কর্ণপর্ব: ২। অশ্বত্থামার পরাজয়
( ষোড়শ দিনের যুদ্ধ )
পরদিন সূর্য্যোদয় হ'লে কর্ণ যুদ্ধসজ্জার আদেশ দিলেন। তখন হস্তী অশ্ব ও সম্মার্জ্জিত রথ সকল প্রস্তুত হ'ল, যোদ্ধারা পরস্পরকে ডাকতে লাগলেন। কর্ণ শঙ্খধ্বনি করতে করতে যুদ্ধযাত্রা করলেন। তাঁর রথ শ্বেতপতাকায় ভূষিত এবং বহু ধনু, তূণীর গদা শতঘ্নী শক্তি শূল তোমর প্রভৃতি অস্ত্র সমন্বিত। রথধ্বজের উপর লাঞ্ছনস্বরূপ গজবন্ধনরজ্জু ছিল। বলাকবর্ণ চার অশ্ব সেই রথ বহন ক'রে নিয়ে চলল। কর্ণ মকরব্যূহ রচনা ক'রে স্বয়ং তার মুখে রইলেন এবং শকুনি, তৎপুত্র উলূক, অশ্বত্থামা, দুর্য্যোধনাদি, নারায়ণী সেনা সহ কৃতবর্মা, ত্রিগর্ত ও দাক্ষিণাত্য সৈন্য সহ কৃপাচার্য্য, মদ্রদেশীয় বৃহৎ সৈন্য সহ শল্য, সহস্র রথ ও তিন শত হস্তী সহ সুষেণ, এবং বিশাল বাহিনী সহ রাজা চিত্র ও তাঁর ভ্রাতা চিত্রসেন সেই ব্যুহের বিভিন্ন অংশ রক্ষা করতে লাগলেন।
কর্ণকে সসৈন্যে আসতে দেখে যুধিষ্ঠির অর্জ্জুনকে বললেন, মহাবাহু, কৌরববাহিনীর শ্রেষ্ঠ বীরগণ হত হয়েছেন, কেবল নিকৃষ্ট যোদ্ধারা অবশিষ্ট আছেন। সুতপুত্র কর্ণই ও পক্ষের একমাত্র ধনুর্দ্ধর, তাঁকে বধ করে তুমি বিজয়ী হও। যে শল্য দ্বাদশ বৎসর আমার হৃদয়ে বিদ্ধ আছে তা কর্ণ নিহত হ'লে উদ্ধৃত হবে, এই যুদ্ধে তুমি ইচ্ছামত ব্যূহ রচনা কর। তখন অর্জ্জুন অর্ধচন্দ্রব্যূহ রচনা করলেন, তাঁর বাম পার্শ্বে ভীমসেন, দক্ষিণে ধৃষ্টদ্যুম্ন, এবং মধ্যদেশে যুধিষ্ঠির ও তাঁর পশ্চাতে অর্জ্জুন নকুল সহদেব রইলেন। দুই পাঞ্চালবীর যুধামন্যু ও উত্তমৌজা এবং অন্যান্য যোদ্ধারা ব্যুহের উপযুক্ত স্থানে অবস্থান করলেন।
দুই পক্ষে শঙ্খ ভেরী পণব প্রভৃতি রণবাদ্য বেজে উঠল, জয়াকাঙ্ক্ষী বীরগণ সিংহনাদ করতে লাগলেন। অশ্বের হ্রেষা, হস্তীর বৃংহিতধ্বনি, এবং রথচক্রের ঘর্ঘর শব্দে সর্ব দিক নিনাদিত হল। গজারোহী ভীমসেন ও কুলূত দেশের রাজা ক্ষেমধূতি সসৈন্যে পরস্পরকে আক্রমণ করলেন। ক্ষেমধূতি ভীমের গদাঘাতে নিহত হলেন। কর্ণের সঙ্গে নকুল, অশ্বত্থামার সঙ্গে ভীম, কৈকয়দেশীয় বিন্দ অনুবিন্দের সঙ্গে সাত্যকি, অর্জুনপুত্র শ্রুতকর্মার সঙ্গে অভিসাররাজ চিত্রসেন, যুধিষ্ঠিরপুত্র প্রতিবিন্ধ্যের সঙ্গে চিত্র, দুর্যোধনের সঙ্গে যুধিষ্ঠির, সংশপ্তকগণের সঙ্গে অর্জুন, কৃপাচার্যের সঙ্গে ধৃষ্টদ্যুম্ন, কৃতবর্মার সঙ্গে শিখণ্ডী, শল্যের সঙ্গে সহদেবপুত্র শ্রুতসেন, এবং দুঃশাসনের সঙ্গে সহদেব ঘোর যুদ্ধ করতে লাগলেন।
