কর্ণপর্ব: ১১। কাক ও হংসের উপাখ্যান

শল্য বললেন, কর্ণ, তোমাকে মদ্যপের ন্যায় প্রমাদগ্রস্ত দেখছি, সৌহার্দের জন্য আমি তোমার চিকিৎসা করব। তোমার হিত বা অহিত যা আমি জানি তা অবশ্যই আমার বলা উচিত। একটি উপাখ্যান বলছি শোন। —

সমুদ্রতীরবর্তী কোনও দেশে এক ধনবান বৈশ্য ছিলেন, তাঁর বহু পুত্র ছিল। সেই পুত্রেরা তাদের ভুক্তাবশিষ্ট মাংসযুক্ত অন্ন দধি ক্ষীর প্রভৃতি এক কাককে খেতে দিত। উচ্ছিষ্টভোজী সেই কাক গর্বিত হয়ে অন্য পক্ষীদের অবজ্ঞা করত। একদিন গরুড়ের ন্যায় দ্রুতগামী এবং চক্রবাকের ন্যায় বিচিত্রদেহ কতকগুলি হংস বেগে উড়ে এসে সমুদ্রের তীরে নামল। বৈশ্যপুত্রেরা কাককে বললে, বিহঙ্গম তুমি ওই হংসদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তখন সেই উচ্ছিষ্টভোজী কাক সগর্বে হংসদের কাছে গিয়ে বললে, চল, আমরা উড়ব। হংসেরা বললে, আমরা মানস সরোবরে থাকি, ইচ্ছানুসারে সর্বত্র বিচরণ করি, বহুদূর যেতে পারি, সেজন্য পক্ষীদের মধ্যে আমরা বিখ্যাত। দুর্মতি, তুমি কাক হয়ে কি করে আমাদের সঙ্গে উড়বে।

কাক বললে, আমি এক শ এক প্রকার ওড়বার পদ্ধতি জানি এবং প্রত্যেক পদ্ধতিতে বিচিত্র গতিতে শত যোজন যেতে পারি। আজ আমি উড্ডীন অবডীন প্রডীন ডীন নিডীন সডীন তির্যগডীন পরিডীন প্রদ্যুতি বহুপ্রকার গতিতে উড়ব, তোমরা আমার শক্তি দেখতে পাবে। বল, এখন কোন্‌ গতিতে আমি উড়ব, তোমরাও আমার সঙ্গে উড়ে চল। একটি হংস হাস্য করে বললে, সকল পক্ষী যে গতিতে ওড়ে আমি সেই গতিতেই উড়ব, অন্য গতি জানি না। রক্তচক্ষু কাক, তোমার যেমন ইচ্ছা সেই গতিতে উড়ে চল।

হংস ও কাক পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে উড়তে লাগল, হংস একি গতি এবং কাক বহুপ্রকার গতি দেখাতে দেখাতে চলল। হংস নীরব রইল, দর্শকদের বিস্মিত করবার জন্য কাক নিজের গতির বর্ণনা করতে লাগল। অন্যান্য কাকেরা হংসদের নিন্দা করতে করতে একবার বৃক্ষের উপর উড়ে বসল, আবার নীচে নেমে এল। হংস মৃদু গতিতে উড়ে কিছুকাল কাকের পিছনে রইল, তার পর দর্শক কাকদের উপহাস শুনে বেগে সমুদ্রের উপর দিয়ে পশ্চিম দিকে উড়ে চলল। কাক শ্রান্ত ও ভীত হয়ে ভাবতে লাগল, কোথাও দ্বীপ বা বৃক্ষ নেই, আমি কোথায় নামব? হংস পিছনে ফিরে দেখলে, কাক জলে পড়ছে। তখন সে বললে, কাক, তুমি বহুপ্রকার গতির বর্ণনা করেছিলে, কিন্তু এই গুহ্য গতির কথা তো বল নি! তুমি পক্ষ ও চঞ্চু দিয়ে বার বার জলস্পর্শ করছ, এই গতির নাম কি?

পরিশ্রান্ত কাক জলে পড়তে পড়তে বললে, হংস, আমরা কাক রূপে সৃষ্ট হয়েছি, কা কা রব করে বিচরণ করি। প্রাণরক্ষার জন্য আমি তোমার শরণ নিলাম, আমাকে সমুদ্রের তীরে নিয়ে চল। প্রভু, আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার কর, যদি ভালয় ভালয় নিজের দেশে ফিরতে পারি তবে আর কাউকেও অবজ্ঞা করব না। কাকের এই বিলাপ শুনে হংস কিছু না বলে তাকে পা দিয়ে উঠিয়ে পিঠে তুলে নিলে এবং দ্রুতবেগে উড়ে তাকে সমুদ্রতীরে রেখে অভীষ্ট দেশে চলে গেল।

উপাখ্যান শেষ করে শল্য বললেন, কর্ণ, তুমি সেই উচ্ছিষ্টভোজী কাকের তুল্য; ধৃতরাষ্ট্রপুত্রদের গৃহে পালিত হয়ে তোমার সমান এবং তোমার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সকল লোককে তুমি অবজ্ঞা ক'রে থাক। কাক যেমন শেষকালে বুদ্ধি ক'রে হংসের শরণ নিয়েছিল তুমিও তেমন কৃষ্ণার্জ্জুনের শরণ নাও।

১২। কর্ণের শাপবৃত্তান্ত কৰ্ণ বললেন, কৃষ্ণ ও অর্জ্জুনের শক্তি আমি যথার্থরূপে জানি, তথাপি আমি নিৰ্ভয়ে তাঁদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। কিন্তু ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ পরশুরাম আমাকে যে শাপ দিয়েছিলেন তার জন্যই আমি উদ্বিগ্ন হয়ে আছি! পূৰ্ব্বে আমি দিব্যাস্ত্ৰ শিক্ষার জন্য ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে পরশুরামের নিকট বাস করতাম। একদিন গুরুদেব আমার উরুতে মস্তক রেখে নিদ্রা যাচ্ছিলেন সেই সময়ে অর্জ্জুনের হিতকামী দেবরাজ ইন্দ্র এক বিকট কীটের রূপ ধারণ ক'রে আমার উরু বিদীর্ণ করলেন। সেখান থেকে অত্যন্ত রক্তস্রাব হ'তে লাগল, কিন্তু গুরুর নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে আমি নিশ্চল হয়ে রইলাম। জাগরণের পর তিনি আমার সহিষ্ণুতা দেখে বললেন, তুমি ব্রাহ্মণ নও, সত্য বল তুমি কে। তখন আমি নিজের যথাৰ্থ পরিচয় দিলাম। পরশুরাম ক্রুদ্ধ হয়ে আমাকে এই শাপ দিলেন — সূত, তুমি কপট উপায়ে আমার কাছে যে অস্ত্র লাভ করেছ, কাৰ্য্যকালে তা তোমার স্মরণ হবে না, মৃত্যুকাল ভিন্ন অন্য সময়ে মনে পড়বে; কারণ, বেদমন্ত্রযুক্ত অস্ত্র অব্রাহ্মণের নিকট স্থায়ী হয় না।