দ্রোণপর্ব: ৬। অভিমন্যুবধ

(ত্রয়োদশ দিনের যুদ্ধ)

অভিমানী দুর্যোধন ক্ষুণ্ণ হয়ে দ্রোণকে বললেন, দ্বিজশ্রেষ্ঠ, আপনি নিশ্চয় মনে করেন যে আমরা বধের যোগ্য, তাই আজ যুধিষ্ঠিরকে পেয়েও ধরলেন না। আপনি প্রীত হয়ে আমাকে বর দিয়েছিলেন, কিন্তু শেষে তার অন্যথা করলেন। সাধু লোকে কখনও ভক্তের আশাভঙ্গ করেন না। দ্রোণ লজ্জিত হয়ে উত্তর দিলেন, আমি সর্বদাই তোমার প্রিয়সাধনের চেষ্টা করি কিন্তু তুমি তা বুঝতে পার না। বিশ্বস্রষ্টা গোবিন্দ যে পক্ষে আছেন এবং অর্জুন যার সেনানী, সে পক্ষের বল ত্র্যম্বক মহাদেব ভিন্ন আর কে অতিক্রম করতে পারেন? সত্য বলছি, আজ আমি পাণ্ডবদের কোনও মহারথকে নিপাতিত করব। আমি এমন ব্যূহ রচনা করব যা দেবতারাও ভেদ করতে পারেন না। তুমি কোনও উপায়ে অর্জুনকে সরিয়ে রেখো।

পরদিন সংশপ্তকগণ দক্ষিণ দিকে গিয়ে পুনর্বার অর্জুনকে যুদ্ধে আহ্বান করলেন, অর্জুনও তাঁদের সঙ্গে ঘোর যুদ্ধে নিরত হলেন। দ্রোণ চক্রব্যূহ নির্মাণ করে তেজস্বী রাজপুত্রগণকে যথাস্থানে স্থাপিত করলেন। তাঁরা সকলেই রক্ত বসন, রক্ত ভূষণ ও রক্ত পতাকায় শোভিত হলেন এবং মাল্যধারণ ও অগুরু-চন্দনে চর্চিত হয়ে অভিমন্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে চললেন। দুঃশাসনের পুত্র লক্ষণ এই দশ সহস্র যোদ্ধার অগ্রবর্তী হলেন। কৌরবসেনার মধ্যভাগে দুর্যোধন কর্ণ কৃপ ও দুঃশাসন, এবং সম্মুখভাগে সেনাপতি দ্রোণ, সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ, অশ্বত্থামা, ধৃতরাষ্ট্রের ত্রিশ জন পুত্র, শকুনি, শল্য ও ভূরিশ্রবা রইলেন।

দ্রোণকে আর কেউ বাধা দিতে পারবে না এই স্থির করে যুধিষ্ঠির অভিমন্যুর উপর অত্যন্ত গুরুভার অর্পণ করলেন। তিনি তাঁকে বললেন বৎস, অর্জুন ফিরে এসে যাতে আমাদের নিন্দা না করেন এমন কার্য কর। আমরা চক্রব্যূহ ভেদের প্রণালী কিছুই জানি না, কেবল অর্জুন কৃষ্ণ প্রদ্যুম্ন আর তুমি— এই চার জন চক্রব্যূহ ভেদ করতে পারে। তোমার পিতৃগণ মাতুলগণ এবং সমস্ত সৈন্য তোমার নিকট বর প্রার্থনা করছে, তুমি দ্রোণের চক্রব্যূহ ভেদ কর।

