কর্ণপর্ব: ৯। কর্ণ-শল্যের যুদ্ধযাত্রা

দুর্যোধন বললেন, মদ্ররাজ, মহর্ষি মার্কণ্ডেয় আমার পিতাকে দেবাসুর-যুদ্ধের যে ইতিহাস বলেছিলেন তা শুনুন। দৈত্যগণ দেবগণের সহিত যুদ্ধে পরাজিত হ’লে তারকাসুরের তিন পুত্র তারাক্ষ কমলাক্ষ ও বিদ্যুন্মালী কঠোর তপস্যা ক’রে ব্রহ্মাকে তুষ্ট করলে। ব্রহ্মা বর দিতে এলে তিন ভ্রাতা এই বর চাইলে, তারা যেন সর্বভূতের অবধ্য হয়। ব্রহ্মা বললেন, সকলেই অমরত্ব পেতে পারে না, তোমরা অন্য বর চাও। তখন তারকের পুত্রেরা বহু বার মন্ত্রণা ক’রে বললে, প্রপিতামহ, আমরা তিনটি কামগামী নগরে বাস করতে ইচ্ছা করি যেখানে সর্বপ্রকার অভীষ্ট বস্তু থাকবে, দেব দানব যক্ষ রাক্ষস প্রভৃতি যা বিনষ্ট করতে পারবে না, এবং আভিচারিক ক্রিয়া, অস্ত্রশস্ত্র বা ব্রহ্মশাপেও যার হানি হবে না। আমরা এই তিন পুরে অবস্থান ক’রে জগতে বিচরণ করব। সহস্র বৎসর পরে আমরা তিন জনে মিলিত হব, তখন আমাদের ত্রিপুর এক হয়ে যাবে। ভগবান, সেই সময়ে যে দেবশ্রেষ্ঠ সম্মিলিত ত্রিপুরকে এক বাণে ভেদ করতে পারবেন তিনিই আমাদের মৃত্যুর কারণ হবেন। ব্রহ্মা ‘তাই হবে’ ব’লে প্রস্থান করলেন।

তারকপুত্রগণ ময় দানবকে ত্রিপুরনির্মাণের ভার দিলে। ময় দানব তপস্যার প্রভাবে একটি স্বর্ণের, একটি রৌপ্যের এবং একটি কৃষ্ণলৌহের পুর নির্মাণ করলেন। প্রথম পুরটি স্বর্গে, দ্বিতীয়টি অন্তরীক্ষে এবং তৃতীয়টি পৃথিবীতে থাকত। এই পুরত্রয়ের প্রত্যেকটি চক্রবৎ; দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে শত যোজন, এবং বৃহৎ প্রাকার তোরণ প্রাসাদ মহাপথ প্রভৃতি সমন্বিত। তারকাক্ষ স্বর্ণময় পুরে, কমলাক্ষ রৌপ্যময় পুরে, এবং বিদ্যুন্মালী লৌহময় পুরে বাস করতে লাগল। দেবগণ কর্তৃক বিতাড়িত কোটি কোটি দৈত্য এসে সেই ত্রিপুরদুর্গে আশ্রয় নিলে। ময় দানব তাদের সকল মনস্কাম মায়াবলে সিদ্ধ করলেন। তারকাক্ষের হরি নামে এক পুর ছিল, সে ব্রহ্মার নিকট বর পেয়ে প্রত্যেক পুরে মৃতসঞ্জীবনী পুষ্করিণী নির্মাণ করলে। মৃত দৈত্যগণকে সেইসকল পুষ্করিণীতে নিক্ষেপ করলে তারা পূর্বের রূপে ও বলে জীবিত হয়ে উঠত।

