দ্রোণপর্ব: ৭। যুধিষ্ঠির-সকাশে ব্যাস — মৃত্যুর উপাখ্যান

অভিমন্যুর শোকে যুধিষ্ঠির বিলাপ করতে লাগলেন — কেশরী যেমন গোমধ্যে প্রবেশ করে সেইরূপ অভিমন্যু আমার প্রিয়কার্য করবার জন্য দ্রোণব্যূহের মধ্যে প্রবেশ করেছিল। মহাধনুর্ধর দুর্ধর্ষ শত্রুগণকে পরাস্ত ক'রে দ্রোণসৈন্য-সাগর উত্তীর্ণ হয়ে পরিশেষে সে দুঃশাসনপুত্রের হাতে নিহত হ'ল। হা, হৃষীকেশ আর ধনঞ্জয়কে আমি কি বলব? নিজের প্রিয়সাধন ও জয়লাভের জন্য আমি সুভদ্রা অর্জুন ও কেশবের অপ্রিয় কার্য করেছি। বালকের স্থান ভোজনে গমনে শয়নে ও ভূষণে সর্বাগ্রে, কিন্তু তাকে আমরা যুদ্ধেই অগ্রবর্তী করেছিলাম। অর্জুনপুত্রের এই মৃত্যুর পর জয়লাভ রাজ্যলাভ অমরত্ব বা দেবলোকে বাস কিছুই আমার প্রীতিকর হবে না।

এই সময়ে মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস যুধিষ্ঠিরের নিকটে এলেন। তিনি বললেন, মহাপ্রাজ্ঞ, তোমার তুল্য লোকের বিপদে মোহগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। পরবীরশ্রেষ্ঠ অভিমন্যু যা করেছেন তা বালকে পারে না, তিনি বহু শত্রু বধ ক'রে স্বর্গে গেছেন। দেব দানব গন্ধর্ব সকলেই মৃত্যুর অধীন, এই বিধান অতিক্রম করা যায় না। যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, মৃত্যু কেন হয় তা বলুন। ব্যাসদেব বললেন, পুরাকালে অকম্পন রাজাকে নারদ যে ইতিহাস বলেছিলেন তা শোন।

সত্যযুগে অকম্পন নামে এক রাজা ছিলেন, হরি নামে তাঁর একটি অস্ত্রবিশারদ মেধাবী বলবান পুত্র ছিল। এই রাজপুত্র যুদ্ধে নিহত হ'লে অকম্পন সর্বদা শোকাভিষ্ট হয়ে থাকতেন। তাঁকে সান্ত্বনা দেবার জন্য দেবর্ষি নারদ এই পুত্রশোকনাশক আখ্যান বলেছিলেন। —

প্রাণিসৃষ্টির পর ব্রহ্মা ভাবতে লাগলেন, এদের সংহার কোন্ উপায়ে হবে। তখন তাঁর ক্রোধপ্রভাবে আকাশে অগ্নি উৎপন্ন হয়ে চরাচর সর্ব জগৎ দগ্ধ করতে লাগল। প্রজাগণের হিতকামনায় মহাদেব ব্রহ্মার শরণ নিলেন। ব্রহ্মা বললেন, পুত্র, তুমি আমার সংকল্পজাত, কি চাও বল। মহাদেব বললেন, প্রভু, আপনার সৃষ্ট প্রজাবর্গ আপনার ক্রোধেই দগ্ধ হচ্ছে, আপনি প্রসন্ন হ'ন। ব্রহ্মা বললেন, আমি অকারণে ক্রুদ্ধ হই নি, দেবী পৃথিবী ভারে আর্ত হয়ে প্রাণিসংহারের নিমিত্ত আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, কোনও উপায় খুঁজে না পাওয়ায় আমার ক্রোধ জন্মেছিল। মহাদেবের প্রার্থনায় ব্রহ্মা তাঁর ক্রোধজাত অগ্নি স্বদেহে ধারণ করলেন। তখন তাঁর সকল ইন্দ্রিয়দ্বার থেকে এক পিঙ্গল-বর্ণ রক্তাননা রক্তনয়না স্বর্ণকুণ্ডলধারিণী নারী আবির্ভূত হলেন। ব্রহ্মা তাঁকে বললেন, মৃত্যু, তুমি আমার নিয়োগ অনুসারে সকল প্রাণী সংহার কর।

সরোদনে কৃতাঞ্জলি হয়ে মৃত্যু বললেন, প্রভু, আমি নারী রূপে সৃষ্ট হয়ে কি ক'রে এই ক্রুর কর্ম করব? আমি যাকে মারব তার আত্মীয়রা আমার অনিষ্ট-চিন্তা করবে, আমি তা ভয় করি। লোকে যখন বিলাপ করবে তখন আমি তাদের প্রিয় প্রাণ হরণ করতে পারব না; আপনি অধর্ম থেকে আমাকে রক্ষা করুন। ব্রহ্মা বললেন, তুমি বিচার ক'রো না, আমার আদেশে সকল প্রাণী সংহার কর, তুমি জগতে অনিন্দিতা হবে।

মৃত্যু সম্মত হলেন না, ধেনুক ঋষির আশ্রমে গিয়ে কঠোর তপস্যা করতে লাগলেন। ব্রহ্মা তুষ্ট হয়ে বর দিতে এলে মৃত্যু বললেন, প্রভু, সদয় প্রাণীকে আমি হত্যা করতে চাই না, আমি আর্ত ভীত ও নিরপরাধ, আমাকে অভয় দিন। ব্রহ্মা বললেন, কল্যাণি, তোমার অধর্ম হবে না, তুমি সকল প্রাণী সংহার করতে থাক। সনাতন ধর্ম তোমাকে সর্বপ্রকারে পবিত্র রাখবেন, লোকপাল যম তোমার সহায় হবেন, ব্যাধি সকলও তোমাকে সাহায্য করবে। আমার ও দেবগণের বরে তুমি নিষ্পাপ হয়ে খ্যাতিলাভ করবে। মৃত্যু বললেন, আপনার আদেশ আমার শিরোধার্য, কিন্তু লোভ ক্রোধ অসূয়া দ্রোহ মোহ অলজ্জা ও পরুষ আচরণ — এই সকল দোষে দেহ বিদ্ধ হ’লেই আমি সংহার করব। ব্রহ্মা বললেন, মৃত্যু, তাই হবে, তোমার অশ্রুবিন্দু আমার হাতে পড়েছিল, তাই ব্যাধি হয়ে প্রাণিদের বধ করবে, তোমার অধর্ম হবে না।

তার পর নারদ অকম্পনকে বললেন, মহারাজ, ব্রহ্মার আজ্ঞায় মৃত্যুদেবী অনাসক্তভাবে অন্তকালে প্রাণীদের প্রাণ হরণ করেন, অতএব তুমি নিষ্ফল শোক ক’রো না। জীব পরলোকে গেলে ইন্দ্রিয়সকল সূক্ষ্মশরীরে অবস্থান করে, কর্মক্ষয় হ’লে আবার অন্য শরীর আশ্রয় ক’রে মর্ত্যে আসে। প্রাণবায়ু দেহ ভেদ ক’রে বহির্গত হ’লে আর ফিরে আসে না। তোমার পুত্র স্বর্গ লাভ ক’রে বীরলোকে আনন্দে আছে, মর্ত্যের দুঃখ ত্যাগ ক’রে স্বর্গে পুণ্যবানদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।