কর্ণপর্ব: ৮। ত্রিপুরসংহার ও পরশুরামের কথা
শল্যের সমান অশ্বতত্ত্বজ্ঞ কেউ নেই, তিনি আমার সারথি হ’লে ইন্দ্রাদি দেবগণও আমার সম্মুখীন হ’তে পারবেন না।
দুর্যোধন বললেন, কর্ণ, তুমি যা চাও তা সমস্তই হবে। তার পর দুর্যোধন শল্যের কাছে গিয়ে সবিনয়ে বললেন, মদ্ররাজ, কর্ণ আপনাকে সারথি রূপে বরণ করতে চান। আমি মস্তক অবনত ক’রে প্রার্থনা করছি, ব্রহ্মা যেমন সারথি হয়ে মহাদেবকে রক্ষা করেছিলেন, কৃষ্ণ যেমন সর্ব বিপদ থেকে অর্জুনকে রক্ষা করছেন, আপনিও সেইরূপ কর্ণকে রক্ষা করুন। পাণ্ডবরা ছল ক’রে মহাধনুর্ধর বৃদ্ধ ভীষ্ম ও দ্রোণকে হত্যা করেছে, আমাদের বহু যোদ্ধা যথাশক্তি যুদ্ধ ক’রে স্বর্গে গেছেন। পাণ্ডবরা বলবান স্থিরচিত্ত ও যথার্থবিক্রমশালী, আমাদের অবশিষ্ট সৈন্য যাতে তারা নষ্ট না করে আপনি তা করুন। আমাদের সেনার প্রধান বীরগণ নিহত হয়েছেন, কেবল আমার হিতৈষী মহাবল কর্ণ আছেন এবং সর্বলোকমহারথ আপনি আছেন। মহারাজ শল্য, জয়লাভ সম্বন্ধে কর্ণের উপর আমার বিপুল আশা আছে, কিন্তু আপনি ভিন্ন আর কেউ তাঁর সারথি হ’তে পারেন না। অতএব, কৃষ্ণ যেমন অর্জুনের, আপনি সেইরূপ কর্ণের সারথি হ’ন। অরুণের সঙ্গে সূর্য যেমন অন্ধকার বিনষ্ট করেন সেইরূপ আপনি কর্ণের সহিত মিলিত হয়ে অর্জুনকে বিনষ্ট করুন।
কুল ঐশ্বর্য শাস্ত্রজ্ঞান ও বলের জন্য শল্যের গর্ব ছিল। তিনি দুর্যোধনের কথায় ক্রুদ্ধ হয়ে ভ্রূকুটি ক’রে হাত নেড়ে বললেন, মহারাজ, এমন কর্মে তুমি আমাকে নিবৃত্ত করতে পার না, উচ্চ জাতি নীচ জাতির দাসত্ব করে না। আমি উচ্চবংশীয়, মিত্ররূপে তোমার কাছে এসেছি; তুমি যদি আমাকে কর্ণের বশবর্তী কর তবে নীচকে উচ্চ করা হবে। ক্ষত্রিয় কখনও সূতজাতির আজ্ঞাবহ হ’তে পারে না; আমি রাজর্ষিকুলজাত, মূর্ধাভিষিক্ত(১), মহারথ বলে খ্যাত, বন্দিগণ আমার স্তুতি করে। আমি সূতপুত্রের সারথ্য করতে পারি না। দুর্যোধন, তুমি আমার অপমান করছ, কর্ণকে আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করছ। কর্ণ আমার ষোল ভাগের এক ভাগও নয়। আমি সামান্য লোক নই, তোমার পক্ষে যোগ দিতে আমি স্বয়ং আসি নি, অপমানিত হয়ে আমি যুদ্ধ করতে পারি না। গান্ধারীর পুত্র, অনুমতি দাও আমি গৃহে ফিরে যাই। এই কথা ব’লে শল্য রাজাদের মধ্য থেকে উঠে গমনে উদ্যত হলেন।
তখন দুর্যোধন সসম্ভ্রমে শল্যকে ধরে সবিনয়ে মিষ্টবাক্যে বললেন, মদ্রেশ্বর শল্য, আপনি যা বললেন তা যথার্থ, কিন্তু আমার অভিপ্রায় শুনুন। কর্ণ বা অন্য কোনও রাজা আপনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ নন, কৃষ্ণও আপনার বিক্রম সইতে পারবেন না। আপনি যুদ্ধে শত্রুদের শল্যস্বরূপ, সেজন্যই আপনার নাম শল্য। রাধেয় কর্ণ বা আমি আপনার অপেক্ষা বীর্যবান নই, তথাপি আপনাকে যুদ্ধে সারথি রূপে বরণ করছি; কারণ, আমি কর্ণকে অর্জুন অপেক্ষা অধিক মনে করি এবং লোকে আপনাকে বাসুদেব অপেক্ষা অধিক মনে করে। কৃষ্ণ যেরূপ অশ্বহৃদয় জানেন, আপনি তার দ্বিগুণ জানেন।
শল্য বললেন, বীর দুর্যোধন, তুমি এই সৈন্যমধ্যে আমাকে দেবকীপুত্র কৃষ্ণের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলছ সেজন্য আমি প্রীত হয়েছি। যশস্বী কর্ণ যখন অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন তখন আমি তাঁর সারথ্য করব, কিন্তু এই নিয়ম থাকবে যে আমি তাঁকে যা ইচ্ছা হয় তাই বলব(১)।
দুর্যোধন ও কর্ণ শল্যের কথা মেনে নিয়ে বললেন, তাই হবে।