সেই দর্পিত তিন দৈত্য ইচ্ছানুসারে বিচরণ ক’রে দেবগণ ঋষিগণ পিতৃগণ এবং ত্রিলোকের সকলের উপর উৎপীড়ন করতে লাগল। ইন্দ্র ত্রিপুরর সকল দিকে বজ্রাঘাত করলেন কিন্তু ভেদ করতে পারলেন না। তখন দেবগণ ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন। ব্রহ্মা বললেন, এই ত্রিপুর কেবল একটি বাণে বিদ্ধ করা যায়, কিন্তু ঈশান ভিন্ন আর কেউ তা পারবেন না, অতএব তোমরা তাঁকে যোদ্ধা রূপে বরণ কর। দেবতারা বৃষভধ্বজ মহাদেবের কাছে গিয়ে তাঁকে স্তবে তুষ্ট করলেন। মহেশ্বর অভয় দিলে ব্রহ্মা তাঁর প্রদত্ত বরের কথা জানিয়ে বললেন, শূলপাণি, আপনি শরণাপন্ন দেবগণের উপর প্রসন্ন হয়ে দানবগণকে বধ করুন। মহাদেব বললেন, দানবরা প্রবল, আমি একাকী তাদের বধ করতে পারব না; তোমরা সকলে মিলিত হয়ে আমার অর্ধ তেজ নিয়ে তাদের জয় কর। দেবগণ বললেন, আমাদের যত তেজোবল, দানবদেরও তত, অথবা আমাদের দ্বিগুণ। মহাদেব বললেন, সেই পাপীরা তোমাদের কাছে অপরাধী সেজন্য সর্বপ্রকারে বধ্য; তোমরা আমার তেজোবলের অর্ধেক নিয়ে শত্রুদের বধ কর। দেবগণ বললেন, মহেশ্বর, আমরা আপনার তেজের অর্ধ ধারণ করতে পারব না, অতএব আপনিই আমাদের সকলের অর্ধ তেজ নিয়ে শত্রু বধ করুন।

শঙ্কর সম্মত হয়ে দেবগণের অর্ধ তেজ নিলেন। তার ফলে তাঁর বল সকলের অপেক্ষা অধিক হ’ল এবং তিনি মহাদেব নামে খ্যাত হলেন। তখন দেবতাদের নির্দেশ অনুসারে বিশ্বকর্মা মহাদেবের রথ নির্মাণ করলেন। পৃথিবী দেবী, মন্দর পর্বত, দিগ্বিদিক, নক্ষত্র ও গ্রহগণ, নাগরাজ বাসুকি, হিমালয় পর্বত, বিন্ধ্য গিরি, সপ্তর্ষিমণ্ডল, গঙ্গা সরস্বতী ও সিন্ধু নদী, শুক্ল ও কৃষ্ণ পক্ষ, রাত্রি ও দিন, প্রভৃতি দিয়ে রথের বিভিন্ন অংশ নির্মিত হ'ল। চন্দ্রসূর্য চক্র হলেন এবং ইন্দ্র বরুণ যম ও কুবের এই চার লোকপাল অশ্ব হলেন। কনকপর্বত সুমেরু রথের ধ্বজদণ্ড এবং তড়িৎভূষিত মেঘ পতাকা হ'ল। মহাদেব সংবৎসরকে ধনু এবং কালরাত্রিকে জ্যা করলেন। বিষ্ণু অগ্নি ও চন্দ্র মহাদেবের বাণ হলেন।

খড়্গ বাণ ও শরাসন হাতে নিয়ে মহাদেব সহাস্যে দেবগণকে বললেন, সারথি কে হবেন? আমার চেয়ে যিনি শ্রেষ্ঠতর তাঁকেই তোমরা সারথি কর। তখন দেবতারা ব্রহ্মাকে বললেন, প্রভু, আপনি ভিন্ন আমরা সারথি দেখছি না, আপনি সর্বগুণযুক্ত এবং দেবগণের শ্রেষ্ঠ, অতএব আপনিই মহাদেবের অশ্বচালনা করুন। লোকপূজিত ব্রহ্মা সম্মত হয়ে রথে উঠলেন, অশ্বসকল মস্তক নত ক'রে ভূমি স্পর্শ করলে। ব্রহ্মা অশ্বদের উঠিয়ে মহাদেবকে বললেন, আরোহণ করুন। মহাদেব রথে উঠে ইন্দ্রাদি দেবগণকে বললেন, তোমরা এমন কথা বলবে না যে দানবদের বধ করুন, কোনও প্রকার দুঃখও করবে না। তার পর তিনি সহাস্যে ব্রহ্মাকে বললেন, যেখানে দৈত্যরা আছে সেদিকে সাবধানে অশ্বচালনা করুন।

