সৌপ্তিকপর্ব: ৬। রত্নশিরস্ক অস্ত্র

ভীম চলে গেলে কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ভরতশ্রেষ্ঠ, ভীমসেন আপনার সর্বাপেক্ষা প্রিয় ভ্রাতা, ইনি বিপদের অভিমুখে যাচ্ছেন, আপনি তাঁর সঙ্গে গেলেন না কেন? দ্রোণাচার্য তাঁর পুত্রকে যে ব্রহ্মশির অস্ত্র দান করেছেন তা পৃথিবী দগ্ধ করতে পারে। অর্জুনকেও দ্রোণ এই অস্ত্র (১) শিখিয়েছেন। তিনি পুত্রের চপল স্বভাব জানতেন সেজন্য অস্ত্রদানকালে বলেছিলেন, বৎস, তুমি যুদ্ধে অত্যন্ত বিপন্ন হ’লেও এই অস্ত্র প্রয়োগ করো না, বিশেষত মানুষের উপর। তার পর তিনি বলেছিলেন, তুমি কখনও সৎপথে থাকবে না। আপনারা বনবাসে চ’লে গেলে অশ্বত্থামা দ্বারকায় এসে আমাকে বলেন, কৃষ্ণ, আমার ব্ৰহ্মশির অস্ত্র নিয়ে তোমার সুদৰ্শন চক্ৰ আমাকে দাও। আমি উত্তর দিলাম, তোমার অস্ত্র আমি চাই না, তুমি আমার এই চক্ৰ ধনু শক্তি বা গদা যা ইচ্ছা হয় নিতে পার। অশ্বত্থামা সুদৰ্শন চক্ৰ নিতে গেলেন, কিন্তু দুই হাতে ধরেও তুলতে পারলেন না। তখন আমি তাঁকে বললাম, মূঢ় ব্রাহ্মণ, তুমি যা চেয়েছ তা অৰ্জ্জুন প্রদ্যুম্ন বলরাম প্রভৃতিও কখনও চান নি। তুমি কেন আমার চক্ৰ চাও? অশ্বত্থামা বললেন, কৃষ্ণ, এই চক্ৰ পেলে সসম্মানে তোমার সঙ্গেই যুদ্ধ করতাম এবং সকলের অজেয় হতাম। কিন্তু দেখছি তুমি ভিন্ন আর কেউ এই চক্ৰ ধারণ করতে পারে না। এই বলে অশ্বত্থামা চ'লে গেলেন। তিনি ক্রোধী দুরাত্মা চপল ও ক্রূর, তাঁর ব্ৰহ্মশির অস্ত্রও আছে; অতএব তাঁর হাত থেকে ভীমকে রক্ষা করতে হবে।

(১) বনপর্ব ১০-পরিচ্ছেদে আছে, অর্জুন মহাদেবের কাছে এই অস্ত্র পেয়েছিলেন।

তার পর কৃষ্ণ তাঁর গরুড়ধ্বজ রথে যুধিষ্ঠির ও অৰ্জ্জুনকে তুলে নিয়ে যাত্রা করলেন এবং ক্ষণকালমধ্যে ভীমকে দেখতে পেয়ে তাঁর পশ্চাতে গিয়ে গঙ্গাতীরে উপস্থিত হলেন। সেখানে তাঁরা দেখলেন, ক্রূরকৰ্ম্মা অশ্বত্থামা কুশের কৌপীন প'রে ঘৃতাক্তদেহে ধূলি মেখে ব্যাস ও অন্যান্য ঋষিগণের মধ্যে ব'সে আছেন। ভীম ধনুর্ব্বাণ নিয়ে অশ্বত্থামার প্রতি ধাবিত হলেন। কৃষ্ণাৰ্জ্জুন ও যুধিষ্ঠিরকে দেখে অশ্বত্থামা ভয় পেলেন; তিনি ব্ৰহ্মশির অস্ত্র প্রয়োগের ইচ্ছায় একটি ইষীকা (কাশ তৃণ) নিক্ষেপ ক'রে বললেন, পাণ্ডবরা বিনষ্ট হ'ক। তখন সেই ইষীকায় কালান্তক যমের ন্যায় অগ্নি উদ্ভূত হ'ল। কৃষ্ণ বললেন, অৰ্জ্জুন অৰ্জ্জুন, দ্রোণপ্রদত্ত দিব্যাস্ত্র এখনই নিক্ষেপ ক'রে অশ্বত্থামার অস্ত্র নিবারণ কর।

অৰ্জ্জুন বললেন, অশ্বত্থামার, আমাদের, এবং আর সকলের মঙ্গল হ'ক, অস্ত্র দ্বারা অস্ত্র নিবারিত হ'ক। এই বলে তিনি দেবতা ও গুরুজনদের উদ্দেশে নমস্কার ক'রে ব্ৰহ্মশির অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। তাঁর অস্ত্রও প্রলয়াগ্নির ন্যায় জ্বলে উঠল। তখন সৰ্ব্বভূতহিতৈষী নারদ ও ব্যাসদেব দুই অগ্নিরাশির মধ্যে দাঁড়িয়ে বললেন, বীরদ্বয়, পূৰ্ব্বে কোনও মহারথ এই অস্ত্র মানুষের উপর প্রয়োগ করেন নি; তোমরা এই মহাবিপজ্জনক কৰ্ম্ম কেন করলে?

