সৌপ্তিকপর্ব: ৫। দ্রৌপদীর প্রায়োপবেশন

রাত্ৰি গত হ'লে ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথি যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়ে অশ্বত্থামার নৃশংস কৰ্ম্মের বৃত্তান্ত জানালে। পুত্ৰশোকে আকুল হয়ে যুধিষ্ঠির ভূপতিত হলেন, তাঁর ভ্রাতারা এবং সাত্যকি তাঁকে ধ'রে ওঠালেন। যুধিষ্ঠির বিলাপ ক'রে বললেন, লোকে পরাজিত হ'তে হ'তেও জয়লাভ করে, কিন্তু আমরা জয়ী হয়েও পরাজিত হয়েছি। যে রাজপুত্ৰেরা ভীষ্ম দ্ৰোণ ও কৰ্ণের হাতে মুক্তি পেয়েছিলেন তাঁরা আজ অসাবধানতার জন্য নিহত হলেন! ধনী বণিকেরা যেমন সমুদ্ৰ উত্তীৰ্ণ হয়ে সতর্কতার অভাবে ক্ষুদ্ৰ নদীতে নিমগ্ন হয়, ইন্দ্ৰতুল্য রাজপুত্ৰ ও পৌত্ৰগণ সেইরূপ অশ্বত্থামার হাতে নিহত হলেন। এ'রা স্বৰ্গে গেছেন, দ্ৰৌপদীর জন্যই শোক করছি, সেই সাধ্বী কি ক'রে এই মহাদুঃখ সহিবেন? নকুল, তুমি মন্দভাগ্যা দ্ৰৌপদীকে মাতৃগণের সহিত এখানে নিয়ে এস। তার পর যুধিষ্ঠির সুহৃদ্গণের সঙ্গে শিবিরে গিয়ে দেখলেন, তাঁদের পুত্ৰ পৌত্ৰ ও সখারা ছিন্নদেহে রক্তাক্ত হয়ে প’ড়ে আছেন। তিনি শোকে আকুল হয়ে অচেতনপ্ৰায় হলেন, সুহৃদ্গণ তাঁকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন।

নকুল উপপ্লব্য নগর থেকে দ্রৌপদীকে নিয়ে এলেন। দ্রৌপদী বাতাহত কদলীতরুর ন্যায় কাঁপতে কাঁপতে ভূমিতে পড়ে গেলেন, ভীমসেন তাঁকে ধরে উঠিয়ে সান্ত্বনা দিলেন। দ্রৌপদী সরোদনে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, রাজা, তুমি ক্ষত্রধর্ম অনুসারে পাণ্ডবদের যমকে দান করেছ, এখন রাজ্য ভোগ কর। ভাগ্যক্রমে তুমি সমগ্র পৃথিবী লাভ করেছ, এখন আর মত্তমাতঙ্গগামী বীর অভিমন্যুকে তোমার স্মরণ হবে না। আজ যদি তুমি পাপী দ্রোণপুত্রকে যুদ্ধে বধ না কর তবে আমি এখানেই প্রায়োপবেশনে প্রাণত্যাগ করব। পাণ্ডবগণ, তোমরা আমার এই প্রতিজ্ঞা জেনে রাখ। এই বলে দ্রৌপদী প্রায়োপবেশন আরম্ভ করলেন।

যুধিষ্ঠির বললেন, কল্যাণী, তোমার পুত্র ও ভ্রাতারা ক্ষত্রধর্ম্মানুসারে নিহত হয়েছেন, তাঁদের জন্য শোক ক’রো না। দ্রোণপুত্র দুর্গম বনে চ’লে গেছেন, যুদ্ধে তাঁর নিপাত তুমি কি ক’রে দেখতে পাবে? দ্রৌপদী বললেন, রাজা, শুনেছি অশ্বত্থামার মস্তকে একটি সহজাত মণি আছে। তুমি সেই পাপীকে বধ ক’রে তার মণি মস্তকে ধারণ ক’রে নিয়ে এস, তবেই আমি জীবনত্যাগে বিরত হব। তার পর দ্রৌপদী ভীমসেনকে বললেন, তুমি ক্ষত্রিয়ধর্ম স্মরণ ক’রে আমাকে ত্রাণ কর। তুমি জতুগৃহ থেকে ভ্রাতাদের উদ্ধার করেছিলে, হিড়িম্ব রাক্ষসকে বধ করেছিলে, কীচকের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করেছিলে, এখন দ্রোণপুত্রকে বধ ক’রে সুখী হও।

মহাবল ভীমসেন তখনই ধনুর্ব্বাণ নিয়ে রথারোহণে যাত্রা করলেন, নকুল তাঁর সারথি হলেন।