কর্ণপর্ব: ২০। কর্ণবধ
অত্যন্ত আকর্ষণ করায় অর্জুনের গাণ্ডীবধনুর গুণ ছিন্ন হ’ল, সেই অবসরে কর্ণ এক শত ক্ষুদ্রক বাণে অর্জুনকে আচ্ছন্ন করলেন এবং কৃষ্ণকেও ষাটটি নারাচ দিয়ে বিদ্ধ করলেন। কৃষ্ণার্জুন পরাভূত হয়েছেন মনে ক’রে কৌরবসৈন্য করতধ্বনি ও সিংহনাদ করতে লাগল। গাণ্ডীবে নূতন গুণ পরিয়ে অর্জুন ক্ষণকালমধ্যে বাণে বাণে অন্ধকার ক’রে ফেললেন এবং কর্ণ শল্য ও সমস্ত কৌরব-যোদ্ধাকে বিদ্ধ ক’রে কর্ণের চক্ররক্ষক পাদরক্ষক অগ্ররক্ষক ও পৃষ্ঠরক্ষক যোদ্ধাদের বিনষ্ট করলেন। হতাবশিষ্ট কৌরববীরগণ কর্ণকে ফেলে পালাতে লাগলেন, দুর্যোধনের অনুরোধেও তাঁরা রইলেন না।
খাণ্ডবদাহের সময় অর্জুন যার মাতাকে বধ করেছিলেন সেই তক্ষকপুত্র অশ্বসেন (১) এতদিন পাতালে শুয়েছিল। রথ অশ্ব ও হস্তীর মর্দনে ভূতল কম্পিত হওয়ায় অশ্বসেন উঠে পড়ল এবং মাতৃবধের প্রতিশোধ নেবার জন্য শররূপ ধারণ ক’রে কর্ণের তুণে প্রবিষ্ট হ’ল। ইন্দ্র ও লোকপালগণ হাহাকার ক’রে উঠলেন। কর্ণ না জেনেই সেই শর তাঁর ধনুতে যোগ করলেন। শল্য বললেন, এই শরে অর্জুনের গ্রীবা ছিন্ন হবে না, তুমি এমন শর সন্ধান কর যাতে তাঁর শিরশ্ছেদ হয়। কর্ণ বললেন, আমি দুবার শরসন্ধান করি না, — এই ব’লে তিনি শর মোচন করলেন। সেই ভীমদর্শন অত্যুজ্জ্বল শর সশব্দে নির্গত হয়ে যেন সীমান্ত রচনা করে আকাশপথে জ্বলতে জ্বলতে যেতে লাগল। তখন কংসরিপু মাধব অবলীলাক্রমে তাঁর পায়ের চাপে অর্জুনের রথ মাটিতে এক হাত(২) বসিয়ে দিলেন, রথের চার অশ্ব জানু দ্বারা ভূমি স্পর্শ করলে। নাগবাণের আঘাতে অর্জুনের জগদ্বিখ্যাত স্বর্ণকিরীট দগ্ধ হয়ে মস্তক থেকে পড়ে গেল।
শররূপী মহানাগ অশ্বসেন পুনর্বার কর্ণের তুণে প্রবেশ করতে গেল। কর্ণের প্রশ্নের উত্তরে সে বললে, তুমি না দেখেই আমাকে মোচন করেছিলে সেজন্য অর্জুনের মস্তক হরণ করতে পারি নি; আবার লক্ষ্য ক’রে আমাকে নিক্ষেপ কর, তোমার আর আমার শত্রুকে বধ করব। অশ্বসেনের ইতিহাস শুনে কর্ণ বললেন, অন্যের শক্তি অবলম্বন ক’রে আমি জয়ী হ’তে চাই না; নাগ, যদি শত অর্জুনকেও বধ করা যায়, তথাপি এই শর আমি পুনর্বার প্রয়োগ করব না; অতএব তুমি প্রসন্ন হয়ে চ’লে যাও। তখন অশ্বসেন অর্জুনকে মারবার জন্য নিজেই ধাবিত হ’ল। কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, তুমি এই মহানাগকে বধ কর, খাণ্ডবদাহকালে তুমি এর শত্রুতা করেছিলে; ওই দেখ, আকাশচ্যুত প্রজ্জ্বলিত উল্কার ন্যায় তোমার দিকে আসছে। অর্জুন ছয় বাণের আঘাতে অশ্বসেনকে কেটে ভূপাতিত করলেন। তখন পুরুষোত্তম কৃষ্ণ স্বয়ং দুই হাতে টেনে অর্জুনের রথ ভূমি থেকে তুললেন।
