শান্তিপর্ব: ২। যুধিষ্ঠিরের মনস্তাপ
শোকসন্তপ্ত যুধিষ্ঠির অর্জুনকে বললেন, ক্ষত্রিয়াচার পৌরুষ ও ক্রোধকে ধিক, যার ফলে আমাদের এই বিপদ হয়েছে। আমাদের জয় হয় নি, দুর্যোধনেরও জয় হয় নি; তাঁকে বধ ক'রে আমাদের ক্রোধ দূর হয়েছে, কিন্তু আমি শোকে বিদীর্ণ হচ্ছি। ধনঞ্জয়, আমার রাজ্যে প্রয়োজন নেই, তুমিই রাজ্যশাসন কর; আমি নির্দ্বন্দ্ব নির্মম হয়ে তত্ত্বজ্ঞান লাভের জন্য বনে যাব, চীর ও জটা ধারণ ক'রে তপস্যা করব, ভিক্ষান্নে জীবিকানির্বাহ করব। বহু কাল পরে আমার প্রজ্ঞার উদয় হয়েছে, এখন আমি অব্যয় শাশ্বত স্থান লাভ করতে ইচ্ছা করি।
অর্জুন অসহিষ্ণু হয়ে ঈষৎ হাস্য ক'রে বললেন, আপনি অমানুষিক কর্ম সম্পন্ন ক'রে এখন শ্রেষ্ঠ সম্পদ ত্যাগ করতে চান! যে ক্লীব বা দীর্ঘসূত্রী তার রাজভোগ কি ক'রে হবে? আপনি রাজকুলে জন্মেছেন, সমগ্র বসুন্ধরা জয় করেছেন, এখন মূঢ়তার বশে ধর্ম ও অর্থ ত্যাগ ক'রে বনে যেতে চাচ্ছেন! মহারাজ, অর্থ থেকেই ধর্ম কাম ও স্বর্গ হয়, অর্থ না থাকলে লোকের প্রাণযাত্রা অসম্ভব হয়। দেবগণও তাঁদের জ্ঞাতি অসুরগণকে বধ ক'রে সমৃদ্ধি লাভ করেছিলেন। রাজা যদি অন্যের ধন হরণ না করেন তবে কি ক'রে ধর্মকার্য করবেন? এখন সর্বদক্ষিণা-যুক্ত যজ্ঞ করাই আপনার কর্তব্য, নতুবা আপনার পাপ হবে। মহারাজ, আপনি কুপথে যাবেন না।
ভীম বললেন, মহারাজ, আপনি মন্দবুদ্ধি বেদপাঠক ব্রাহ্মণের ন্যায় কথা বলছেন। আপনি আলস্যে দিনযাপন করতে চান তাই রাজধর্মকে অবজ্ঞা করছেন। আপনার এমন বুদ্ধি হবে জানলে আমরা যুদ্ধ করতাম না। আমাদেরই দোষ, বলশালী কৃতবিদ্য ও মনস্বী হয়েও আমরা একজন ক্লীবের বশে চলছি। বনে গিয়ে মৌনব্রত ও কপট ধর্ম অবলম্বন করলে আপনার মৃত্যুই হবে, জীবিকানির্বাহ হবে না।
নকুল-সহদেবও যুধিষ্ঠিরকে নানা প্রকারে বোঝাবার চেষ্টা করলেন। তার পর দ্রৌপদী বললেন, মহারাজ, তোমার ভ্রাতারা চাতক পক্ষীর ন্যায় শুষ্ককণ্ঠে অনেক কথা বললেন, কিন্তু তুমি উত্তর দিয়ে এঁদের আনন্দিত করছ না। এঁরা দেবতুল্য, এ'দের প্রত্যেকেই আমাকে সুখী করতে পারেন। পঞ্চেন্দ্রিয় যেমন মিলিত হয়ে শরীরের ক্রিয়া সম্পাদন করে সেইরূপ আমার পঞ্চ পতি কি আমাকে সুখী করতে পারেন না? ধর্মরাজ, তুমি উন্মত্ত হয়েছ, তোমার ভ্রাতারাও যদি উন্মত্ত না হতেন তবে তোমাকে বেঁধে রেখে রাজশাসন করতেন। নৃপশ্রেষ্ঠ, ব্যাকুল হয়ো না, পৃথিবী শাসন কর, ধর্মানুসারে প্রজাপালন কর।
অর্জুন পুনর্বার বললেন, মহারাজ, রাজদণ্ডই প্রজা শাসন করে, ধর্ম অর্থ কাম এই ত্রিবর্গকে দণ্ডই রক্ষা করে। রাজার শাসন না থাকলে লোক বিনষ্ট হয়। ধর্মতঃ বা অধর্মতঃ যে উপায়েই হ'ক আপনি এই রাজ্য লাভ করেছেন, এখন শোক ত্যাগ ক'রে ভোগ করুন, যজ্ঞ ও দান করুন, প্রজাপালন ও শত্রুনাশ করুন।
ভীম বললেন, আপনি সর্বশাস্ত্রজ্ঞ নরপতি, কাপুরুষের ন্যায় মোহগ্রস্ত হচ্ছেন কেন? আপনি শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছেন, এখন নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করুন। পিতৃপিতামহের অনুসরণ ক'রে রাজ্যশাসন ও অশ্বমেধ যজ্ঞ করুন, আমরা এবং বাসুদেব আপনার কিংকর রয়েছি।
