দ্রোণপর্ব: ১৬। সোমদত্ত-বাহ্লীক-বধ — কৃপ-কর্ণ-অশ্বত্থামার কলহ
(চতুর্দশ দিনের আরও যুদ্ধ)
সন্ধ্যাকালে ভীরুর ত্রাসজনক এবং বীরের হর্ষবর্ধক নিদারুণ রাত্রিযুদ্ধ আরম্ভ হ'ল, পাণ্ডব পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণ মিলিত হয়ে দ্রোণের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন।
ভুরিশ্রবার পিতা সোমদত্ত সাত্যকিকে বললেন, তুমি ক্ষত্রধর্ম ত্যাগ ক'রে দস্যুর ধর্মে রত হ'লে কেন? বৃষ্ণিবংশে দুজন মহারথ ব'লে খ্যাত, প্রদ্যুম্ন ও তুমি। দক্ষিণবাহুহীন প্রায়োপবেশনে উপবিষ্ট ভুরিশ্রবাকে তুমি কেন হত্যা করলে? আমি শপথ করছি, অর্জুন যদি রক্ষা না করেন তবে এই রাত্রি অতীত না হ'তেই তোমাকে বধ করব নতুবা ঘোর নরকে যাব। সাত্যকির সঙ্গে যুদ্ধে আহত হয়ে সোমদত্ত মূর্ছিত হলেন, তাঁর সারথি তাঁকে সরিয়ে নিয়ে গেল।
অশ্বত্থামার সঙ্গে ঘটোৎকচের ভীষণ যুদ্ধ হ'তে লাগল। ঘটোৎকচপুত্র অঞ্জনপর্বা অশ্বত্থামা কর্তৃক নিহত হলেন। ঘটোৎকচ বললেন, দ্রোণপুত্র, তুমি আজ আমার হাতে রক্ষা পাবে না। অশ্বত্থামা বললেন, বৎস, আমি তোমার পিতার তুল্য, তোমার উপর আমার অধিক ক্রোধ নেই। ঘটোৎকচ ক্রুদ্ধ হয়ে মায়াযুদ্ধ করতে লাগলেন। তাঁর অনুচর এক অক্ষৌহিণী রাক্ষসকে অশ্বত্থামা বিনষ্ট করলেন। সোমদত্ত আবার যুদ্ধ করতে এসে ভীমের পরিঘ ও সাত্যকির বাণের আঘাতে নিহত হলেন। সোমদত্তের পিতা বাহ্লীরাজ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ভীমকে আক্রমণ করলেন, গদাঘাতে ভীম তাঁকে বধ করলেন।
দুর্যোধন কর্ণকে বললেন, মিত্রবৎসল কর্ণ, পাণ্ডবপক্ষীয় মহারথগণ আমার যোদ্ধাদের বেষ্টন করেছেন, তুমি তাঁদের রক্ষা কর। কর্ণ বললেন, আমি জীবিত থাকতে তুমি বিবাদগ্রস্ত হয়ো না, সমস্ত পাণ্ডবদের আমি জয় করব। কৃপাচার্য ঈষৎ হাস্য ক’রে বললেন, ভাল ভাল! কেবল কথাতেই যদি কার্যসিদ্ধি হ’ত তবে তুমি দুর্যোধনের সেনা রক্ষা করতে পারতে। সূতপুত্র, তুমি সর্বত্রই পাণ্ডবদের হাতে পরাজিত হয়েছ, এখন বৃথা গর্জন না ক’রে যুদ্ধ কর। কর্ণ ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, বীরগণ বর্ষার মেঘের ন্যায় গর্জন করেন, এবং যথাকালে রোপিত বীজের ন্যায় শীঘ্রই ফলও দেন। তাঁরা যদি যুদ্ধের ভার নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন তাতে আমি দোষ দেখি না। ব্রাহ্মণ, পাণ্ডব ও কৃষ্ণ প্রভৃতিকে মারবার সংকল্প ক’রে যদি আমি গর্জন করি তবে আপনার তাতে কি ক্ষতি? আপনি আমার গর্জনের ফল দেখতে পাবেন, আমি শত্রুবধ ক’রে দুর্যোধনকে নিষ্কণ্টক রাজ্য দেব। কৃপ বললেন, তুমি প্রলাপ বকছ, কৃষ্ণ ও অর্জুন যে পক্ষে আছেন সেই পক্ষে নিশ্চয় জয় হবে। কর্ণ সহাস্যে বললেন, ব্রাহ্মণ, আমার কাছে ইন্দ্রদত্ত অমোঘ শক্তি অস্ত্র আছে, তার দ্বারাই আমি অর্জুনকে বধ করব। আপনি বৃদ্ধ, যুদ্ধে অক্ষম, পাণ্ডবদের প্রতি স্নেহযুক্ত, সেজন্য মোহবশে আমাকে অবজ্ঞা করেন। দুর্মতি ব্রাহ্মণ, যদি পুনর্বার আমাকে অপ্রিয় বাক্য বলেন তবে খড়্গ দিয়ে আপনার জিহ্বা ছেদন করব। আপনি রণস্থলে কৌরবসেনাকে ভয় দেখিয়ে পাণ্ডবদের স্তুতি করতে চান!
