শান্তিপর্ব: ৩। চার্ব্বাকবধ — যুধিষ্ঠিরের অভিষেক

রাজভবনে প্রবেশ ক’রে যুধিষ্ঠির দেবতা ও সমবেত ব্রাহ্মণগণের যথাবিধি অর্চনা করলেন। দুর্যোধনের সখা চার্বাক রাক্ষস ভিক্ষুর ছদ্মবেশে শিখা দণ্ড ও জপমালা ধারণ ক’রে সেখানে উপস্থিত ছিল। ব্রাহ্মণদের অনুমতি না নিয়েই সে যুধিষ্ঠিরকে বললে, কুন্তীপুত্র, এই দ্বিজগণ আমার মুখে তোমাকে বলছেন — তুমি জ্ঞাতিহন্তা নৃপতি, তোমাকে ধিক্‌। জ্ঞাতি ও গুরুজনদের হত্যা ক’রে তোমার রাজ্যে কি প্রয়োজন? মৃত্যুই তোমার পক্ষে শ্রেয়। যুধিষ্ঠির ব্যাকুল হয়ে বললেন, বিপ্রগণ, আমি প্রণত হয়ে বলছি, আপনারা প্রসন্ন হ’ন; আমার মরণ আসন্ন, আপনারা ধিক্কার দেবেন না।

ব্রাহ্মণগণ জ্ঞানচক্ষু দ্বারা চার্বাককে চিনতে পেরে বললেন, ধর্মরাজ, এ দুর্যোধনসখা চার্বাক রাক্ষস। আমরা আপনার নিন্দা করি নি, আপনার ভয় দূর হ’ক। তার পর সেই ব্রহ্মবাদী বিপ্রগণ ক্রোধে অধীর হয়ে হুঙ্কার করলেন, চার্বাক দগ্ধ হয়ে ভূপতিত হ’ল।

কৃষ্ণ বললেন, মহারাজ, পুরাকালে সত্যযুগে এই চার্বাক রাক্ষস বদ্রিকাশ্রমে তপস্যা ক’রে ব্রহ্মার নিকট অভয়বর লাভ করেছিল। বর পেয়ে পাপী রাক্ষস দেবগণের উপর উৎপীড়ন করতে লাগল। দেবগণ শরণাপন্ন হ’লে ব্রহ্মা বললেন, ভবিষ্যতে এই রাক্ষস দুর্যোধন নামক এক রাজার সভা হবে এবং ব্রাহ্মণগণের অপমান করবে; তখন বিপ্রগণ রুষ্ট হয়ে পাপী চার্বাককে দগ্ধ করবেন। ভরত-শ্রেষ্ঠ, সেই পাপী চার্বাকই এখন ব্রহ্মতেজে বিনষ্ট হয়েছে। আপনার জ্ঞাতি ক্ষত্রিয়বীরগণ নিহত হয়ে স্বর্গে গেছেন, আপনি শোক ও গ্লানি থেকে মুক্ত হয়ে এখন কর্তব্য পালন করুন।

তার পর যুধিষ্ঠির হৃষ্টচিত্তে স্বর্ণময় পীঠে পূর্বমুখ হয়ে বসলেন। কৃষ্ণ ও সাত্যকি তাঁর সম্মুখে এবং ভীম ও অর্জুন দুই পার্শ্বে উপবিষ্ট হলেন। নকুল-সহদেবের সহিত কুন্তী এক স্বর্ণভূষিত গজদন্তের আসনে বসলেন। গান্ধারী যুযুৎসু ও সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রের নিকটে আসন গ্রহণ করলেন। প্রজাবর্গ নানাপ্রকার মাঙ্গলিক দ্রব্য নিয়ে ধর্মরাজকে দর্শন করতে এল। কৃণের অনুমতিক্রমে পুরোহিত ধৌম্য একটি বেদীর উপর ব্যাঘ্রচর্মাবৃত সর্বতোভদ্র নামক আসনে মহাত্মা যুধিষ্ঠির ও দ্রুপদনন্দনী কৃষ্ণাকে বসিয়ে যথাবিধি হোম করলেন। কৃষ্ণ পাঞ্চজন্য শঙ্খ থেকে জল ঢেলে যুধিষ্ঠিরকে অভিষিক্ত করলেন, প্রজাবৃন্দসহ ধৃতরাষ্ট্রও জলসেক করলেন। পণব আনক ও দুন্দুভি বাজতে লাগল। যুধিষ্ঠির ব্রাহ্মণদের প্রচুর দক্ষিণা দিলেন, তাঁরা আনন্দিত হয়ে স্বস্তি ও জয় উচ্চারণ ক’রে রাজার প্রশংসা করতে লাগলেন।

