দ্রোণপর্ব: ২০। দ্রোণের ব্রহ্মলোকে প্রয়াণ
(পঞ্চদশ দিনের আরও যুদ্ধ)
দ্রোণের শরবৃষ্টিতে পাণ্ডবসেনা নিরন্তর নিহত হচ্ছে দেখে কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, হাতে ধনুর্বাণ থাকলে দ্রোণ ইন্দ্রাদি দেবগণেরও অজয়, কিন্তু যদি অস্ত্র ত্যাগ করেন তবে মানুষও তাঁকে বধ করতে পারে। তোমরা এখন ধর্মের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে জয়ের উপর স্থির কর, নতুবা দ্রোণই তোমাদের সকলকে বধ করবেন। আমার মনে হয়, অশ্বত্থামার মৃত্যুসংবাদ পেলে উনি আর যুদ্ধ করবেন না, অতএব কেউ তাঁকে বলুক যে অশ্বত্থামা যুদ্ধে হত হয়েছেন।
কৃষ্ণের এই প্রস্তাব অর্জুনের রুচিকর হ’ল না, কিন্তু আর সকলেই এতে মত দিলেন, যুধিষ্ঠিরও নিতান্ত অনিচ্ছায় সম্মত হলেন। মালবরাজ ইন্দ্রবর্মার অশ্বত্থামা নামে এক হস্তী ছিল। ভীম তাকে গদাঘাতে বধ করলেন এবং দ্রোণের কাছে গিয়ে লজ্জিতভাবে উচ্চৈঃস্বরে বললেন, অশ্বত্থামা হত হয়েছে। বালুকাময় তটস্তূপ যেমন জলে গলিত হয়, ভীমসেনের অপ্রিয় বাক্য শুনে সেইরূপ দ্রোণের অঙ্গ অবসন্ন হ’ল। কিন্তু তিনি পুত্রের বীরত্ব জানতেন, সেজন্য ভীমের কথায় অধীর হলেন না, ধৃষ্টদ্যুম্নের উপর তীক্ষ্ণ বাণ ক্ষেপণ করতে লাগলেন। ধৃষ্টদ্যুম্নের রথ ও সমস্ত অঙ্গ বিনষ্ট হ’ল, তখন ভীম তাঁকে নিজের রথে তুলে নিয়ে বললেন, তুমি ভিন্ন আর কেউ আচার্যকে বধ করতে পারবে না, তোমার উপরেই এই ভার আছে, অতএব শীঘ্র ওঁকে মারবার চেষ্টা কর।
দ্রোণ ক্রুদ্ধ হয়ে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করলেন। বিশ হাজার পাঞ্চাল রথী, পাঁচ শ মৎস্য সৈন্য, ছয় হাজার সৃঞ্জয় সৈন্য, দশ হাজার হস্তী এবং দশ হাজার অশ্ব নিপাতিত হ’ল। এই সময়ে বিশ্বামিত্র জমদগ্নি ভরদ্বাজ গৌতম বশিষ্ঠ প্রভৃতি মহর্ষিগণ অগ্নিদেবকে পুরোবর্ত্তী ক’রে সমরস্থলে উপস্থিত হলেন। তাঁরা বললেন, দ্রোণ, তুমি অধর্মযুদ্ধ করছ, তোমার মৃত্যুকাল উপস্থিত হয়েছে। তুমি বেদবেদাঙ্গবিৎ সত্যধর্মে নিরত ব্রাহ্মণ, এরূপ ক্রূর কর্ম করা তোমার উচিত নয়। যারা রহস্যাস্ত্রে অনভিজ্ঞ এমন লোককে তুমি রহস্যাস্ত্র দিয়ে মারছ, এই পাপকর্ম আর ক’রো না, শীঘ্র অস্ত্র ত্যাগ কর।
যুদ্ধে বিরত হয়ে দ্রোণ বিষণ্ণমনে যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করলেন, অশ্বত্থামা হত হয়েছেন কিনা। দ্রোণের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে ত্রিলোকের ঐশ্বর্যের জন্যও যুধিষ্ঠির মিথ্যা বলবেন না। কৃষ্ণ উদ্বিগ্ন হয়ে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, দ্রোণ যদি আর অর্ধ দিন যুদ্ধ করেন তবে আপনার সমস্ত সৈন্য বিনষ্ট হবে। আমাদের রক্ষার জন্য এখন আপনি সত্য না ব’লে মিথ্যাই বলুন, জীবনরক্ষার জন্য মিথ্যা বললে পাপ হয় না। ভীম বললেন, মালবরাজ ইন্দ্রবর্মার অশ্বত্থামা নামে এক হস্তী ছিল, সে আমাদের সৈন্য মথিত করছিল সেজন্য তাকে আমি বধ করেছি। তার পর আমি দ্রোণকে বললাম, ভগবান, অশ্বত্থামা হত হয়েছেন, আপনি যুদ্ধ থেকে বিরত হ’ন; কিন্তু উনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন না। মহারাজ, আপনি গোবিন্দের কথা শুনলেন, দ্রোণকে বলেন যে অশ্বত্থামা মরেছেন। আপনি বললে দ্রোণ আর যুদ্ধ করবেন না।