ব্রহ্মা ত্রিপুরার অভিমুখে রথ নিয়ে চললেন। মহাদেবের ধ্বজগ্রে স্থিত বৃষভ ভয়ঙ্কর গর্জন ক'রে উঠল, সকল প্রাণী ভীত হ'ল, ত্রিভুবন কাঁপতে লাগল, বিবিধ ঘোর দুর্লক্ষণ দেখা গেল। সেই সময়ে বাণস্থিত বিষ্ণু অগ্নি ও চন্দ্র এবং রথারূঢ় ব্রহ্মা ও রুদ্রের ভারে এবং ধনুর বিক্ষোভে রথ ভূমিতে ব'সে গেল। নারায়ণ বাণ থেকে নির্গত হয়ে বৃষের রূপ ধারণ ক'রে সেই মহারথ ভূমি থেকে তুললেন। তখন ভগবান রুদ্র বৃষরূপী নারায়ণের পৃষ্ঠে এক চরণ এবং অশ্বের পৃষ্ঠে অন্য চরণ রেখে দানবপুর নিরীক্ষণ করলেন, এবং অশ্বের স্তন ছেদন ও বৃষের খুর দ্বিধা বিভক্ত করলেন। সেই অবধি অশ্বজাতির স্তন লুপ্ত হ'ল এবং গোজজাতির খুর বিভক্ত হ'ল। মহাদেব তাঁর ধনুতে জ্যারোপন এবং পাশুপত অস্ত্র যোগ ক'রে অপেক্ষা করছিলেন এমন সময়ে দানবদের তিন পুর একত্র মিলিত হ'ল। দেবগণ সিদ্ধগণ ও মহর্ষিগণ জয়ধ্বনি করে উঠলেন, মহাদেব তাঁর দিব্য ধনু আকর্ষণ ক'রে ত্রিপুর লক্ষ্য ক'রে বাণ মোচন করলেন। তুমুল আর্তনাদ উঠল, ত্রিপুর আকাশ থেকে পড়তে লাগল এবং দানবগণের সহিত দগ্ধ হয়ে পশ্চিম সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হ'ল। মহেশ্বর তখন হা হা শব্দে তাঁর ক্রোধজনিত অগ্নিকে নির্বাপিত ক'রে বললেন, ত্রিলোক ভস্ম ক'রো না।

উপাখ্যান শেষ ক’রে দুর্যোধন শল্যকে বললেন, লোকস্রষ্টা পিতামহ ব্রহ্মা যেমন রুদ্রের সারথ্য করেছিলেন সেইরূপ আপনিও কর্ণের সারথ্য করুন। কর্ণ রুদ্রের তুল্য এবং আপনি ব্রহ্মার সমান। আপনার উপরেই কর্ণ ও আমরা নির্ভর করছি, আমাদের রাজ্য ও বিজয়লাভও আপনার অধীন। আর একটি ইতিহাস বলছি শুনুন, যা কোনও ধর্মজ্ঞ ব্রাহ্মণ আমার পিতাকে বলেছিলেন। —

ভৃগুর বংশে জমদগ্নি নামে এক মহাতপা ঋষি জন্মেছিলেন, তাঁর একটি তেজস্বী গুণবান পুত্র ছিল যিনি রাম (পরশুরাম) নামে বিখ্যাত। এই পুত্রের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব বললেন, রাম, তুমি কি চাও তা আমি জানি। অপাত্র ও অসমর্থকে আমার অস্ত্রসকল দগ্ধ করে; তুমি যখন পবিত্র হবে তখন তোমাকে অস্ত্রদান করব। তার পর ভার্গব পরশুরাম বহু বৎসর তপস্যা ইন্দ্রিয়দমন নিয়ম-পালন পূজা হোম প্রভৃতির দ্বারা মহাদেবের আরাধনা করলেন। মহাদেব বললেন, ভার্গব, তুমি জগতের হিত এবং আমার প্রীতির নিমিত্ত দেবগণের শত্রুদের বধ কর। পরশুরাম বললেন, দেবেশ, আমার কি শক্তি আছে? আমি অস্ত্রশিক্ষাহীন, আর দানবগণ সর্বাস্ত্রবিশারদ ও দুর্ধর্ষ। মহাদেব বললেন, তুমি আমার আজ্ঞায় যাও, সকল শত্রু জয় ক’রে তুমি সর্বগুণান্বিত হবে। পরশুরাম দৈত্যগণকে যুদ্ধে আহ্বান ক’রে বজ্রতুল্য অস্ত্রের প্রহারে তাদের বধ করলেন। যুদ্ধকালে পরশুরামের দেহে যে ক্ষত হয়েছিল মহাদেবের করস্পর্শে তা দূর হ’ল। মহাদেব তুষ্ট হয়ে বললেন, ভৃগুনন্দন, দানবদের অস্ত্রাঘাতে তোমার শরীরে যে পীড়া হয়েছিল তাতে তোমার মানব কর্ম শেষ হয়ে গেছে। তুমি আমার কাছ থেকে অভীষ্ট দিব্য অস্ত্রসমূহ নাও।

