শল্যপর্ব: ১৩। বলরামের ক্রোধ — যুধিষ্ঠিরাদির ক্ষোভ
বলরাম ক্রোধে ঊর্দ্ধবাহু হয়ে আর্ত্তকণ্ঠে বললেন, ধিক্ ধিক্ ভীম! ধর্ম্ম-যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়ে বৃকোদর নাভির নিম্নে গদাপ্রহার করেছে! এমন যুদ্ধ আমি দেখি নি, মূঢ় ভীম নিজের ইচ্ছাতেই এই শাস্ত্রবিরুদ্ধ যুদ্ধ করেছে। এই বলে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বলরাম তাঁর লাঙ্গল উদ্যত ক’রে ভীমের প্রতি ধাবিত হলেন। তখন কৃষ্ণ বিনয়ে অবনত হয়ে তাঁর স্থূল সুগোল বাহু দিয়ে বলরামকে জড়িয়ে ধরলেন। দিবাবসানে চন্দ্র ও সূর্য্য যেমন আকাশে শোভা পান, কৃষ্ণ ও শুক্ল দুই যাদবশ্রেষ্ঠ সেইরূপে শোভা পেলেন। কৃষ্ণ বললেন, নিজের উন্নতি, মিত্রের উন্নতি, মিত্রের মিত্রের উন্নতি; এবং শত্রুর অবনতি, তার মিত্রের অবনতি, তার মিত্রের মিত্রের অবনতি — এই ছয় প্রকারই নিজের উন্নতি। পাণ্ডবরা আমাদের স্বাভাবিক মিত্র, আমাদের পিতৃষ্বসার পুত্র, শত্রুরা এদের উপর অত্যন্ত পীড়ন করেছে। আপনি জানেন, প্রতিজ্ঞারক্ষাই ক্ষত্রিয়ের ধর্ম্ম। ভীম দ্যুতসভায় প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে যুদ্ধে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করবেন, মহর্ষি মৈত্রেয়ও দুর্যোধনকে এইরূপ অভিশাপ দিয়েছিলেন, কলিযুগও আরম্ভ হয়েছে। অতএব আমি ভীমসেনের দোষ দেখি না। পুরুষশ্রেষ্ঠ, পাণ্ডবদের বৃদ্ধিতেই আমাদের বৃদ্ধি, অতএব আপনি ক্রুদ্ধ হবেন না।
কৃষ্ণের মধ্যে ধর্ম্মের ছলনা শুনে বলরাম অপ্রসন্নমনে বললেন, গোবিন্দ, ভীম ধর্ম্মের পীড়ন করে সকলকেই ব্যাকুল করেছে। ন্যায়যোদ্ধা রাজা দুর্যোধনকে অন্যায়ভাবে বধ ক’রে ভীম কূটযোদ্ধা বলে খ্যাত হবে। সরলভাবে যুদ্ধ করার জন্য দুর্যোধন শাশ্বত স্বর্গ লাভ করবেন। ইনি রণযজ্ঞে নিজেকে আহুতি দিয়ে যজ্ঞান্ত- স্নানের যশ লাভ করেছেন। এই কথা ব'লে বলরাম তাঁর রথে উঠে দ্বারকার অভিমুখে যাত্রা করলেন। বলরাম চ'লে গেলে পাণ্ডব পাঞ্চাল ও যাদবগণ নিরানন্দ হয়ে রইলেন। যুধিষ্ঠির বিষণ্ণ হয়ে কৃষ্ণকে বললেন, বৃকোদর দুর্যোধনের মাথায় পা দিয়েছে তাতেও আমি প্রীত হই নি, কুলক্ষয়েও আমি হৃষ্ট হই নি। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা আমাদের উপর বহু অত্যাচার করেছে, সেই দারুণ দুঃখ ভীমের হৃদয়ে রয়েছে, এই চিন্তা ক'রে আমি ভীমের আচরণ উপেক্ষা করলাম। ভীমের কার্য ধর্মসঙ্গত বা ধর্মবিরুদ্ধ যাই হোক, তিনি অমার্জিতবুদ্ধি লোভী কামনার দাস দুর্যোধনকে বধ ক'রে অভীষ্টলাভ করুন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের কথা শুনে বাসুদেব সদঃখে বললেন, তাই হোক। তিনি ভীমকে প্রীত করবার ইচ্ছায় তাঁর সকল কার্যের অনুমোদন করলেন। অসন্তুষ্ট অর্জুন ভীমকে ভাল মন্দ কিছুই বললেন না। ভীম হৃষ্টচিত্তে প্রফুল্লনেত্রে কৃতাঞ্জলি হয়ে যুধিষ্ঠিরকে অভিবাদন ক'রে বললেন, মহারাজ, আজ পৃথিবী মঙ্গলময় ও নিষ্কণ্টক হল, আপনি রাজ্যশাসন ও স্বধর্ম পালন করুন। যুধিষ্ঠির বললেন, আমরা কৃষ্ণের মতে চ'লেই পৃথিবী জয় করেছি। দুর্ধর্ষ ভীম, ভাগ্যক্রমে তুমি মাতার নিকট এবং নিজের ক্রোধের নিকট ঋণমুক্ত হয়েছ, শত্রুনিপাত ক'রে জয়ী হয়েছ।