অভিমন্যু বললেন, পিতৃগণের জয়কামনায় আমি অবিলম্বে দ্রোণের ব্যূহ-মধ্যে প্রবেশ করব। কিন্তু পিতা আমাকে প্রবেশের কৌশলই শিখিয়েছেন, যদি কোনও বিপদ হয় তবে ব্যূহ থেকে বেরিয়ে আসতে আমি পারব না। যুধিষ্ঠির বললেন, বৎস, তুমি ব্যূহ ভেদ ক'রে আমাদের জন্য দ্বার ক'রে দাও, আমরা তোমার সঙ্গে সঙ্গে প্রবেশ ক'রে তোমাকে রক্ষা করব। ভীম বললেন, বৎস, ধৃষ্টদ্যুম্ন সাত্যকি ও আমি তোমার অনুসরণ করব, পাঞ্চাল কেকয় মৎস্য প্রভৃতি যোদ্ধারাও যাবেন, তুমি একবার ব্যূহ ভেদ করলে আমরা বিপক্ষের প্রধান প্রধান যোদ্ধাদের বধ ক'রে ব্যূহ বিধ্বস্ত করব। অভিমন্যু বললেন, পতঙ্গ যেমন প্রজ্বলিত অগ্নিতে প্রবেশ করে, আমি সেইরূপ দুর্ধর্ষ দ্রোণসৈন্যের মধ্যে প্রবেশ করব। সকলেই দেখতে পাবে, বালক হ'লেও আমি সংগ্রামে দলে দলে শত্রুসৈন্য ধ্বংস করব।

যুধিষ্ঠির আশীর্বাদ করলেন। অভিমন্যু তাঁর সারথিকে বললেন, সুমিত্র, তুমি দ্রোণসৈন্যের দিকে শীঘ্র রথ নিয়ে চল। সারথি বললে, আয়ুষ্মন্, পাণ্ডবগণ আপনার উপর গুরুভার দিয়েছেন, আপনি বিবেচনা ক'রে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হবেন। দ্রোণাচার্য অস্ত্রবিশারদ পরিশ্রমী কৃতী যোদ্ধা, আর আপনি সুখে পালিত, যুদ্ধেও অনভিজ্ঞ। অভিমন্যু সহাস্যে বললেন, সারথি, দ্রোণ ও সমগ্র ক্ষত্রমণ্ডলকে আমি ভয় করি না, ঐরাবতে আরূঢ় ইন্দ্রের সঙ্গেও আমি যুদ্ধ করতে পারি। বিশ্ববিজয়ী মাতুল কৃষ্ণ বা পিতা অর্জুন যদি আমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসেন তথাপি আমি ভয় পাব না। তুমি বিলম্ব ক'রো না, অগ্রসর হও। তখন সারথি সুমিত্র অপ্রসন্নমনে রথের অশ্বদের দ্রুতবেগে চালনা করলে, পাণ্ডবগণ পিছনে চললেন। সিংহশিশু যেমন হস্তিদলের প্রতি ধাবিত হয়, অভিমন্যু সেইরূপ দ্রোণ প্রভৃতি মহারথগণের প্রতি ধাবিত হলেন। তিনি অল্প দূর গেলেই দুই পক্ষের যুদ্ধ আরম্ভ হ'ল।

দ্রোণের সমক্ষেই অভিমন্যু ব্যূহ ভেদ ক'রে ভিতরে গেলেন এবং কুরুসৈন্য ধ্বংস করতে লাগলেন। দুর্যোধন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে অভিমন্যুকে বাধা দিতে এলেন। দ্রোণ অশ্বত্থামা কৃপ কর্ণ শল্য প্রভৃতি শরবর্ষণ ক'রে অভিমন্যুকে আচ্ছন্ন করলেন। অভিমন্যুর শরাঘাতে শল্য মূর্ছিত হয়ে রথের উপর ব'সে পড়লেন, কৌরবসেনা পালাতে লাগল। শল্যের ভ্রাতা অভিমন্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসে নিহত হলেন।

দ্রোণ হৃষ্ট হয়ে উৎফুল্লনয়নে কৃপকে বললেন, এই সুভদ্রানন্দন অভিমন্যু আজ যুধিষ্ঠিরাদিকে আনন্দিত করবে। এর তুল্য ধনুর্ধর আর কেউ আছে এমন মনে হয় না, এ ইচ্ছা করলেই আমাদের সেনা সংহার করতে পারে, কিন্তু কোনও কারণে তা করছে না। দ্রোণের এই কথায় দুর্যোধন বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ হয়ে কর্ণ দুঃশাসন শল্য প্রভৃতিকে বললেন, সকল ক্ষত্রিয়ের আচার্য শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মজ্ঞ দ্রোণ অর্জুনের ওই মূঢ় পুত্রকে বধ করতে ইচ্ছা করেন না, শিষ্যের পুত্র ব’লে ওকে রক্ষা করতে চান। বীরগণ, আপনারা ওকে বধ করুন, বিলম্ব করবেন না। দুঃশাসন বললেন, আমিই ওকে মারব।