অর্জুন শরাঘাতে কর্ণের মণিভূষিত স্বর্ণকিরীট, কুণ্ডল ও উজ্জ্বল বর্ম বহু খণ্ডে ছেদন করলেন এবং বর্মহীন কর্ণকে ক্ষতবিক্ষত করলেন। বায়ু-পিত্ত-কফ-জনিত জ্বরে আক্রান্ত রোগীর ন্যায় কর্ণ বেদনা ভোগ করতে লাগলেন। তার পর অর্জুন যমদণ্ডতুল্য লৌহময় বাণে তাঁর বক্ষস্থল বিদ্ধ করলেন। কর্ণের মুষ্টি শিথিল হ'ল, তিনি ধনুবাণ ত্যাগ করে অবশ হয়ে টলতে লাগলেন। সৎস্বভাব পুরুষশ্রেষ্ঠ অর্জুন সেই অবস্থায় কর্ণকে মারতে ইচ্ছা করলেন না। তখন কৃষ্ণ ব্যস্ত হয়ে বললেন, পাণ্ডুপুত্র, তুমি প্রমাদগ্রস্ত হচ্ছ কেন? বুদ্ধিমান লোকে দুর্বল বিপক্ষকে অবসর দেন না, বিপদগ্রস্ত শত্রুকে বধ ক'রে ধর্ম ও যশ লাভ করেন। তুমি ত্বরান্বিত হও, নতুবা কর্ণ সবল হয়ে আবার তোমাকে আক্রমণ করবেন। কৃষ্ণের উপদেশ অনুসারে অর্জুন শরাঘাতে কর্ণকে আচ্ছন্ন করলেন, কর্ণও প্রকৃতিস্থ হয়ে কৃষ্ণার্জুনকে শরবিদ্ধ করতে লাগলেন।
কর্ণের মৃত্যু আসন্ন হওয়ায় কাল অদৃশ্যভাবে তাঁকে ব্রাহ্মণের শাপের বিষয় জানিয়ে বললেন, ভূমি তোমার রথচক্র গ্রাস করছে। তখন কর্ণ পরশুরামপ্রদত্ত ব্রাহ্ম মহামন্ত্রের বিষয় ভুলে গেলেন, তাঁর রথও ভূমিতে মগ্ন হয়ে ঘুরতে লাগল। কর্ণ বিষণ্ণ হয়ে দুই হাত নেড়ে বললেন, ধর্মজ্ঞগণ সর্বদাই বলেন যে ধর্ম ধার্মিককে রক্ষা করেন। আমরা যথাযোগ্য ধর্মাচরণ করি, কিন্তু দেখছি ধর্ম ভক্তগণকে রক্ষা না ক'রে বিনাশই করেন। তার পর কর্ণ অনবরত শরবর্ষণ ক'রে অর্জুনের ধনুরগুণ বার বার ছেদন করতে লাগলেন। কৃষ্ণের উপদেশে অর্জুন এক ভয়ংকর লৌহময় দিব্যাস্ত্র মন্ত্র- পাঠ ক'রে তাঁর ধনুতে যোজনা করলেন। এই সময়ে কর্ণের রথচক্র আরও ভূপ্রবিষ্ট হ'ল। ক্রোধে অশ্রুপাত ক'রে কর্ণ বললেন, পাণ্ডুপুত্র, মুহূর্তকাল অপেক্ষা কর, দৈবক্রমে আমার রথের বাম চক্র ভূমিতে ব'সে গেছে। তুমি কাপুরুষের অভিসন্ধি ত্যাগ কর, সাধুস্বভাব বীরগণ যাচমান বা দুর্দশাপন্ন বিপক্ষের প্রতি অস্ত্রক্ষেপণ করেন না। তোমাকে বা বাসুদেবকে আমি ভয় করি না, তুমি মহাকুলবিবর্ধন ক্ষত্রিয়-পুত্র, ধর্মোপদেশ স্মরণ করে ক্ষণকাল ক্ষমা কর।
