দ্রোণপর্ব: ১৩। কর্ণের হস্তে ভীমের পরাজয় — ভূরিশ্রবা-বধ
(চতুর্দ্দশ দিনের আরও যুদ্ধ)
কৃষ্ণার্জুনকে দেখতে না পেয়ে এবং গাণ্ডীবের শব্দ শুনতে না পেয়ে যুধিষ্ঠির উদ্বিগ্ন হলেন। তিনি ভীমকে বললেন, তোমার কনিষ্ঠ ভ্রাতার কোনও চিহ্ন আমি দেখতে পাচ্ছি না, কৃষ্ণও পাঞ্চজন্য বাজাচ্ছেন। নিশ্চয় ধনঞ্জয় নিহত হয়েছেন এবং কৃষ্ণ স্বয়ং যুদ্ধ করছেন। তুমি সত্বর অর্জুন আর সাত্যকির কাছে যাও। ভীম বললেন, কৃষ্ণার্জুনের কোনও ভয় নেই, তথাপি আপনার আজ্ঞা শিরোধার্য ক’রে আমি যাচ্ছি। যুধিষ্ঠিরকে রক্ষা করবার ভার ধৃষ্টদ্যুম্নকে দিয়ে ভীম অর্জুনের অভিমুখে যাত্রা করলেন, পাঞ্চাল ও সোমক সৈন্যগণ তাঁর সঙ্গে গেল।
ভীমের ললাটে লৌহবাণ দিয়ে আঘাত ক’রে দ্রোণ সহাস্যে বললেন, কুন্তীপুত্র, আজ আমি তোমার শত্রু, আমাকে পরাস্ত না ক’রে তুমি এই বাহিনী ভেদ করতে পারবে না। ভীম বললেন, ব্রহ্মবন্ধু (নীচ ব্রাহ্মণ), আপনার অনুমতি না পেয়েও অর্জুন এই বাহিনী ভেদ ক’রে গেছেন। আমি আপনার শত্রু ভীমসেন, অর্জুনর মত দয়ালু নই, আপনাকে সম্মানও করি না। এই ব’লে ভীম গদাঘাতে দ্রোণের অশ্ব সারথি ও রথ বিনষ্ট করলেন। দ্রোণ অন্য রথে উঠে ব্যূহদ্বারে চলে গেলেন। ভীমের সঙ্গে যুদ্ধে দুর্যোধনের ভ্রাতা বিন্দ অনুবিন্দ সুবর্মা ও সুদর্শন নিহত হলেন। কৌরবগণকে পরাস্ত ক’রে ভীম সত্বর অগ্রসর হলেন এবং কিছু দূর গিয়ে অর্জুনকে দেখতে পেয়ে সিংহনাদ করলেন। কৃষ্ণার্জুনও সিংহনাদ ক’রে উত্তর দিলেন। এই গর্জন শুনে যুধিষ্ঠির আনন্দিত হলেন।
দুর্যোধন দ্রোণের কাছে এসে বললেন, আচার্য, অর্জুন সাত্যকি ও ভীম আপনাকে অতিক্রম ক’রে জয়দ্রথের অভিমুখে গেছেন। আমাদের যোদ্ধারা বলছেন, ধনুর্বেদের পারগামী দ্রোণের এই পরাজয় বিশ্বাস করা যায় না। আমি মন্দভাগ্য, এই যুদ্ধে নিশ্চয় আমার নাশ হবে। আপনার অভিপ্রায় কি তা বলুন। দ্রোণ বললেন, পাণ্ডবপক্ষের তিন মহারথ আমাদের অতিক্রম ক’রে গেছেন, আমাদের সেনা সম্মুখে ও পশ্চাতে আক্রান্ত হয়েছে। এখন জয়দ্রথকে রক্ষা করাই প্রধান কর্তব্য। বৎস, শকুনির দ্যূতে যে দ্যুতক্রীড়া হয়েছিল তাতে জয়-পরাজয় কিছুই হয় নি, এই রণস্থলেই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে। তোমরা জীবনের মমতা ত্যাগ ক’রে জয়দ্রথকে রক্ষা কর। দ্রোণের উপদেশে দুর্যোধন তাঁর অনুচরদের নিয়ে সত্বর প্রস্থান করলেন।
কৃষ্ণার্জুনের অভিমুখে ভীমকে যেতে দেখে কর্ণ তাঁকে যুদ্ধে আহ্বান ক’রে বললেন, ভীম, তোমার শত্রুরা যা স্বপ্নেও ভাবে নি তুমি সেই কাজ করছ, পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে চলে যাচ্ছ। ভীম ফিরে এসে কর্ণের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলেন। কর্ণ মৃদুভাবে এবং ভীম পূর্বের শত্রুতা স্মরণ ক’রে ক্রুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন। দুর্যোধনের আদেশে তাঁর নয় ভ্রাতা দুর্জয় দুর্মুখ চিত্র উপচিত্র চিত্রাক্ষ চারুচিত্র শরাসন চিত্রায়ু ও চিত্রবর্মা কর্ণকে সাহায্য করতে এলেন, কিন্তু ভীম সকলকেই বধ করলেন। তার পর দুর্যোধনের আরও সাত ভ্রাতা শত্রুঞ্জয় শত্রুসহ চিত্র চিত্রায়ুধ দৃঢ় চিত্রসেন ও বিকর্ণ যুদ্ধ করতে এলেন এবং তাঁরাও নিহত হলেন। এইরূপে ভীম একত্রিশ জন ধৃতরাষ্ট্রপুত্রকে নিপাতিত করলেন।