অৰ্জ্জুন কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, অশ্বত্থামার অস্ত্র নিবারণের জন্যই আমি অস্ত্র প্রয়োগ করেছি; যাতে সকলের মঙ্গল হয় আপনারা তা করুন। এই বলে অৰ্জ্জুন তাঁর অস্ত্র প্ৰতিসংহার করলেন। তিনি পূৰ্ব্বে ব্ৰহ্মচৰ্য্য ও বিবিধ ব্রত পালন করেছিলেন সেজন্যই ব্ৰহ্মশির অস্ত্র প্ৰত্যাহার করতে পারলেন, কিন্তু অশ্বত্থামা তা পারলেন না। অশ্বত্থামা বিষণ্ণ হয়ে ব্যাসদেবকে বললেন, ভগবান, আমি ভীমসেনের ভয়ে এবং পাণ্ডবদের বধের নিমিত্ত এই অস্ত্র নিক্ষেপ করেছি, আমি ক্রোধের বশে পাপকার্য্য করেছি; কিন্তু এই অস্ত্র প্রতিসংহারের শক্তি আমার নেই। ব্যাসদেব বললেন, বৎস, অর্জ্জুন তোমাকে মারবার জন্য ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রয়োগ করেন নি, তোমার অস্ত্র নিবারণের জন্যই করেছিলেন। পাণ্ডবগণ ও তাঁদের রাজ্য সর্বদাই তোমার রক্ষণীয়, আত্মরক্ষা করাও তোমার কর্ত্তব্য। তোমার মস্তকের মণি পাণ্ডবদের দান কর, তা হ’লে তাঁরা তোমার প্রাণ দান করবেন।

অশ্বত্থামা বললেন, ভগবান, পাণ্ডব আর কৌরবদের যত রত্ন আছে সে সমস্তের চেয়ে আমার মণির মূল্য অধিক, ধারণ করলে সকল ভয় নিবারিত হয়। আপনার আজ্ঞা আমার অবশ্য পালনীয়, কিন্তু ব্রহ্মশির অস্ত্রের প্রত্যাহার আমার অসাধ্য, অতএব তা পাণ্ডবনারীদের গর্ভে নিক্ষেপ করব। ব্যাসদেব বললেন, তাই কর।

কৃষ্ণ বললেন, এক ব্রতপরায়ণ ব্রাহ্মণ অর্জ্জুনের পুত্রবধূ উত্তরাকে বলেছিলেন, কুরুবংশ ক্ষয় পেলে পরীক্ষিৎ নামে তোমার একটি পুত্র হবে। সেই সাধু ব্রাহ্মণের বাক্য সফল হবে। অশ্বত্থামা ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, কেশব, তুমি পক্ষপাত ক’রে যা বলছ তা সত্য হবে না, আমার বাক্যের অন্যথা হবে না। কৃষ্ণ বললেন, তোমার মহাস্ত্র অব্যর্থ হবে, উত্তরার গর্ভস্থ শিশুও মরবে, কিন্তু সে আবার জীবিত হয়ে দীর্ঘায়ু পাবে। অশ্বত্থামা, তুমি কাপরুষ, বহু পাপ করেছ, বালকবধের উদ্যত হয়েছ; অতএব পাপকর্ম্মের ফলভোগ কর। তুমি তিন সহস্র বৎসর জনহীন দেশে অসহায় ব্যাধিগ্রস্ত ও পূতিশোণিতগন্ধী হয়ে বিচরণ করবে। নরাধম, তোমার অস্ত্রাগ্নিতে উত্তরার পুত্র দগ্ধ হ’লে আমি তাকে জীবিত করব, সে কৃপাচার্য্যের নিকট অস্ত্রশিক্ষা ক’রে ষাট বৎসর কুরুরাজ্য পালন করবে।

অশ্বত্থামা ব্যাসদেবকে বললেন, ভগবান, পুরুষোত্তম কৃষ্ণের বাক্য সত্য হ’ক, আমি আপনার কাছেই থাকব। তার পর অশ্বত্থামা পাণ্ডবগণকে মণি দিয়ে বনগমন করলেন। কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরাদি ফিরে এলে ভীমসেন দ্রৌপদীকে বললেন, এই তোমার মণি নাও, তোমার পুত্রহন্তা পরাজিত হয়েছে, এখন শোক ত্যাগ কর। কৃষ্ণ যখন সন্ধিকামনায় হস্তিনাপুরে যাচ্ছিলেন তখন তুমি এই তীব্র বাক্য বলেছিলে — ‘গোবিন্দ, আমার পতি নেই পুত্র নেই ভ্রাতা নেই, তুমিও নেই!’ সেই কথা এখন স্মরণ কর। আমি পাপী দুৰ্য্যোধনকে বধ করেছি, দুঃশাসনের রক্ত পান করেছি; অশ্বত্থামাকেও জয় করেছি, কেবল ব্রাহ্মণ আর গুরুপুত্র ব’লে ছেড়ে দিয়েছি। তার যশ মণি এবং অস্ত্র নষ্ট হয়েছে, কেবল শরীর অবশিষ্ট আছে।

তার পর দ্রৌপদীর অনুরোধে যুধিষ্ঠির সেই মণি মস্তকে ধারণ ক'রে চন্দ্রভূষিত পর্বতের ন্যায় শোভান্বিত হলেন। পুত্রশোকার্তা দ্রৌপদীও গাত্রোত্থান করলেন।