মাতুল কৃপাচার্যকে কর্ণ ভর্ৎসনা করছেন দেখে অশ্বত্থামা খড়্গ উদ্যত ক’রে বেগে উপস্থিত হলেন। তিনি দুর্যোধনের সমক্ষেই কর্ণকে বললেন, নরাধম, তুমি নিজের বীরত্বের দর্পে অন্য কোনও ধনুর্ধরকে গণনা কর না! অর্জুন যখন তোমাকে পরাস্ত ক’রে জয়দ্রথকে বধ করেছিলেন তখন তোমার বীরত্ব আর অস্ত্র কোথায় ছিল? আমার মাতুল অর্জুন সম্বন্ধে যথার্থ বলেছেন তাই তুমি ভর্ৎসনা করছ! দুর্মতি, আজ আমি তোমার শিরচ্ছেদ করব। এই ব’লে অশ্বত্থামা কর্ণের প্রতি ধাবিত হলেন, তখন দুর্যোধন ও কৃপ তাঁকে নিবারণ করলেন। দুর্যোধন বললেন, অশ্বত্থামা, প্রসন্ন হও, সূতপুত্রকে ক্ষমা কর। কর্ণ, কৃপ দ্রোণ শল্য শকুনি আর তোমার উপর মহৎ কার্যের ভার রয়েছে। মহামনা শান্তস্বভাব কৃপাচার্য বললেন, দুর্মতি সূতপুত্র, আমরা তোমাকে ক্ষমা করলাম, কিন্তু অর্জুন তোমার দর্প চূর্ণ করবেন।
তার পর কর্ণ ও দুর্যোধন পাণ্ডবযোদ্ধাদের সঙ্গে ঘোর যুদ্ধে রত হলেন। অশ্বত্থামা দুর্যোধনকে বললেন, আমি জীবিত থাকতে তোমার যুদ্ধ করা উচিত নয়; তুমি ব্যস্ত হয়ো না, আমিই অর্জুনকে নিবারণ করব। দুর্যোধন বললেন,, দ্বিজশ্রেষ্ঠ, দ্রোণাচার্য্য পুত্রের ন্যায় পাণ্ডবদের রক্ষা করেন, তুমিও তাদের উপেক্ষা ক'রে থাক। অশ্বত্থামা, প্রসন্ন হও, আমার শত্রুদের নাশ কর। অশ্বত্থামা বললেন, তোমার কথা সত্য, পাণ্ডবরা আমার ও আমার পিতার প্রিয়। আমরাও তাঁদের প্রিয়, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়। আমরা প্রাণের ভয় ত্যাগ করে যথাশক্তি যুদ্ধ করি।
দুর্য্যোধনকে আশ্বস্ত ক'রে অশ্বত্থামা রণস্থলে গেলেন এবং বিপক্ষ যোদ্ধৃগণকে নিপীড়িত করতে লাগলেন।