তার পর মহাতপা পরশুরাম অভীষ্ট দিব্যাস্ত্র ও বর লাভ ক’রে মহাদেবের অনুমতি নিয়ে প্রস্থান করলেন। মহারাজ শল্য, পরশুরাম প্রীত হয়ে মহাত্মা কর্ণকে সমগ্র ধনুর্বেদ দান করেছিলেন। কর্ণের যদি পাপ থাকত তবে পরশুরাম তাঁকে দিব্যাস্ত্র দিতেন না। আমি কিছুতেই বিশ্বাস করি না যে কর্ণ সূতকুলে জন্মেছেন; আমি মনে করি তিনি ক্ষত্রিয়কুলে উৎপন্ন দেবপুত্র, পরিচয়গোপনের নিমিত্ত পরিত্যক্ত হয়েছিলেন। সূতনারী কি ক’রে কবচকুন্তলধারী দীর্ঘবাহু সূর্যতুল্য মহারথের জননী হতে পারে? মৃগী কি ব্যাঘ্র প্রসব করে?

শল্য বললেন, ব্রহ্মা ও মহাদেবের এই দিব্য আখ্যান আমি বহুবার শুনেছি, কৃষ্ণ ও তা জানেন। কর্ণ যদি কোনও প্রকারে অর্জুনকে বধ করতে পারেন তবে শঙ্খচক্রগদাধারী কেশব নিজেই যুদ্ধ করে তোমার সৈন্য ধ্বংস করবেন। কৃষ্ণ ক্রুদ্ধ হ'লে কোনও রাজা তাঁর বিপক্ষে দাঁড়াতে পারবেন না।

দুর্যোধন বললেন, মহাবাহু শল্য, আপনি কর্ণকে অবজ্ঞা করবেন না, ইনি অস্ত্রবিশারদগণের শ্রেষ্ঠ, এঁর ভয়ংকর জ্যানির্ঘোষ শুনে পাণ্ডবসৈন্য দশ দিকে পালায়। ঘটোৎকচ যখন রাত্রিকালে মায়াযুদ্ধ করছিল তখন কর্ণ তাকে বধ করেছিলেন। সেদিন অর্জুন ভয়ে কর্ণের সম্মুখীন হয় নি। কর্ণ ধনুর অগ্রভাগ দিয়ে ভীমসেনকে আকর্ষণ ক'রে বলেছিলেন, মূঢ় ঔদরিক। ইনি দুই মাদ্রীপুত্রকে জয় করেও কোনও কারণে তাদের বধ করেন নি। ইনি বৃষ্ণিবংশীয় বীরশ্রেষ্ঠ সাত্যকিকে রথহীন করেছেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতিকে বহুবার পরাজিত করেছেন। কর্ণ ক্রুদ্ধ হলে বজ্রপাণি ইন্দ্রকেও বধ করতে পারেন, পাণ্ডবরা কি ক'রে তাঁকে জয় করবে? বীর শল্য, বাহুবলে আপনার সমান কেউ নেই। অর্জুন নিহত হ'লে যদি কৃষ্ণ পাণ্ডবসৈন্য রক্ষা করতে পারেন তবে কর্ণের মৃত্যু হ'লে আপনিই আমাদের সৈন্য রক্ষা করবেন।