দুঃশাসনকে দেখে অভিমন্যু বললেন, ভাগ্যক্রমে আজ ধর্মত্যাগী নিষ্ঠুর, কটূভাষী বীরকে যুদ্ধে দেখছি। মূর্খ, তুমি দ্যুতসভায় জয়লাভে উন্মত্ত হয়ে কটূবাক্যে যুধিষ্ঠিরকে ক্রোধিত করেছিলে, তোমার পাপকর্মের ফলভোগের জন্য আমার কাছে এসে পড়েছ, আজ তোমাকে শাস্তি দিয়ে পাণ্ডবগণের ও দ্রৌপদীর নিকট ঋণমুক্ত হব। এই ব’লে অভিমন্যু দুঃশাসনকে শরঘাত করলেন। দুঃশাসন মূর্ছিত হয়ে পড়ে গেলেন, তাঁর সারথি তাঁকে সত্বর রণস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল। পাণ্ডবপক্ষীয় যোদ্ধারা অভিমন্যুকে দেখে সিংহনাদ করে দ্রোণের সৈন্যগণকে আক্রমণ করলেন।

তার পর কর্ণের সঙ্গে অভিমন্যুর যুদ্ধ হ’তে লাগল। অভিমন্যু কর্ণের এক ভ্রাতার শিরশ্ছেদন করলেন এবং কর্ণকেও শরঘাতে নিপীড়িত ক’রে রণভূমি থেকে দূর করলেন। অভিমন্যুর শরবর্ষণে বিশাল কৌরবসৈন্য ভগ্ন হ’ল, যোদ্ধারা পালাতে লাগলেন, অবশেষে ধৃতরাষ্ট্রের জামাতা সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ ভিন্ন আর কেউ রইলেন না। দ্রৌপদীহরণের পর ভীমের হস্তে নিগৃহীত হয়ে জয়দ্রথ মহাদেবের আরাধনা ক’রে এই বর পেয়েছিলেন যে অর্জুন ভিন্ন অন্য চার জন পাণ্ডবকে তিনি যুদ্ধে বাধা দিতে পারবেন।

জয়দ্রথ শরবর্ষণ ক’রে সাত্যকি ধৃষ্টদ্যুম্ন বিরাট দ্রুপদ শিখণ্ডী এবং যুধিষ্ঠির ভীম প্রভৃতিকে নিপীড়িত করতে লাগলেন। অভিমন্যু ব্যূহপ্রবেশের যে পথ করেছিলেন জয়দ্রথ তা রুদ্ধ ক’রে দিলেন। পাণ্ডবপক্ষীয় যোদ্ধারা দ্রোণসৈন্য ভেদ করবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু জয়দ্রথ তাঁদের বাধা দিলেন। কুরুসৈন্যে বেষ্টিত হয়ে অভিমন্যু একাকী দারুণ যুদ্ধ করতে লাগলেন। শল্যপুত্র রুক্মরথ ও দুর্যোধনপুত্র লক্ষণ অভিমন্যুর হস্তে নিহত হলেন।

প্রিয় পুত্রের মৃত্যুতে ক্রুদ্ধ হয়ে দুর্যোধন স্বপক্ষের বীরগণকে উচ্চস্বরে বললেন, আপনারা অভিমন্যুকে বধ করুন। তখন দ্রোণ, কৃপ কর্ণ অশ্বত্থামা বৃহদ্বল ও কৃতবর্মা এই ছয় রথী অভিমন্যুকে বেষ্টন করলেন। কোশলরাজ বৃহদ্বল এবং আরও অনেক যোদ্ধা অভিমন্যুর বাণে নিহত হলেন। দ্রোণ বললেন, কুমার অভিমন্যু তাঁর পিতার ন্যায় সর্ব দিকে দ্রুত বিচরণ ক’রে এত ক্ষিপ্রহস্তে শর সন্ধান ও মোচন করছে যে কেবল তার মণ্ডলাকার ধনু ই দেখা যাচ্ছে। সুভদ্রানন্দের শরক্ষেপে আমার প্রাণসংশয় আর মোহ হ'লেও আমি অতিশয় আনন্দলাভ করছি, অর্জুনের সঙ্গে এর প্রভেদ দেখছি না।