কর্ণের শরঘাতে ভীমের ধনু ছিন্ন এবং রথের অশ্বসকল নিহত হ’ল। ভীম রথ থেকে নেমে খড়্গ ও চর্ম নিয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন। কর্ণ ভীমের চর্ম ছেদন করলেন, ক্রুদ্ধ ভীম তাঁর খড়্গ নিক্ষেপ ক’রে কর্ণের ধনু ছেদন করলেন। কর্ণ অন্য ধনু নিলেন, নিরস্ত্র ভীম হস্তীর মৃতদেহ ও ভগ্ন রথের স্তূপের মধ্যে আশ্রয় নিলেন এবং হস্তীর দেহ নিক্ষেপ ক’রে যুদ্ধ করতে লাগলেন। কর্ণের শরঘাতে ভীম মূর্ছিতপ্রায় হলেন। কুন্তীর বাক্য স্মরণ ক’রে কর্ণ ভীমকে বধ করলেন না, কেবল ধনুর অগ্রভাগ দিয়ে স্পর্শ ক'রে বার বার সহাস্যে বললেন, ওরে তুব্বরক (১) ঔদরিক সংগ্রামকাতর মূঢ়, তুমি অস্ত্রবিদ্যা জান না, আর যুদ্ধ ক'রো না। যেখানে বহুবিধ খাদ্যপানীয় থাকে সেখানেই তোমার স্থান, তুমি রণভূমির অযোগ্য। বৎস বৃকোদর, তুমি বনে গিয়ে মুনি হয়ে ফলমূল খাও গে, কিংবা গৃহে গিয়ে পাচক আর ভৃত্যদের তাড়না কর। আমার মত লোকের সঙ্গে যুদ্ধ করলে তোমাকে অনেক কষ্ট ভোগ করতে হবে। তুমি কৃষ্ণার্জ্জনের কাছে যাও, কিংবা গৃহে যাও। বালক, তোমার যুদ্ধের প্রয়োজন কি? ভীম বললেন, কেন মিথ্যা গর্ব করছ, আমি তোমাকে বহুবার পরাজিত করেছি। ইন্দ্রেরও জয়-পরাজয় হয়েছিল। নীচকুলজাত কর্ণ, তুমি আমার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ কর, আমি তোমাকে কীচকের ন্যায় বিনষ্ট করব।
এই সময়ে অর্জুন কর্ণের প্রতি শরবর্ষণ করতে লাগলেন। ভীমকে ত্যাগ ক'রে কর্ণ দুর্য্যোধনাদির কাছে গেলেন, ভীমও সাত্যকির রথে উঠে অর্জুনের অভিমুখে চললেন। ভূরিশ্রবা সাত্যকিকে বাধা দিতে এলেন এবং কিছু কাল ঘোর যুদ্ধের পর সাত্যকিকে ভূপাতিত করে তাঁকে পদাঘাত করলেন এবং মুণ্ডচ্ছেদের উদ্দেশ্যে তাঁর কেশগুচ্ছ ধরলেন। তখন কৃষ্ণের উপদেশে অর্জুন তীক্ষ্ণ শরে ভূরিশ্রবার দক্ষিণ হস্ত কেটে ফেললেন। ভূরিশ্রবা বললেন, কৌন্তেয়, তুমি অতি নৃশংস কর্ম করলে, আমি অন্যের সঙ্গে যুদ্ধে রত ছিলাম, সেই সময়ে আমার বাহু ছেদন করলে! এরূপ অস্ত্রপ্রয়োগ কে তোমাকে শিখিয়েছেন, ইন্দ্র রুদ্র দ্রোণ না কৃপ? তুমি কৃষ্ণের উপদেশে সাত্যকিকে বাঁচাবার জন্য এরূপ করেছ। বৃষ্ণি ও অন্ধক বংশের লোকেরা ব্রাত্য, নিন্দার্হ কর্ম করাই ওদের স্বভাব, সেই বংশে জাত কৃষ্ণের কথা তুমি শুনলে কেন? এই ব'লে মহাশয় ভূরিশ্রবা বাঁ হাতে ভূমিতে শর বিছিয়ে প্রায়োপবেশনে বসলেন এবং ব্রহ্মলোকে যাবার ইচ্ছায় যোগস্থ হয়ে মহোপনিষৎ ধ্যান করতে লাগলেন। অর্জুন তাঁকে বললেন, তুমি নিরস্ত্র সাত্যকিকে বধ করতে গিয়েছিলে, নিরস্ত্র বালক অভিমন্যুকে তোমরা হত্যা করেছ, কোন্ ধার্মিক লোক এমন কর্মের প্রশংসা করেন?
