দ্রোণপর্ব: ১৯। দ্রুপদ-বিরাট-বধ — দুর্য্যোধনের বালভাষিত
#### ( পঞ্চদশ দিনের যুদ্ধ )
সেই ভয়ঙ্কর রাত্রির অর্দ্ধভাগ অতীত হ’লে সৈন্যরা পরিশ্রান্ত ও নিদ্রাতুর হয়ে পড়ল। অনেকে অস্ত্র ত্যাগ ক’রে হস্তী ও অশ্বের পৃষ্ঠে নিদ্রিত হ’ল, অনেকে নিদ্রান্ধ হয়ে শত্রু মনে ক’রে স্বপক্ষকেই বধ করতে লাগল। তাদের এই অবস্থা দেখে অর্জ্জুন সর্ব্ব দিক নিনাদিত ক’রে উচ্চৈঃস্বরে বললেন, সৈন্যগণ, রণভূমি ধূলি ও অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়েছে, তোমাদের বাহন এবং তোমরা শ্রান্ত ও নিদ্রান্ধ হয়েছ, যদি ইচ্ছা কর তবে এই রণভূমিতে কিছু কাল নিদ্রা যাও। চন্দ্রোদয় হ’লে কুরু-পাণ্ডবগণ বিশ্রামের পর আবার যুদ্ধ করবে। অর্জ্জুনের এই কথা শুনে কৌরবসৈন্যরা চিৎকার করে বললে, কর্ণ, কর্ণ, রাজা দুর্য্যোধন, পাণ্ডবসৈন্য যুদ্ধে বিরত হয়েছে, আপনারাও বিরত হ’ন। তখন দুই পক্ষই যুদ্ধে নিবৃত্ত হয়ে অর্জ্জুনের প্রশংসা করতে লাগল। সমস্ত সৈন্য নিদ্রামগ্ন হওয়ায় বোধ হ’ল যেন কোনও নিপুণ চিত্রকর পটের উপর তাদের চিত্রিত করেছে।
কিছু কাল পরে মহাদেবের বৃষভের ন্যায়, মদনের শরাসনের ন্যায়, নব-বধূর ঈষৎ হাস্যের ন্যায় শ্বেতবর্ণ মনোহর চন্দ্র ক্রমশ উদিত হলেন। তখন অন্ধকার দূর হ’ল, সৈন্যগণ নিদ্রা থেকে উঠে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হ’ল।
দুর্য্যোধন দ্রোণকে বললেন, আমাদের শত্রুরা যখন শ্রান্ত ও অবসন্ন হয়ে বিশ্রাম করছিল তখন আমরা তাদের লক্ষ্য রূপে পেয়েছিলাম। তারা ক্ষমার যোগ্য না হ’লেও আপনার প্রিয়কামনায় তাদের ক্ষমা করেছি। পাণ্ডবরা এখন বিশ্রাম ক’রে বলবান হয়েছে। আমাদের তেজ ও শক্তি ক্রমশই কমছে, কিন্তু আপনার প্রশ্রয় পেয়ে পাণ্ডবদের ক্রমশ বলবর্দ্ধি হচ্ছে। আপনি সর্ব্বশাস্ত্রবিৎ, দিব্য অস্ত্রে ত্রিভুবন সংহার করতে পারেন, কিন্তু পাণ্ডবগণকে শিষ্য জ্ঞান ক’রে অথবা আমার দুর্ভাগ্যবশতঃ আপনি তাদের ক্ষমা ক’রে আসছেন। দ্রোণ বললেন, আমি স্থবির হয়েও যথাশক্তি যুদ্ধ করছি, অতঃপর বিজয়লাভের জন্য হীন কার্য্যও করব, ভাল হ’ক মন্দ হ’ক তুমি যা চাও তাই আমি করব। আমি শপথ করছি, যুদ্ধে সমস্ত পাঞ্চাল বধ না ক’রে আমার বর্ম্ম খুলব না।
রাত্রির তিন মুহূর্ত্ত অবশিষ্ট থাকতে পুনর্ব্বার যুদ্ধ আরম্ভ হ’ল। - Page Number: ৪৫৪ - Header: মহাভারত দ্রোণ কৌরবসেনা দুই ভাগে বিভক্ত করলেন এবং এক ভাগ নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। তখন আকাশতলে চন্দ্রের প্রভা ক্ষীণ হ’ল। বিরাট ও দ্রুপদ সসৈন্যে দ্রোণকে আক্রমণ করলেন। দ্রোণের শরাঘাতে দ্রুপদের তিন পৌত্র নিহত হলেন। চেদি কেকয় সৃঞ্জয় ও মৎস্য সৈন্যগণ পরাভূত হ’ল। কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর দ্রোণ ভল্লের আঘাতে দ্রুপদ ও বিরাটকে বধ করলেন।
ভীমসেন উগ্রবাক্যে ধৃষ্টদ্যুম্নকে বললেন, কোন্ ক্ষত্রিয় দ্রুপদের বংশে জন্মগ্রহণ করে এবং সর্বশাস্ত্রবিশারদ হয়ে শত্রুকে দেখেও উপেক্ষা করে? কোন্ পুরুষ রাজসভায় শপথ ক’রে পিতা ও পুত্রগণের হত্যা দেখেও শত্রুকে পরিত্যাগ করে? এই ব’লে ভীম শরক্ষেপ করতে করতে দ্রোণসৈন্যের মধ্যে প্রবেশ করলেন। ধৃষ্টদ্যুম্নও তাঁর অনুসরণ করলেন।
কিছুক্ষণ পরে সূর্যোদয় হ’ল। যোদ্ধারা ধর্মবিধিমতে সহস্রাংশু আদিত্যের উপাসনা করলেন, তার পর আবার যুদ্ধ করতে লাগলেন। সাত্যকিকে দেখে দুর্যোধন বললেন, সখা, ক্রোধ লোভ ক্ষত্রিয়াচার ও পৌরুষকে ধিক — আমরা পরস্পরের প্রতি শরসন্ধান করছি! বাল্যকালে আমরা পরস্পরের প্রাণ অপেক্ষা প্রিয় ছিলাম, এখন এই রণস্থলে সে সমস্তই জীর্ণ হয়ে গেছে। সাত্যকি, আমাদের সেই বাল্যকালের খেলা কোথায় গেল, এই যুদ্ধই বা কেন হ’ল? যে ধনের লোভে আমরা যুদ্ধ করছি তা নিয়ে আমরা কি করব? সাত্যকি সহাস্যে উত্তর দিলেন, রাজপুত্র, আমরা যেখানে একসঙ্গে খেলতাম এ সেই সভামণ্ডপ নয়, আচার্যের গৃহও নয়। ক্ষত্রিয়ের স্বভাবই এই, তারা গুরুজনকেও বধ করে। যদি আমি তোমার প্রিয় হই তবে শীঘ্র আমাকে বধ কর, যাতে আমি পুণ্যলোকে যেতে পারি, মিত্রদের এই ঘোর বিপদ দেখতে আমি আর ইচ্ছা করি না। এই ব’লে সাত্যকি দুর্যোধনের প্রতি ধাবিত হলেন এবং সিংহ ও হস্তীর ন্যায় দুজনে যুদ্ধে রত হলেন।