শল্য বললেন, গান্ধারীপুত্র, তুমি সৈন্যগণের সম্মুখে আমাকে কৃষ্ণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলেছ, এতে আমি প্রীত হয়েছি, আমি কর্ণের সারথি হব। কর্ণ দুর্যোধনকে বললেন, মদ্ররাজ বিশেষ হৃষ্টচিত্তে এ কথা বলছেন না, তুমি মধুরবাক্যে তাঁকে আরও কিছু বল। দুর্যোধন মেঘগম্ভীরস্বরে শল্যকে বললেন, পুরুষব্যাঘ্র, কর্ণ আজ যুদ্ধে আর সকলকে বিনষ্ট ক'রে অর্জুনকে বধ করতে ইচ্ছা করেন; আমি বার বার প্রার্থনা করছি, আপনি তাঁর অশ্বচালনা করুন। কৃষ্ণ যেমন পার্থের সচিব ও সারথি, আপনিও সেইরূপ সর্বপ্রকারে কর্ণকে রক্ষা করুন। শল্য তুষ্ট হয়ে দুর্যোধনকে আলিঙ্গন করে বললেন, রাজা, তোমার যা কিছু প্রিয়কার্য সে সমস্তই আমি করব। কিন্তু তোমাদের হিতকামনায় আমি কর্ণকে প্রিয় বা অপ্রিয় যে কথা বলব তা কর্ণকে আর তোমাকে সইতে হবে। কর্ণ বললেন, মদ্ররাজ, ব্রহ্মা যেমন মহাদেবের, কৃষ্ণ যেমন অর্জুনের, সেইরূপ আপনি সর্বদা আমাদের হিতে রত থাকুন।

শল্য কর্ণকে বললেন, আত্মশ্লাঘা আত্মপ্রশংসা পরনিন্দা ও পরস্তুতি — এই চতুর্বিধ কার্য সজ্জনের অকর্ত্তব্য, তথাপি তোমার প্রত্যয়ের জন্য আমি নিজের প্রশংসাবাক্য বলছি। অশ্বচালনায়, অশ্বতত্ত্বের জ্ঞানে এবং অশ্বচিকিৎসায় আমি মাতলির ন্যায় ইন্দ্রের সারথি হবার যোগ্য। সূতপুত্র, তুমি উদ্‌বিগ্ন হয়ো না, অর্জুনের সহিত যুদ্ধের সময় আমি তোমার রথ চালাব।

পরদিন প্রভাতকালে রথ প্রস্তুত হ’লে শল্য ও কর্ণ তাতে আরোহণ করলেন। দুর্যোধন বললেন, অধিরথপুত্র মহাবীর কর্ণ, ভীষ্ম ও দ্রোণ যে দুষ্কর কর্ম করতে পারেন নি তুমি তা সম্পন্ন কর। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে বন্দী কর, অথবা অর্জুন ভীম নকুল ও সহদেবকে বধ কর এবং সমস্ত পাণ্ডবসৈন্য ভস্মসাৎ কর। তখন সহস্র সহস্র ভেরী ও তেরী মেঘগর্জনের ন্যায় বেজে উঠল। কর্ণ শল্যকে বললেন, মহাবাহু, আপনি অশ্বচালনা করুন, আজ আমি ধনঞ্জয়, ভীমসেন, দুই মাদ্রীপুত্র ও রাজা যুধিষ্ঠিরকে বধ করব। আজ অর্জুন আমার বাহুবল দেখবে, পাণ্ডবদের বিনাশ এবং দুর্যোধনের জয়ের নিমিত্ত আজ আমি শত শত সহস্র সহস্র অতি তীক্ষ্ণ বাণ নিক্ষেপ করব।

শল্য বললেন, সূতপুত্র, পাণ্ডবরা মহাধনুর্ধর, তুমি তাঁদের অবজ্ঞা করছ কেন? যখন তুমি বজ্রনাদতুল্য গাণ্ডীবের নির্ঘোষ শুনবে তখন আর এমন কথা বলবে না। যখন দেখবে যে পাণ্ডবগণ বাণবর্ষণ ক’রে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন মেঘের ন্যায় ছায়াময় করছেন, ক্ষিপ্রহস্তে শত্রুসেনা বিদীর্ণ করছেন, তখন আর এমন কথা বলবে না। শল্যের কথা অগ্রাহ্য ক’রে কর্ণ বললেন, চলুন।

১০১ কর্ণ-শল্যের কলহ