সাত্যকির শরাঘাতে অনুবিন্দ এবং অসির আঘাতে বিন্দ নিহত হলেন। শ্রুতকর্মা ভল্লের আঘাতে চিত্রসেনের মস্তক ছেদন করলেন। প্রতিবিন্ধ্যের তোমরের আঘাতে চিত্র নিহত হলেন। ভীমের প্রচণ্ড বল এবং অশ্বত্থামার আশ্চর্য অস্ত্রশিক্ষা দেখে আকাশস্থ সিদ্ধ চারণ মহর্ষি ও দেবগণ সাধু সাধু বলতে লাগলেন। কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর অশ্বত্থামা ও ভীম পরস্পরের শরাঘাতে অচেতন হয়ে নিজ নিজ রথের মধ্যে পড়ে গেলেন, তাঁদের সারথিরা রথ সরিয়ে নিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে অশ্বত্থামা পুনর্বার রণভূমিতে এসে অর্জুনকে যুদ্ধে আহ্বান করলেন। অর্জুন তখন সংশপ্তকদের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন। কৃষ্ণ অশ্বত্থামার কাছে রথ নিয়ে গিয়ে বললেন, অশ্বত্থামা, আপনি স্থির হয়ে অস্ত্রপ্রহার করুন এবং অর্জুনের প্রহার সহ্য করুন, উপজীবীদের ভর্ত্তৃপিণ্ড শোধ করবার এই সময় (১)। ব্রাহ্মণদের বাদানুবাদ সদ্গুণ, কিন্তু ক্ষত্রিয়ের জয়পরাজয় স্থলে অস্ত্রে সাধিত হয়। আপনি মোহবশে অর্জুনের কাছে যে সৎকার চেয়েছেন তা পাবার জন্য স্থির হয়ে যুদ্ধ করুন। ‘তাই হবে’ — এই ব’লে অশ্বত্থামা অনেক-গুলি নারাচ নিক্ষেপ ক’রে কৃষ্ণ ও অর্জুনকে বিদ্ধ করলেন। অর্জুনও তাঁর গাণ্ডীব ধনু থেকে নিরন্তর বাণবর্ষণ করতে লাগলেন। কলিঙ্গ মল্ল অঙ্গ ও নিষাদ বীরগণ ঐরাবততুল্য হস্তীর দল নিয়ে অর্জুনের প্রতি ধাবিত হলেন, কিন্তু বিধ্বস্ত হয়ে পলায়ন করলেন।
অশ্বত্থামার লৌহময় বাণের আঘাতে কৃষ্ণ ও অর্জুন রঞ্জিত হলেন, লোকে মনে করলে তাঁরা নিহত হয়েছেন। কৃষ্ণ বললেন, অর্জুন, তুমি অসাবধান হয়ে আছ কেন, অশ্বত্থামাকে বধ কর। প্রতিকার না করলে ব্যাধি যেমন কষ্টকর হয়, অশ্বত্থামাকে উপেক্ষা করা সেইরূপ বিপজ্জনক হবে। তখন অর্জুন সাবধানে শরক্ষেপণ ক'রে অশ্বত্থামার চন্দনচর্চিত দুই বাহু, বক্ষ মস্তক ও উরুদ্বয় বিদ্ধ করলেন। অশ্বত্থামার রথের অশ্বসকল আহত হয়ে রথ নিয়ে সবেগে দূরে চ'লে গেল। অর্জুনের শরাঘাতে অভিভূত ও নিরুৎসাহ হয়ে অশ্বত্থামা আর যুদ্ধ করতে ইচ্ছা করলেন না, কৃষ্ণার্জুনের জয় হয়েছে জেনে কর্ণের সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করলেন।