দ্রোণপর্ব: ১৭। কৃষ্ণার্জ্জুন ও ঘটোৎকচ

(চতুৰ্দশ দিনের আরও যুদ্ধ)

গাঢ় অন্ধকারে বিমূঢ় হয়ে সৈন্যরা পরস্পরকে বধ করছে দেখে দুর্য্যোধন তাঁর পদাতীদের বললেন, তোমরা অস্ত্র ত্যাগ ক'রে হাতে জ্বলন্ত প্রদীপ নাও। পদাতীরা প্রদীপ ধরলে রণভূমির অন্ধকার দূর হ'ল। পাণ্ডবরাও পদাতী সৈন্যের হাতে প্রদীপ দিলেন। প্রত্যেক হস্তীর পৃষ্ঠে সাত, রথে দশ, অশ্বে দুই, এবং সেনার পার্শ্বে পশ্চাতে ও ধ্বজেও প্রদীপ দেওয়া হ'ল।

সেই নিদারুণ রাত্রিয়ুদ্ধে এক বার পাণ্ডবপক্ষের অন্য বার কৌরবপক্ষের জয় হ'তে লাগল। স্বয়ম্বরসভায় যেমন বিবাহাৰ্থীদের নাম ঘোষিত হয় সেইরূপ রাজারা নিজ নিজ নাম ও গোত্র শুনিয়ে বিপক্ষকে প্রহার করতে লাগলেন। অর্জ্জুনের প্রবল শরবর্ষণে কৌরবসৈন্য ভয়ার্ত হয়ে পালাচ্ছে দেখে দুর্য্যোধন দ্রোণ ও কর্ণকে বললেন, অর্জ্জুন জয়দ্রথকে বধ করেছে সেজন্য ক্ষুব্ধ হয়ে আপনারাই রাত্রিকালে এই যুদ্ধ আরম্ভ করেছেন। পাণ্ডবসৈন্য আমাদের সৈন্য সংহার করছে, আর আপনারা অক্ষমের ন্যায় তা দেখছেন। হে মাননীয় বীরদ্বয়, যদি আমাকে ত্যাগ করাই আপনাদের ইচ্ছা ছিল তবে আমাকে আশ্বাস দেওয়া আপনাদের উচিত হয় নি। আপনাদের অভিপ্রায় জানলে এই সৈন্যক্ষয়কর যুদ্ধ আরম্ভ করতাম না। যদি আমাকে ত্যাগ করতে না চান তবে যুদ্ধে আপনাদের বিক্রম প্রকাশ করুন। দুর্য্যোধনের বাকরূপ কশাঘাতে দ্রোণ ও কর্ণ পদাহত সর্পের ন্যায় উত্তেজিত হয়ে যুদ্ধ করতে গেলেন।

কর্ণের শরবর্ষণে আকুল হয়ে পাণ্ডবসৈন্য পালাচ্ছে দেখে যুধিষ্ঠির অর্জুনকে বললেন, আমাদের যোদ্ধারা অনাথের ন্যায় বন্ধুদের ডাকছে, কর্ণের শরসন্ধান আর শরত্যাগের মধ্যে কোনও অবকাশ দেখা যাচ্ছে না, নিশ্চয় আজ ইনি আমাদের সংহার করবেন। ধনঞ্জয়, কর্ণের বধের জন্য যা করা উচিত তা কর। অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন, আমাদের রথীরা পালাচ্ছেন আর কর্ণ নির্ভয়ে তাঁদের শরাঘাত করছেন, এ আমি সইতে পারছি না। মধুসূদন, শীঘ্র কর্ণের কাছে রথ নিয়ে চল, হয় আমি তাঁকে মারব না হয় তিনি আমাকে মারবেন।

কৃষ্ণ বললেন, তুমি অথবা রাক্ষস ঘটোৎকচ ভিন্ন আর কেউ কর্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারবে না। এখন তাঁর সঙ্গে তোমার যুদ্ধ করা আমি উচিত মনে করি না, কারণ তাঁর কাছে ইন্দ্রদত্ত শক্তি অস্ত্র আছে, তোমাকে মারবার জন্য কর্ণ এই ভয়ংকর অস্ত্র সর্বদা সঙ্গে রাখেন। অতএব ঘটোৎকচই তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করুক। ভীমসেনের এই পুত্রের কাছে দৈব রাক্ষস ও আসুর সর্বপ্রকার অস্ত্রই রয়েছে, সে কর্ণকে জয় করবে তাতে আমার সংশয় নেই।

কৃষ্ণের আহ্বান শুনে দীপ্তকুণ্ডলধারী সশস্ত্র মেঘবর্ণ ঘটোৎকচ এসে অভিবাদন করলেন। কৃষ্ণ সহাস্যে বললেন, পুত্র ঘটোৎকচ, এখন একমাত্র তোমারই বিক্রমপ্রকাশের সময় উপস্থিত হয়েছে। তোমার আত্মীয়গণ বিপৎসাগরে নিমগ্ন হয়েছেন, তুমি তাঁদের রক্ষা কর। কর্ণ পাণ্ডবসৈন্য নিপীড়িত করছেন, ক্ষত্রিয় বীরগণকে হনন করছেন, এই নিশীথকালে পাঞ্চালরা সিংহের ভয়ে মৃগের ন্যায় পালিয়ে যাচ্ছে। তোমার নানাবিধ অস্ত্র ও রাক্ষসী মায়া আছে, আর রাক্ষসগণ রাত্রিতেই অধিক বলবান হয়।

অর্জুন বললেন, ঘটোৎকচ, আমি মনে করি সর্বসৈন্যমধ্যে তুমি, সাত্যকি আর ভীমসেন এই তিন জনই শ্রেষ্ঠ। তুমি এই রাত্রিতে কর্ণের সঙ্গে দ্বৈরথ যুদ্ধ কর, সাত্যকি তোমার পৃষ্ঠরক্ষক হবেন।

ঘটোৎকচ বললেন, নরশ্রেষ্ঠ, আমি একাকীই কর্ণ দ্রোণ এবং অন্য ক্ষত্রিয় বীরগণকে জয় করতে পারি। আমি এমন যুদ্ধ করব যে লোকে চিরকাল তার কথা বলবে। কোনও বীরকে আমি ছাড়ব না, ভয়ে কৃতাঞ্জলি হলেও নয়, রাক্ষস-ধর্ম অনুসারে সকলকেই বধ করব। এই বলে ঘটোৎকচ কর্ণের দিকে ধাবিত হলেন।