কৃষ্ণের প্ররোচনায়, ভীমের সমর্থনে, এবং দ্রোণবধের ভবিতব্যতা জেনে যুধিষ্ঠির সম্মত হলেন। তাঁর অসত্যভাষণের ভয় ছিল, জয়লাভেরও আগ্রহ ছিল। তিনি উচ্চৈঃস্বরে বললেন, ‘অশ্বত্থামা হতঃ’ — অশ্বত্থামা হত হয়েছেন, তার পর অস্ফুটম্বরে বললেন, ‘ইতি কুঞ্জরঃ’ — এই নামের হস্তী। যুধিষ্ঠিরের রথ পূর্বে ভূমি থেকে চার আঙুল উপরে থাকত, এখন মিথ্যা বলার পাপে তাঁর বাহনসকল ভূমি স্পর্শ করলে।
মহর্ষিদের কথা শুনে দ্রোণের ধারণা জন্মেছিল যে তিনি পাণ্ডবদের নিকট অপরাধী হয়েছেন। এখন তিনি পুত্রের মৃত্যুসংবাদে শোকে অভিভূত এবং ধৃষ্টদ্যুম্নকে দেখে উদবিগ্ন হলেন, আর যুদ্ধ করতে পারলেন না। এই সময়ে ধৃষ্টদ্যুম্ন — যাকে দ্রুপদ প্রজ্বলিত অগ্নি থেকে দ্রোণবধের নিমিত্ত লাভ করেছিলেন — একটি সুদৃঢ় দীর্ঘ ধনুকে আশীর্বিষতুল্য শর সন্ধান করলেন। দ্রোণ সেই শর নিবারণের চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁর উপদিষ্ট অস্ত্র তাঁর স্মরণ হ’ল না। দ্রোণের কাছে গিয়ে ভীম ধীরে ধীরে বললেন, যে হীন ব্রাহ্মণগণ স্বকর্মে তুষ্ট না থেকে অস্ত্রশিক্ষা করেছে, তারা যদি যুদ্ধে প্রবৃত্ত না হ’ত তবে ক্ষত্রিয়কুল ক্ষয় পেত না। এই সেনারা নিজের বৃত্তি অনুসারে যুদ্ধ করছে, কিন্তু আপনি অব্রাহ্মণ্যের বৃত্তি নিয়ে এক পুত্রের জন্য বহু প্রাণী বধ করছেন, আপনার লজ্জা হচ্ছে না কেন? যাঁর জন্য আপনি অস্ত্রধারণ ক’রে আছেন, যাঁর অপেক্ষায় আপনি জীবিত আছেন, সেই পুত্র আজ রণভূমিতে শুয়ে আছে। ধর্মরাজের বাক্যে আপনি সন্দেহ করতে পারেন না।
দ্রোণ শরাসন ত্যাগ ক’রে বললেন, কর্ণ, কর্ণ, কৃপ, দুর্যোধন, তোমরা যথশক্তি যুদ্ধ কর, পাণ্ডবদের আর তোমাদের মঙ্গল হ’ক, আমি অস্ত্র ত্যাগ করলাম। এই ব’লে তিনি উচ্চৈঃস্বরে অশ্বত্থামাকে ডাকলেন, তার পর সমস্ত অস্ত্র রথের মধ্যে রেখে যোগস্থ হয়ে সর্বপ্রাণীকে অভয় দিলেন। এই অবসর পেয়ে ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁর রথ থেকে লাফিয়ে নামলেন এবং খড়্গ নিয়ে দ্রোণের প্রতি ধাবিত হলেন। দুই পক্ষের সেনারা হাহাকার ক’রে উঠল। দ্রোণ যোগসম্পন্ন হয়ে মুখ কিঞ্চিৎ উন্নত ক’রে নিমীলিতনেত্রে পরমপুরুষ বিষ্ণুকে ধ্যান করতে লাগলেন এবং রহস্যরূপে একাক্ষর ওম্-মন্ত্র স্মরণ করতে করতে ব্রহ্মলোকে যাত্রা করলেন। মৃত্যুকালে তাঁর দেহ থেকে দিব্য জ্যোতি নির্গত হয়ে উল্কার ন্যায় নিমেষমধ্যে অন্তর্হিত হ'ল। দ্রোণের এই ব্রহ্মলোকযাত্রা কেবল পাঁচজন দেখতে পেলেন — কৃষ্ণ কৃপ যুধিষ্ঠির অর্জুন ও সঞ্জয়।
দ্রোণ রক্তাক্তদেহে নিরস্ত্র হয়ে রথে ব'সে আছেন দেখে ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁর প্রতি ধাবিত হলেন। 'ধ্রুপদপুত্র, আচার্যকে জীবিত ধ'রে আন, বধ ক'রো না' — উচ্চস্বরে এই ব'লে অর্জুন তাঁকে নিবারণ করতে গেলেন; তথাপি ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রাণহীন দ্রোণের কেশ গ্রহণ ক'রে শিরশ্ছেদ করলেন এবং খড়্গ ঘূর্ণিত ক'রে সিংহনাদ করতে লাগলেন। তার পর তিনি দ্রোণের মুণ্ড তুলে নিয়ে কৌরব-সৈন্যগণের সম্মুখে নিক্ষেপ করলেন।
দ্রোণের মৃত্যুর পর কৌরবসৈন্য ভগ্ন হ'ল। কুরুপক্ষের রাজারা দ্রোণের দেহের জন্য রণস্থলে অন্বেষণ করলেন, কিন্তু বহু কবন্ধের মধ্যে তা দেখতে পেলেন না। ধৃষ্টদ্যুম্নকে আলিঙ্গন ক'রে ভীম বললেন, সূতপুত্র কর্ণ আর পাপী দুর্যোধন নিহত হ'লে আবার তোমাকে আলিঙ্গন করব। এই ব'লে ভীম হৃষ্টচিত্তে তাল ঠুকে পৃথিবী কম্পিত করতে লাগলেন।