যুধিষ্ঠির বললেন, ভীম, অজ্ঞ লোকে নিজের উদরের জন্যই প্রাণিহিংসা করে, অতএব সেই উদরকে জয় কর, অল্পাহারে উদরাগ্নি প্রশমিত কর। রাজারা কিছুতেই সন্তুষ্ট হন না, কিন্তু সন্ন্যাসী অল্পে তুষ্ট হন। অর্জুন, দুইপ্রকার বেদবচন আছে — কর্ম কর, কর্ম ত্যাগ কর। তুমি যুদ্ধশাস্ত্রই জান, ধর্মের সূক্ষ্ম তত্ত্বে প্রবেশ করতে পারবে না। মোক্ষার্থিগণ সন্ন্যাস দ্বারাই পরমগতি লাভ করেন।
মহাতপা মহর্ষি দেবলস্থান ও ব্যাসদেব বহু উপদেশ দিলেন, কিন্তু যুধিষ্ঠিরের মন শান্ত হ'ল না। তিনি বললেন, বাল্যকালে যাঁর ক্রোড়ে আমি খেলা করেছি সেই ভীষ্ম আমার জন্য নিপাতিত হয়েছেন, আমার মিথ্যা কথার ফলে আচার্য দ্রোণ বিনষ্ট হয়েছেন, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কর্ণকেও আমি নিহত করিয়েছি, আমার রাজলোভের জন্যই বালক অভিমন্যু প্রাণ দিয়েছে, দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র বিনষ্ট হয়েছে। আমি পৃথিবীনাশক পাপী, আমি ভোজন করব না, পান করব না, প্রায়োপবেশনে শরীর শুষ্ক করব। তপোধনগণ, আপনারা অনুমতি দিন, আমি এই কলেবর ত্যাগ করব।
অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন, মাধব, ধর্মপুত্র শোকসাগরে মগ্ন হয়েছেন, তুমি এঁকে আশ্বাস দাও। যুধিষ্ঠিরের চন্দনচর্চিত পাষাণতুল্য বাহু ধারণ ক'রে কৃষ্ণ বললেন, পুরুষশ্রেষ্ঠ, শোক সংবরণ করুন, যাঁরা যুদ্ধে মরেছেন তাঁদের আর ফিরে পাবেন না। সেই বীরগণ অস্ত্রপ্রহারে পূত হয়ে স্বর্গে গেছেন, তাঁদের জন্য শোক করা উচিত নয়। ব্যাসদেব বললেন, যুধিষ্ঠির, তুমি ক্ষত্রিয়ধর্ম অনুসারেই ক্ষত্রিয়দের বিনষ্ট করেছ। যে লোক জেনে শুনে পাপকর্ম করে এবং তার পর নির্লজ্জ থাকে তাকেই পূর্ণ পাপী বলা হয়; এমন পাপের প্রায়শ্চিত্ত নেই। কিন্তু তুমি শুদ্ধস্বভাব, যা করেছ তা দুর্য্যোধনাদির দোষে অনিচ্ছায় করেছ এবং অনুতপ্তও হয়েছ। এরূপ পাপের প্রায়শ্চিত্ত মহাযজ্ঞ অশ্বমেধ; তুমি সেই যজ্ঞ করে পাপমুক্ত হও।
তার পর ব্যাসদেব নানাপ্রকার পাপকর্ম এবং সে সকলের উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত বিবৃত করলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, ভগবান, আমি রাজধর্ম, চতুর্বর্গের ধর্ম, আপৎকালোচিত ধর্ম প্রভৃতি সবিস্তারে শুনতে ইচ্ছা করি। ব্যাস বললেন, তুমি যদি সর্বপ্রকার ধর্ম জানতে চাও তবে কুরুপিতামহ ভীষ্মের কাছে যাও, তিনি তোমার সমস্ত সংশয় ছেদন করবেন। যুধিষ্ঠির বললেন, আমি জ্ঞাতিসংহার করেছি, ছল ক’রে ভীষ্মকে নিপাতিত করেছি, এখন কোন্ মুখে তাঁর কাছে গিয়ে ধর্মজিজ্ঞাসা করব?
কৃষ্ণ বললেন, নৃপশ্রেষ্ঠ, ভগবান ব্যাস যা বললেন তাই আপনি করুন। গ্রীষ্মকালের অন্তে লোকে যেমন মেঘের উপাসনা করে সেইরূপ আপনার প্রজারা, হতাবশিষ্ট রাজারা এবং কুরুজাঙ্গলবাসী ব্রাহ্মণাদি চতুর্বর্ণের প্রজারা প্রার্থী রূপে আপনার কাছে সমবেত হয়েছেন। আপনি আমাদের সকলের প্রীতির নিমিত্ত লোকহিতে নিরত হ’ন।
কৃষ্ণ, ব্যাস, দেবস্থান, ভ্রাতৃগণ, এবং অন্যান্য বহু লোকের অনুনয় শুনে মহাযশা যুধিষ্ঠিরের মনস্তাপ দূর হ’ল, তিনি শান্তিলাভ ক’রে নিজের কর্তব্যে অবহিত হলেন। তার পর ধৃতরাষ্ট্রকে পুরোবর্তী ক’রে এবং সুহৃদ্গণে পরিবেষ্টিত হয়ে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সমারোহ সহকারে হস্তিনাপুরে প্রবেশ করলেন।