কর্ণ শরাহত হয়ে দ্রোণকে বললেন, রণস্থলে থাকা আমার কর্ত্তব্য, শুধু এই কারণে অভিমন্যু কর্তৃক নিপীড়িত হয়েও আমি এখানে রয়েছি। মৃদু হাস্য করে দ্রোণ বললেন, অভিমন্যুর কবচ অভেদ্য, আমিই ওর পিতাকে কবচধারণের প্রণালী শিখিয়েছিলাম। মহাধনুর্ধর কর্ণ, যদি পার তো ওর ধনু ছিন্ন কর, অশ্ব সারথি বিনাশ কর, তার পর পশ্চাৎ থেকে ওকে প্রহার কর। যদি বধ করতে চাও তবে ওকে রথহীন ও ধনুহীন কর।

দ্রোণের উপদেশ অনুসারে কর্ণ পিছন থেকে অভিমন্যুর ধনু ছিন্ন করলেন এবং অশ্ব ও সারথি বধ করলেন। তার পর দ্রোণ কৃপ কর্ণ অশ্বত্থামা দুর্যোধন ও শকুনি নিষ্করুণ হয়ে রথচ্যুত বালক অভিমন্যুর উপর শরাঘাত করতে লাগলেন। অভিমন্যু খড়্গ ও চর্ম্ম নিয়ে রথ থেকে লাফিয়ে নামলেন। দ্রোণ ক্ষুরপ্র অস্ত্রে অভিমন্যুর খড়্গের মুষ্টি কেটে ফেললেন। অভিমন্যু চক্র নিয়ে ধাবিত হলেন, বিপক্ষ বীরগণের শরাঘাতে তাও ছিন্ন হ'ল। তখন তিনি গদা নিয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন। এই সময়ে দুঃশাসনের পুত্র অভিমন্যুর মস্তকে গদাঘাত করলেন, অভিমন্যু অচেতন হয়ে পড়ে গেলেন।

জগৎ তাপিত ক'রে সূর্য যেমন অস্তে যান সেইরূপ কৌরবসেনা নিপীড়িত ক'রে অভিমন্যু প্রাণশূন্যদেহে ভূপাতিত হলেন। গগনচ্যুত চন্দ্রের ন্যায় তাঁকে নিপাতিত দেখে গগনচারিগণ বিলাপ করতে লাগলেন। পলায়মান পাণ্ডব-সৈন্যগণকে যুধিষ্ঠির বললেন, বীর অভিমন্যু যুদ্ধে পরাঙ্মুখ হন নি, তিনি স্বর্গে গেছেন। তোমরা স্থির হও, ভয় দূর কর, আমরা যুদ্ধে শত্রুদের জয় করব। কৃষ্ণার্জ্জনের তুল্য যোদ্ধা অভিমন্যু দশ সহস্র শত্রুসৈন্য ও মহাবল বৃহদ্বলকে বধ ক'রে নিশ্চয় ইন্দ্রলোকে গেছেন, তাঁর জন্য শোক করা উচিত নয়। তার পর সায়াহ্নকাল উপস্থিত হ'লে শোকমগ্ন পাণ্ডবগণ এবং রুধিরাক্ত কৌরবগণ যুদ্ধে বিরত হয়ে নিজ নিজ শিবিরে প্রস্থান করলেন।

ধৃতরাষ্ট্রকে অভিমন্যুবধের বৃত্তান্ত শুনিয়ে সঞ্জয় বললেন, মহারাজ, দ্রোণ কর্ণ প্রভৃতি ছ জন মহারথ একজনকে নিপাতিত করলেন — এ আমরা ধর্ম্মসঙ্গত মনে করি না।