শল্যপর্ব: ১৪। দুর্য্যোধনের ভর্ৎসনা
দুর্যোধনের পতনে পাণ্ডব পাঞ্চাল ও সঞ্জয় যোদ্ধারা হৃষ্ট হয়ে সিংহনাদ ক'রে উত্তরীয় নাড়তে লাগলেন। তাঁদের অনেকে ভীমকে বললেন, বীর, ভাগ্যবশে আপনি মত্ত হস্তীর ন্যায় পদ দ্বারা দুর্যোধনের মস্তক মর্দন করেছেন, সিংহ যেমন মহিষের রক্ত পান করে সেইরূপ আপনি দুঃশাসনের রক্ত পান করেছেন। এই দেখুন, দুর্যোধন পতিত হলেও আমাদের যে রোমহর্ষ হয়েছিল তা এখনও যায় নি। এইপ্রকার অশোভন উক্তি শুনে কৃষ্ণ বললেন, বিনষ্ট শত্রুকে উগ্রবাক্যে আঘাত করা উচিত নয়। এই নির্লজ্জ লোভী পাপী দুর্যোধন যখন সুহৃদ্গণের উপদেশ লঙ্ঘন করেছিল তখনই এর মৃত্যু হয়েছে। এই নরাধম এখন অক্ষম হয়ে কাষ্ঠের ন্যায় প'ড়ে আছে, একে বাক্য দ্বারা পীড়িত ক'রে কি হবে?
দুৰ্য্যোধন দুই হস্তে ভর দিয়ে উঠে বসলেন এবং প্ৰাণান্তকর যন্ত্ৰণা অগ্ৰাহ্য ক'রে ভ্ৰূকুটি ক'রে কৃষ্ণকে বললেন, কংসদাসের পুত্র, অন্যায় যুদ্ধে আমাকে নিপাতিত ক'রে তোমার লজ্জা হচ্ছে না? তুমিই ভীমকে উরুভঙ্গের প্রতিজ্ঞা মনে করিয়ে দিয়েছিলে, তুমি অর্জ্জুনকে যা বলেছিলে তা কি আমি জানি না? তোমারই কূট-নীতিতে আমাদের বহু সহস্র যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তুমিই শিখণ্ডীকে সম্মুখে রাখিয়ে অর্জ্জুনকে বাণে ভীষ্মকে নিপাতিত করেছ, অশ্বত্থামার মরণের মিথ্যা সংবাদ দিয়ে দ্ৰোণাচাৰ্য্যকে বধ করিয়েছ, কৰ্ণ যখন ভূমি থেকে রথচক্ৰ তুলছিলেন তখন তুমিই অর্জ্জুনকে দিয়ে তাঁকে হত্যা করেছ। আমাদের সঙ্গে ন্যায়যুদ্ধ করলে তোমরা কখনও জয়ী হ'তে না।
রূক্ষ উত্তর দিলেন, গান্ধারীর পুত্র, তুমি পাপের পথে গিয়েই আত্মীয়বান্ধব সহ হত হয়েছ। ভীষ্ম পাণ্ডবদের অনিষ্টকামনায় যুদ্ধ করছিলেন সেজন্যই শিখণ্ডী কৰ্ত্তৃক নিহত হয়েছেন। দ্ৰোণ স্বধৰ্ম্ম ত্যাগ ক'রে তোমার প্রীতির জন্য যুদ্ধ করছিলেন, তাই ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁকে বধ করেছেন। বহু ছিদ্র পেয়েও অর্জ্জুন কৰ্ণকে মারেন নি, বীরোচিত উপায়েই তাঁকে মেরেছেন। অর্জ্জুন নিন্দিত কাৰ্য্য করেন না, তাঁর দয়াতেই তুমি এবং ভীষ্ম দ্ৰোণ কৰ্ণ অশ্বত্থামা প্রভৃতি বিরাটনগরে নিহত হও নি। তুমি আমাদের যেসব অকাৰ্যের কথা বলেছ তা তোমার অপরাধের জন্যই আমরা করেছি। লোভের বশে এবং অতিরিক্ত শক্তিলাভের বাসনায় তুমি যেসব দুষ্কর্ম্ম করেছ এখন তারই ফল ভোগ কর।
দুৰ্য্যোধন বললেন, আমি যথাবিধি অধ্যয়ন দান ও সসাগরা পৃথিবী শাসন করেছি, শত্রুদের মস্তকে অধিষ্ঠান করেছি, ক্ষত্ৰিয়দের অভীষ্ট যশ লাভ করেছি, দেবগণের যোগ্য এবং নৃপগণের দুৰ্লভ রাজ্য ভোগ করেছি, শ্রেষ্ঠ ঐশ্বৰ্য্য লাভ করেছি; আমার তুল্য আর কে আছে? কৃষ্ণ, সুহৃৎ ও ভ্রাতাদের সঙ্গে আমি স্বৰ্গে যাব। তোমাদের সংকল্প পূৰ্ণ হ'ল না, তোমরা শোকসন্তপ্ত হয়ে জীবনধারণ কর।
দুৰ্য্যোধনের উপর আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হ'ল, অপ্সরা ও গন্ধৰ্ব্বগণ গীতবাদ্য করতে লাগল, সিদ্ধগণ সাধু সাধু বললেন। দুৰ্যোধনের এইপ্রকার সম্মান দেখে কৃষ্ণ ও পাণ্ডব প্রভৃতি লজ্জিত হলেন। বিষণ্ণ পাণ্ডবগণকে কৃষ্ণ বললেন, দুৰ্য্যোধন ও ভীষ্মাদি বীরগণকে আপনারা ন্যায়যুদ্ধে বধ করতে পারতেন না। আপনাদের হিতসাধনের জন্যই আমি কূট উপায়ে এঁদের নিধন ঘটিয়েছি। শত্রু বহু বা প্রবল হ'লে বিবিধ কূট উপায়ে তাদের বধ করতে হয়, দেবতারা এবং অনেক সৎপুরুষ এইরূপ করেছেন। আমরা কৃতকাৰ্য্য হয়েছি, এখন সায়াহ্নকালে বিশ্রাম করতে ইচ্ছা করি, আপনারাও সকলে বিশ্রাম করুন। তখন পাঞ্চালগণ হৃষ্ট হয়ে শঙ্খধ্বনি করলেন, কৃষ্ণও পাঞ্চজন্য বাজালেন।