কর্ণপর্ব: ১৯। দুঃশাসনবধ — ভীমের প্রতিজ্ঞাপালন

(সপ্তদশ দিনের আরও যুদ্ধ)

কর্ণ পাঞ্চালগণের সহিত যুদ্ধ করছিলেন। তাঁর শরাঘাতে ধৃষ্টদ্যুম্নের এক পুত্র নিহত হ’লে কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, পার্থ, কর্ণ পাঞ্চালগণকে নিঃশেষ করছেন, তুমি সত্বর তাঁকে বধ কর। অর্জুন কিছুদূর অগ্রসর হ’লে মহাবীর ভীমসেন পুনর্বার তাঁর সঙ্গে মিলিত হলেন এবং পশ্চাতে থেকে অর্জুনের পৃষ্ঠরক্ষা করতে লাগলেন।

এই সময়ে দুঃশাসন নির্ভয়ে শরক্ষেপ করতে করতে ভীমের নিকটস্থ হলেন। হস্তিদ্বয় দেখলে দুই মদমত্ত হস্তীর যেমন সংঘর্ষ হয় সেইরূপ ভীম ও দুঃশাসন পরস্পরকে আক্রমণ করলেন। ভীমের শরাঘাতে দুঃশাসনের ধনু ও ধ্বজ ছিন্ন এবং সারথি নিহত হ’ল। তখন দুঃশাসন নিজেই রথ চালাতে লাগলেন এবং অন্য ধনু নিয়ে ভীমকে শরাহত করলেন। বাহু প্রসারিত ক’রে ভীম প্রাণশূন্যের ন্যায় রথের মধ্যে শুয়ে পড়লেন এবং কিছুক্ষণ পরে সংজ্ঞালাভ করে গর্জন ক’রে উঠলেন। দুঃশাসন ভীমসেনকে আবার শরাঘাতে নিপীড়িত করতে লাগলেন। ক্রোধে জ্ব’লে উঠে ভীম বললেন, দুরাত্মা, আজ যুদ্ধে তোমার রক্ত পান করব। দুঃশাসন মহাবেগে একটি শক্তি অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন, উগ্রমূর্ত্তি ভীমও তাঁর ভীষণ গদা ঘূর্ণিত করে প্রহার করলেন। গদার প্রহারে শক্তি ভগ্ন হ’ল, দুঃশাসন মস্তকে আহত হয়ে দশ ধনু (চল্লিশ হাত) দূরে নিক্ষিপ্ত হলেন, তাঁর অশ্ব ও রথও বিনষ্ট হ’ল।

দুঃশাসন বেদনায় ছটফট করতে লাগলেন। তখন ভীমসেন নিরপরাধা রজস্বলা পতিকর্তৃক অরক্ষিত দ্রৌপদীর কেশগ্রহণ বস্ত্রহরণ প্রভৃতি দুঃখ স্মরণ ক’রে ঘৃতসিক্ত হুতাশনের ন্যায় জ্বলে উঠলেন এবং কর্ণ দুর্যোধন কৃপ অশ্বত্থামা ও কৃতবর্ম্মাকে বললেন, ওহে যোদ্ধৃগণ, আজ আমি পাপী দুঃশাসনকে হত্যা করছি, পারেন তো একে রক্ষা করুন। এই ব’লে ভীম তাঁর রথ থেকে লাফিয়ে নামলেন। সিংহ যেমন মহাগজকে ধরে, বৃকোদর ভীম সেইরূপ কম্পমান দুঃশাসনকে আক্রমণ ক’রে গলায় পা দিয়ে চেপে ধরলেন, এবং তীক্ষ্ণ অসি দিয়ে তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ ক’রে ঈষদুষ্ণ রক্ত পান করলেন। তার পর ভূপতিত দুঃশাসনের শিরশ্ছেদ ক’রে রক্ত চাখতে চাখতে বললেন, মাতার স্তন্যদুগ্ধ, মধু, ঘৃত, উত্তম মাধবীক মদ্য, দিব্য জল এবং মথিত দুগ্ধ ও দধি প্রভৃতি অমৃততুল্য যত পানীয় আছে, সে সমস্তের চেয়ে এই শত্রুরক্ত অধিক সুস্বাদ মনে হচ্ছে। তার পর দুঃশাসনকে গতাসু দেখে উগ্রকর্ম্মা ক্রোধাবিষ্ট ভীমসেন হাস্য ক’রে বললেন, আর আমি কি করতে পারি, মৃত্যু তোমাকে রক্ষা করেছে।

রক্তপায়ী ভীমকে যারা দেখছিল তারা ভয়ে ব্যাকুল হয়ে ভূমিতে পড়ে গেল। তাদের হাত থেকে অস্ত্র খ’সে পড়ল, অস্ফুট আর্ত্তনাদ করতে করতে অর্ধনিমীলিতনেত্রে তারা ভীমকে দেখতে লাগল। এ মানুষ নয়, রাক্ষস — এই ব’লে সৈন্যগণ ভয়ে পালিয়ে গেল। কর্ণভাতা চিত্রসেনও পালাচ্ছিলেন, পাঞ্চালবীর যুধামন্যু তাঁকে শরাঘাতে বধ করলেন।

উপস্থিত বীরগণের সমক্ষে দুঃশাসনের রক্তে অঞ্জলি পূর্ণ ক’রে ভীম সগর্জনে বললেন, পুরুষাধম, এই আমি তোমার কণ্ঠরুধির পান করছি, এখন আবার আমাকে ‘গরু গরু’ বল দেখি! দ্যূতসভায় আমাদের পরাজয়ের পর যারা ‘গরু গরু’ বলে নৃত্য করেছিল, এখন প্রতিনৃত্য ক’রে তাদেরই আমরা ‘গরু গরু’ বলব। তার পর রক্তাস্যদেহে মুখ থেকে রক্ত ক্ষরণ করতে করতে ঈষৎ হাস্য ক’রে ভীমসেন কৃষ্ণার্জুনকে বললেন, আমি দুঃশাসন সম্বন্ধে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তা আজ পূর্ণ করলাম।