দ্রোণপর্ব: ১৪। জয়দ্রথবধ

(চতুৰ্দশ দিনের আরও যুদ্ধ)

অৰ্জ্জুন কৃষ্ণকে বললেন, সূৰ্যাস্তের আর বিলম্ব নেই, জয়দ্রথের কাছে রথ নিয়ে চল, আমি যেন প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারি। অৰ্জ্জুনকে আসতে দেখে দুৰ্য্যোধন কৰ্ণ বৃষসেন শল্য অশ্বত্থামা কৃপ এবং স্বয়ং জয়দ্রথ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। দুৰ্য্যোধন কৰ্ণকে বললেন, দিনের অল্পই অবশিষ্ট আছে, জয়দ্রথকে যদি সূৰ্যাস্ত পৰ্য্যন্ত রক্ষা করা যায় তবে অৰ্জ্জুনের প্রতিজ্ঞা মিথ্যা হবে, সে অগ্নিপ্রবেশ করবে। অৰ্জ্জুন মরলে তার ভ্রাতারাও মরবে, তার পর আমরা নিষ্কণ্টক হয়ে পৃথিবী ভোগ করব। কৰ্ণ, তোমরা সকলে আমার সঙ্গে মিলিত হয়ে বিশেষ যত্ন সহকারে যুদ্ধ কর। কৰ্ণ বললেন, ভীম আমার দেহ ক্ষতবিক্ষত করেছে, যুদ্ধে থাকা কৰ্ত্তব্য সেজন্যই আমি এখানে আছি, কিন্তু আমার অঙ্গসকল অচল হয়ে আছে; তথাপি আমি যথাশক্তি যুদ্ধ করব। মহারাজ, তোমার জন্য আমি পৌরুষকার আশ্রয় ক’রে অৰ্জ্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করব, কিন্তু জয় দৈবের অধীন।

তীক্ষ্ণ শরাঘাতে অৰ্জ্জুন বিপক্ষের সৈন্য হস্তী ও অশ্ব সংহার করতে লাগলেন এবং ভীমসেন ও সাত্যকি কৰ্তৃক রক্ষিত হয়ে ক্রমশ জয়দ্রথের নিকটস্থ হলেন। দুৰ্য্যোধন কৰ্ণ কৃপ প্রভৃতি অৰ্জ্জুনকে বেষ্টন করলেন কিন্তু অৰ্জ্জুনের প্রচণ্ড বাণবর্ষণে তাঁরা আকুল হয়ে সরে গেলেন। অৰ্জ্জুনের শরাঘাতে জয়দ্রথের সারথির মুণ্ড এবং রথের বরাহধ্বজ ভূপাতিত হ’ল। সূৰ্য্য দ্রুতগতিতে অস্তাচলে যাচ্ছেন দেখে কৃষ্ণ বললেন, ভীত জয়দ্রথকে ছ জন মহারথ রক্ষা করছেন, এঁদের জয় না ক’রে কিংবা ছলনা ভিন্ন তুমি জয়দ্রথকে বধ করতে পারবে না। আমি যোগবলে সূৰ্য্যকে আবৃত করব, তখন সূৰ্যাস্ত হয়ে গেছে ভেবে জয়দ্রথ আর আত্মগোপন করবেন না, সেই অবকাশে তুমি তাকে প্রহার করো।

যোগেশ্বর হরি যোগযুক্ত হয়ে সূৰ্য্যকে তমসাবৃত করলেন। সূৰ্যাস্ত হয়েছে, এখন অৰ্জ্জুন অগ্নিপ্রবেশ করবেন — এই ভেবে কৌরবযোদ্ধারা হৃষ্ট হলেন। জয়দ্রথ উৰ্দ্ধমুখ হয়ে সূৰ্য্য দেখতে পেলেন না। কৃষ্ণ বললেন, অৰ্জ্জুন, জয়দ্রথ ভয়মুক্ত হয়ে সূৰ্য্য দেখছেন, দুরাত্মাকে বধ করবার এই সময়।

কৃপ কৰ্ণ শল্য দুৰ্য্যোধন প্রভৃতিকে শরাঘাতে বিতাড়িত করে অৰ্জ্জুন জয়দ্রথের প্রতি ধাবিত হইলেন। ধূলি ও অন্ধকারে চতুর্দিক আচ্ছন্ন হওয়ায় যোদ্ধারা কেউ কাউকে দেখতে পেলেন না, অশ্বারোহী গজারোহী ও পদাতি সৈন্য অর্জুনের বাণে বিদারিত হয়ে পালাতে লাগল। কৃষ্ণ পুনর্বার বললেন, অর্জুন, জয়দ্রথের শিরশ্ছেদ কর, সূর্য অস্ত যাচ্ছেন। যা করতে হবে শোন। — বিখ্যাত রাজা বৃদ্ধক্ষত্র জয়দ্রথের পিতা। পুত্রের জন্মকালে তিনি এই দৈববাণী শুনেছিলেন যে রণস্থলে কোনও শত্রু এর শিরশ্ছেদ করবে। পুত্রবৎসল বৃদ্ধক্ষত্র এই অভিশাপ দিলেন — যে আমার পুত্রের মস্তক ভূমিতে ফেলবে তার মস্তক শতধা বিদীর্ণ হবে। তার পর যথাকালে জয়দ্রথকে রাজপদ দিয়ে বৃদ্ধক্ষত্র বনগমন করলেন, এখন তিনি সমন্তপঞ্চকের বাইরে দুষ্কর তপস্যা করছেন। অর্জুন, তুমি অদ্ভুতশক্তিসম্পন্ন কোনও দিব্য অস্ত্র দিয়ে জয়দ্রথের মুণ্ড কেটে বৃদ্ধক্ষত্রের ক্রোড়ে ফেল। যদি ভূমিতে ফেল তবে তোমার মস্তক বিদীর্ণ হবে।

ওষ্ঠপ্রান্ত লেহন ক'রে অর্জুন এক মন্ত্রসিদ্ধ বজ্রতুল্য বাণ নিক্ষেপ করলেন। সেই বাণ শোন পক্ষীর ন্যায় দ্রুতবেগে গিয়ে জয়দ্রথের মুণ্ড ছেদন ক'রে আকাশে উঠল। অর্জুনের আরও কতকগুলি বাণ সেই মুণ্ড ঊর্ধ্বে বহন ক'রে নিয়ে চলল, অর্জুন পুনর্বার ছয় মহারথীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। এই সময়ে ধৃতরাষ্ট্রের বৈবাহিক রাজা বৃদ্ধক্ষত্র সন্ধ্যাবন্দনা করছিলেন। সহসা কৃষ্ণকেশ কুণ্ডলে শোভিত জয়দ্রথের মস্তক তাঁর ক্রোড়ে পতিত হ'ল। বৃদ্ধক্ষত্র ত্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন, তখন তাঁর পুত্রের মস্তক ভূমিতে পড়ল, তাঁর নিজের মস্তকও শতধা বিদীর্ণ হ'ল।

তার পর কৃষ্ণ অন্ধকার অপসারিত করলেন। কৌরবগণ বুঝলেন বাসুদেবের মায়াবলে এমন হয়েছে। দুর্যোধন ও তাঁর ভ্রাতারা অশ্রুমোচন করতে লাগলেন। কৃষ্ণ অর্জুন ভীম সাত্যকি প্রভৃতি শঙ্খধ্বনি করলেন, সেই নিনাদ শুনে যুধিষ্ঠির বুঝলেন যে জয়দ্রথ নিহত হয়েছেন।