ল, তিনি গদাহস্তে রথ থেকে নামলেন, অভিমন্যুও প্রকাণ্ড গদা নিয়ে শল্যকে বললেন, আসুন আসুন। সেই সময়ে ভীমসেন এসে অভিমন্যুকে নিরস্ত করলেন এবং স্বয়ং শল্যের সঙ্গে গদাযুদ্ধ করতে লাগলেন। দুই গদার সংঘর্ষে অগ্নির উদ্ভব হ’ল, বহুক্ষণ যুদ্ধের পর দুজনেই আহত হয়ে ভূপতিত হলেন। শল্য বিহ্বল হয়ে দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন, তখন কৃতবর্মা তাঁকে নিজের রথে তুলে নিয়ে রণভূমি থেকে চ’লে গেলেন। ভীম নিমেষমধ্যে গদাহস্তে উঠে দাঁড়ালেন।

কুরুসৈন্য পরাজিত হচ্ছে দেখে কর্ণপুত্র বৃষসেন রণস্থলে এসে নকুলপুত্র শতানীকের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। দ্রৌপদীর অপর পুত্রগণ ভ্রাতা শতানীককে রক্ষা করতে এলেন। পাণ্ডবগণের সঙ্গে পাঞ্চাল কৈকয় মৎস্য ও সৃঞ্জয় যোদ্ধৃগণ অস্ত্র উদ্যত করে উপস্থিত হলেন। কৌরবসৈন্য মর্দিত ও ভগ্ন হচ্ছে দেখে দ্রোণ বললেন, বীরগণ, তোমরা পালিও না। এই ব'লে তিনি যুধিষ্ঠিরের প্রতি ধাবিত হলেন। যুধিষ্ঠিরের সৈন্যরক্ষক পাঞ্চালবীর কুমার দ্রোণের বক্ষে শরাঘাত করলেন, দ্রোণও পাণ্ডবপক্ষীয় বীরগণের প্রতি শরক্ষেপণ করতে লাগলেন। পাঞ্চালবীর ব্যাঘ্রদত্ত ও সিংহসেন দ্রোণের হস্তে নিহত হলেন। দ্রোণকে যুধিষ্ঠিরের নিকটবর্তী দেখে কৌরবসৈন্যগণ বলতে লাগল, আজ রাজা দুর্যোধন কৃতার্থ হবেন, যুধিষ্ঠির ধরা পড়বেন। এই সময়ে অর্জুন দ্রুতবেগে দ্রোণসৈন্যের প্রতি ধাবিত হয়ে শরজালে সর্বদিক আচ্ছন্ন করলেন। দ্রোণ দুর্যোধন প্রভৃতি যুদ্ধ থেকে বিরত হলেন, শত্রুপক্ষকে ত্রস্ত ও যুদ্ধে অনিচ্ছুক দেখে অর্জুনও পাণ্ডবসৈন্যগণকে নিরস্ত করলেন।