শল্যপর্ব: ১। কৃপ-দুর্য্যোধন-সংবাদ

১। কৃপ-দুর্যোধন-সংবাদ

কৌরবপক্ষের দুরবস্থা দেখে সৎস্বভাব তেজস্বী বৃদ্ধ কৃপাচার্য কৃপাবিষ্ট হয়ে দুর্যোধনকে বললেন, মহারাজ, ক্ষত্রিয়ের পক্ষে যুদ্ধধর্মই শ্রেষ্ঠ, পিতা পুত্র ভ্রাতা মাতুল ভাগিনেয় সম্বন্ধী ও বান্ধবের সঙ্গেও ক্ষত্রিয়কে যুদ্ধ করতে হয়। যুদ্ধে মৃত্যুই ক্ষত্রিয়ের পরমধর্ম এবং পলায়নই অধর্ম। কিন্তু ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ জয়দ্রথ, তোমার ভ্রাতারা, এবং তোমার পুত্র লক্ষণ, সকলেই গত হয়েছেন, আমরা কাকে আশ্রয় করব? সাধুস্বভাব পাণ্ডবদের প্রতি তোমরা অকারণে অসদ্ব্যবহার করেছ, তারই ফল এখন উপস্থিত হয়েছে। বৎস, যুদ্ধে সাহায্যের জন্য তুমি যেসকল যোদ্ধাকে আনিয়েছ তাঁদের এবং তোমার নিজেরও প্রাণসংশয় হয়েছে, এখন তুমি আত্মরক্ষা কর। বৃহস্পতির নীতি এই — বিপক্ষের চেয়ে ক্ষীণ হ’লে অথবা তার সমান হ’লে সন্ধি করবে, বলবান হ’লে যুদ্ধ করবে। আমরা এখন হীনবল, অতএব পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি করাই উচিত। ধৃতরাষ্ট্র ও কৃষ্ণ অনুরোধ করলে দয়ালু যুধিষ্ঠির নিশ্চয় তোমাকে রাজপদ দেবেন, ভীম অর্জুন প্রভৃতিও সম্মত হবেন।

শোকাতুর দুর্যোধন কিছুকাল চিন্তা ক'রে বললেন, সুহৃদের যা বলা উচিত আপনি তাই বলেছেন, প্রাণের মায়া ত্যাগ ক'রে আপনি পাণ্ডবদের সঙ্গে যুদ্ধও করেছেন। ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ, মুমূর্ষুর যেমন ঔষধে রুচি হয় না সেইরূপ আপনার যুক্তি- সম্মত হিতবাক্য আমার ভাল লাগছে না। আমরা যুধিষ্ঠিরকে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেছিলাম, তাঁর প্রেরিত দূত কৃষ্ণকেও প্রতারিত করেছিলাম; এখন তিনি আমার অনুরোধ শুনবেন কেন? আমরা অভিমন্যুকে বিনষ্ট করেছি, কৃষ্ণ ও অর্জুন আমাদের হিতাচরণ করবেন কেন? কোপনস্বভাব ভীম উগ্র প্রতিজ্ঞা করেছে, সে মরবে তবু নত হবে না। যমতুল্য নকুল-সহদেব অসি ও চর্ম ধারণ ক'রেই আছে; ধৃষ্টদ্যুম্ন ও শিখণ্ডীর সঙ্গেও আমার শত্রুতা আছে। দ্যূতসভায় সকলের সমক্ষে যিনি নির্যাতিত হয়েছিলেন সেই দ্রৌপদী আমার বিনাশ ও ভর্তৃগণের স্বার্থসিদ্ধির জন্য উগ্র তপস্যা করছেন, তিনি প্রত্যহ হোমস্থানে শয়ন করেন; কৃষ্ণভগিনী সুভদ্রা অভিমান ও দর্প ত্যাগ ক'রে সর্বদা দাসীর ন্যায় দ্রৌপদীর সেবা করেন। এইসকল কারণে এবং বিশেষত অভিমন্যুবধের ফলে যে বৈরানল প্রজ্বলিত হয়েছে তা নির্বাপিত হয় নি, অতএব কি ক'রে পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি হবে? সাগর্যাম্বরা পৃথিবীর রাজা হয়ে আমি কি ক'রে পাণ্ডবদের প্রসাদে রাজ্য ভোগ করব, দাসের ন্যায় যুধিষ্ঠিরের পিছনে যাব, আত্মীয়দের সঙ্গে দীনভাবে জীবিকানির্বাহ করব? এখন ক্লীবের ন্যায় আচরণের সময় নয়, আমাদের যুদ্ধ করাই উচিত। যে বীরগণ আমার জন্য নিহত হয়েছেন তাঁদের উপকার স্মরণ ক'রে এবং তাঁদের ঋণ শোধের বাসনায় আমার রাজ্যের প্রতিও আর রুচি নেই। পিতামহ ভ্রাতা ও বয়স্যগণকে নিপাতিত ক'রে যদি আমি নিজের জীবন রক্ষা করি তবে লোকে নিশ্চয় আমার নিন্দা করবে। আমি যুধিষ্ঠিরকে প্রণিপাত ক'রে রাজ্যলাভ করতে চাই না, বরং ন্যায়যুদ্ধে হত হয়ে স্বর্গলাভ করব।

দুর্যোধনের কথা শুনে ক্ষত্রিয়গণ প্রশংসা ক'রে সাধু সাধু বলতে লাগলেন এবং পরাজয়ের জন্য শোক না ক'রে যুদ্ধের নিমিত্ত ব্যগ্র হলেন। তার পর তাঁরা বাহনদের পরিচর্যা ক'রে হিমালয়ের নিকটবর্তী বৃক্ষহীন সমতল প্রদেশে গেলেন এবং অরুণবর্ণ সরস্বতী নদীতে স্নান ও তার জল পান করলেন। সেখানে কিছুকাল থেকে তাঁরা দুর্যোধন কর্তৃক উৎসাহিত হয়ে রাত্রিবাসের জন্য শিবিরে ফিরে এলেন।