কৃষ্ণ বললেন, রাধেয়, অদৃষ্টের বশে এখন তুমি ধর্ম স্মরণ করছ। নীচ লোকে বিপদে পড়লে দৈবের নিন্দা করে, নিজের কুকর্মের নিন্দা করে না। তুমি যখন দুর্যোধন দুঃশাসন আর শকুিনর সঙ্গে মিলে একবস্ত্রা দ্রৌপদীকে দ্যূতসভায় আনিয়েছিলে তখন তোমার ধর্ম্ম স্মরণ হয় নি। যখন অক্ষনিপুণ শকুনি অনভিজ্ঞ যুধিষ্ঠিরকে জয় করেছিলেন তখন তোমার ধর্ম্ম কোথায় ছিল? যখন তোমার সম্মতিতে দুর্য্যোধন ভীমকে বিষযুক্ত খাদ্য দিয়েছিল, জতুগৃহে সুপ্ত পাণ্ডবদের যখন দগ্ধ করবার চেষ্টা করেছিল, দুঃশাসন কর্তৃক গৃহীতা রজস্বলা দ্রৌপদীকে যখন তুমি উপহাস করেছিলে, তখন তোমার ধর্ম্ম কোথায় ছিল? ত্রয়োদশ বর্ষ অতীত হ’লেও তোমরা যখন পাণ্ডবদের রাজ্য ফিরিয়ে দাও নি, বহু মহারথের সঙ্গে মিলে যখন বালক অভিমন্যুকে হত্যা করেছিলে, তখন তোমার ধর্ম্ম কোথায় ছিল? এই সব সময়ে যদি তোমার ধর্ম্ম না থাকে তবে এখন ধর্ম্ম ধর্ম্ম ক’রে গলা শধিয়ে লাভ কি? আজ তুমি যতই ধর্ম্মাচরণ কর তথাপি নিষ্কৃতি পাবে না।
বাসুদেবের কথা শুনে কর্ণ লজ্জায় অধোবদন হলেন, কোনও উত্তর দিলেন না। তিনি ক্রোধে ওষ্ঠ স্পন্দিত ক’রে ধনু তুলে নিয়ে অর্জুনকে মারবার জন্য একটি ভয়ঙ্কর বাণ যোজনা করলেন। মহাসর্প যেমন বল্মীকে প্রবেশ করে, কর্ণের বাণ সেইরূপ অর্জুনের বাহুমধ্যে প্রবেশ করলে। অর্জুনের মাথা ঘুরতে লাগল, দেহ কাঁপতে লাগল, হাত থেকে গাণ্ডীব পড়ে গেল। এই অবসরে কর্ণ রথ থেকে লাফিয়ে নেমে দুই হাত দিয়ে রথচক্র তোলবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। তখন অর্জুন সংজ্ঞালাভ করে ক্ষুরপ্র বাণ দিয়ে কর্ণের রত্নভূষিত ধ্বজ এবং তার উপরিস্থ উজ্জ্বল হস্তিরজ্জুলাঞ্ছন কেটে ফেললেন। তার পর তিনি তূণ থেকে বজ্র অগ্নি ও যমদণ্ডের ন্যায় করাল অঞ্জলিক বাণ তুলে নিয়ে বললেন, যদি আমি তপস্যা ও যজ্ঞ ক’রে থাকি, গুরুজনকে সন্তুষ্ট ক’রে থাকি, সুহৃদ্গণের বাক্য শুনে থাকি, তবে এই বাণ আমার শত্রুর প্রাণহরণ করুক।
অপরাহ্ণকালে অর্জুন সেই অঞ্জলিক বাণ দ্বারা কর্ণের মস্তক ছেদন করলেন। রক্তবর্ণ সূর্য্য যেমন অস্তাচল থেকে পতিত হন, সেইরূপ সেনাপতি কর্ণের উত্তমাঙ্গ ভূমিতে পতিত হ’ল। সকলে দেখলে, কর্ণের নিপতিত দেহ থেকে একটি তেজ আকাশে উঠে সূর্য্যমণ্ডলে প্রবেশ করলে। কৃষ্ণ অর্জুন ও অন্যান্য পাণ্ডবগণ হৃষ্ট হয়ে শঙ্খধ্বনি করলেন, পাণ্ডবপক্ষীয় সৈন্যগণ সিংহনাদ ও তূর্য্যধ্বনি করে বস্ত্র ও বাহু সঞ্চালন করতে লাগল। বীর কর্ণ শোণিতাক্তদেহে শরশয্য হয়ে ভূমিতে পড়ে আছেন দেখে মদ্ররাজ শল্য ধ্বজহীন রথ নিয়ে চলে গেলেন।