ভূরিশ্রবা ভূমিতে মস্তক স্পর্শ করলেন এবং ছিন্ন দক্ষিণ হস্ত বাম হস্তে ধ'রে অর্জুনের দিকে নিক্ষেপ করলেন। অর্জুন তাঁকে বললেন, আমার ভ্রাতাদের উপর যেমন প্রীতি, তোমার উপরেও সেইরূপ প্রীতি আছে। তুমি উশীনরপুত্র শিবি রাজার ন্যায় পুণ্যলোকে যাও। কৃষ্ণ বললেন, ভূরিশ্রবা, তুমি দেবগণের রক্ষিত আমার লোকে যাও, গরুড়ে আরোহণ ক'রে বিচরণ কর। এই সময়ে সাত্যকি চৈতন্যলাভ ক'রে ভূমি থেকে উঠলেন এবং খড়্গ নিয়ে ভূরিশ্রবার শিরশ্ছেদ করতে উদ্যত হলেন। সমস্ত সৈন্য নিন্দা করতে লাগল, কৃষ্ণ অর্জুন ভীম কৃপ অশ্বত্থামা কর্ণ জয়দ্রথ প্রভৃতি উচ্চৈঃস্বরে বারণ করতে লাগলেন, তথাপি সাত্যকি যোগমগ্ন ভূরিশ্রবার মস্তক ছেদন করলেন!
সাত্যকি বললেন, ওহে অধার্মিকগণ, তোমরা আমাকে ‘মেরো না, মেরো না’ ব’লে নিষেধ করছিলে, কিন্তু সুভদ্রার বালক পুত্র যখন নিহত হয় তখন তোমাদের ধর্ম কোথায় ছিল? আমার এই প্রতিজ্ঞা আছে — যে আমাকে যুদ্ধে নিষ্পিষ্ট করে পদাঘাত করবে সে মরণীয় নয় ব্রতপরায়ণ হ’লেও তাকে আমি বধ করব। আমি ভূরিশ্রবাকে বধ ক’রে উচিত কার্য করেছি, অর্জুন এর বাহু কেটে আমাকে বঞ্চিত করেছেন।
যুদ্ধের বিবরণ শুনতে শুনতে ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়কে বললেন, বহুযুদ্ধজয়ী সাত্যকিকে ভূরিশ্রবা কি করে ভূপাতিত করতে পেরেছিলেন? সঞ্জয় বললেন, যযাতির জ্যেষ্ঠপুত্র যদুর বংশে দেবমীঢ় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুত্রের নাম শূর, শূরর পুত্র মহাযশা বসুদেব। যদুর বংশে মহাবীর শিনিও জন্মেছিলেন। দেবকের কন্যা দেবকীর যখন স্বয়ংবর হয় তখন শিনি সেই কন্যাকে বসুদেবের জন্য সবলে হরণ করেন। কুরুবংশীয় সোমদত্ত তা সইলেন না, শিনির সঙ্গে বাহুযুদ্ধে প্রবৃত্ত হলেন। শিনি সোমদত্তকে ভূপাতিত ক’রে পদাঘাত করলেন এবং অসি উদ্যত ক’রে কেশ ধরলেন, কিন্তু পরিশেষে দয়া করে ছেড়ে দিলেন। তারপর সোমদত্ত মহাদেবকে আরাধনায় তুষ্ট করে বর চাইলেন — ভগবান, এমন পুত্র দিন যে শিনির বংশধরকে ভূমিতে ফেলে পদাঘাত করবে। মহাদেবের বরে সোমদত্ত ভূরিশ্রবাকে পুত্ররূপে পেলেন। এই কারণেই ভূরিশ্রবা শিনির পৌত্র সাত্যকিকে নিগৃহীত করতে পেরেছিলেন।