যুধিষ্ঠির বললেন, আমরা ধন্য, কারণ, সত্য বা মিথ্যা যাই হ’ক, ব্রাহ্মণ-শ্রেষ্ঠগণ পাণ্ডবদের গুণকীর্তন করছেন। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আমাদের পিতা এবং পরমদেবতা, আমি এ’র সেবা করব সেজন্য জ্ঞাতিহত্যার পরেও প্রাণধারণ ক’রে আছি। সুহৃদ্গণ, যদি আমার উপর তোমাদের অনুগ্রহ থাকে তবে তোমরা ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি পূর্ব্বের ন্যায় ব্যবহার করবে। ইনি তোমাদের ও আমার অধিপতি, সমস্ত পৃথিবী ও পাণ্ডবগণ এঁরই অধীন। আমার এই কথা তোমরা মনে রেখো।

পুরবাসী ও জনপদবাসীদের বিদায় দিয়ে যুধিষ্ঠির ভীমসেনকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। তিনি বিদুরকে মন্ত্রণা ও সন্ধিবিগ্রহাদির ভার, সঞ্জয়কে কর্ত্তব্যা-অকর্ত্তব্য ও আয়ব্যয় নিরূপণের ভার, নকুলকে সৈন্যগণের তত্ত্বাবধানের ভার, অর্জ্জুনকে শত্রুরাজ্যের অবরোধ ও দস্যুদমনের ভার, এবং পুরোহিত ধৌম্যকে দেবতাতীব্রাহ্মণাদির সেবার ভার দিলেন। যুধিষ্ঠিরের আদেশে সহদেব সর্ব্বদা নিকটে থেকে তাঁকে রক্ষা করতে লাগলেন। অন্যান্য কর্ম্মে উপযুক্ত লোক নিযুক্ত ক’রে ধর্ম্মরাজ বিদুর সঞ্জয় ও যয়ূৎসুকে বললেন, আমার পিতা রাজা ধৃতরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সকল কার্য্যে আপনারা অবহিত থাকবেন এবং পুরবাসী ও জনপদবাসীর কার্য্যও তাঁর অনুমতি নিয়ে করবেন।

যুধিষ্ঠির নিহত যোদ্ধাদের ঔর্দ্ধদেহিক সকল কর্ম্ম সম্পাদন ক’রে ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারী প্রভৃতি এবং পতিপুত্রহীনা নারীগণকে সসম্মানে পালন করতে লাগলেন। তিনি দরিদ্র অন্ধ প্রভৃতির ভরণপোষণের যথোচিত ব্যবস্থা করলেন এবং শত্রু জয়ের পর অপ্রতিবন্ধী হয়ে সুখে কালযাপন করতে লাগলেন।

ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতি নিয়ে যুধিষ্ঠির ভীমকে দুর্য্যোধনের ভবন, অর্জ্জুনকে দুঃশাসনের ভবন, নকুলকে দুর্ম্মর্ষণের ভবন এবং সহদেবকে দুর্ম্মুখের ভবন দান করলেন। তিনি পুরোহিত ধৌম্য ও সহস্র স্নাতক ব্রাহ্মণকে বহু ধন দিলেন, ভৃত্য আশ্রিত অতিথি প্রভৃতিকে অভীষ্ট বস্তু দিয়ে তৃপ্ত করলেন, কৃপাচার্য্যের জন্য গুরুর উপযুক্ত বৃত্তির ব্যবস্থা করলেন, এবং বিদুর ও যয়ূৎসুকেও সম্মানিত করলেন।