শান্তিপর্ব: ৪। ভীষ্ম-সকাশে কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরাদি

একদিন যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের গৃহে গিয়ে দেখলেন, তিনি পীত কৌষেয় বস্ত্র প’রে দিব্যাভরণে ভূষিত হয়ে বক্ষে কৌস্তুভ মণি ধারণ করে একটি বৃহৎ পর্য্যঙ্কে আসীন রয়েছেন। ধর্ম্মরাজ কৃতাঞ্জলি হয়ে সম্ভাষণ করলেন, কিন্তু কৃষ্ণ উত্তর দিলেন না, ধ্যানস্থ হয়ে রইলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, কি আশ্চর্য্য, অমিতবিক্রম মাধব, তুমি ধ্যান করছ! ত্রিলোকের মঙ্গল তো? ভগবান, তুমি নিবাতনিষ্কম্প দীপ এবং পাষাণের ন্যায় নিশ্চল হয়ে আছ। যদি গোপনীয় না হয় এবং আমি যদি শোনবার যোগ্য হই তবে তোমার এই ধ্যানের কারণ আমাকে বল।

ঈষৎ হাস্য ক'রে কৃষ্ণ উত্তর দিলেন, শরশয্যাশায়ী ভীষ্ম আমাকে ধ্যান করছেন সেজন্য আমার মন তাঁর দিকে গিয়েছিল। এই পুরুষশ্রেষ্ঠ স্বর্গে গেলে পৃথিবী চন্দ্রহীন রাত্রির তুল্য হবে। আপনি তাঁর কাছে গিয়ে আপনার যা জানবার আছে জিজ্ঞাসা করুন। যুধিষ্ঠির বললেন, মাধব, তোমাকে অগ্রবর্তী ক'রে আমরা ভীষ্মের কাছে যাব। কৃষ্ণ সাত্যকিকে আদেশ দিলেন, আমার রথ সজ্জিত করতে বল।

এই সময়ে দক্ষিণায়ন শেষ হয়ে উত্তরায়ণ আরম্ভ হয়েছিল। ভীষ্ম একাগ্রচিত্তে তাঁর আত্মাকে পরমাত্মায় সমাবিষ্ট ক'রে কৃষ্ণের ধ্যান করতে লাগলেন। ব্যাস নারদ অসিত বশিষ্ঠ বিশ্বামিত্র বৃহস্পতি শুক্র কপিল বাল্মীকি ভার্গব কশ্যপ প্রভৃতি ভীষ্মকে বেষ্টন ক'রে রইলেন।

কৃষ্ণ, সাত্যকি, যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভ্রাতারা, কৃপাচার্য, যুযুৎসু এবং সঞ্জয় রথারোহণে কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন। তাঁরা দেখলেন, ওঘবতী নদীর তীরে পবিত্র স্থানে ভীষ্ম শরশয্যায় শুয়ে আছেন, মুনিগণ তাঁর উপাসনা করছেন। ব্যাসাদি মহর্ষিগণকে অভিবাদন করে কৃষ্ণ কিঞ্চিৎ কাতর হয়ে ভীষ্মকে তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সম্বন্ধে প্রশ্ন করলেন। তার পর কৃষ্ণ বললেন, পুরুষশ্রেষ্ঠ, আপনি যখন সমৃদ্ধদেহে সমৃদ্ধ রাজ্যে বাস করতেন তখন সহস্র নারীতে পরিবৃত হ'লেও আপনাকে ঊর্ধরেতা দেখেছি। আপনি ভিন্ন অপর কেউ মৃত্যুকে রোধ ক'রে শরশয্যায় শুয়ে থাকতে পারে এমন আমরা শুনি নি। সর্বপ্রকার ধর্মের তত্ত্ব আপনার জানা আছে; এই জ্যেষ্ঠপাণ্ডব জ্ঞাতিবধের জন্য সন্তপ্ত হয়েছেন, এঁ'র শোক আপনি দূর করুন। কুরুপ্রবীর, আপনার জীবনের আর ছাপ্পান্ন (১) দিন অবশিষ্ট আছে, তার পরেই আপনি দেহত্যাগ করবেন। আপনি পরলোকে গেলে সমস্ত জ্ঞানই লুপ্ত হবে এই কারণে যুধিষ্ঠিরাাদি আপনার কাছে ধর্মজিজ্ঞাসা করতে এসেছেন।

(১) মূলে আছে — 'পঞ্চাশতং ষট্ চ কুরুপ্রবীর শেষং দিনানাং তব জীবিতস্য।' এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে। অনুশাসনপর্ব ২১-পরিচ্ছেদে ভীষ্ম তাঁর মৃত্যুর সময়ে বলেছেন তিনি আটান্ন দিন শরশয্যায় শুয়ে আছেন।

ভীষ্ম কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, নারায়ণ, তোমার কথা শুনে আমি হর্ষে আপ্লুত হয়েছি। বাক্পতি, তোমার কাছে আমি কি বলব? সমস্ত বস্তুই তোমার বাক্যে নিহিত আছে। দুর্বলতার ফলে আমার বাকশক্তি ক্ষীণ হয়েছে, দিক আকাশ ও পৃথিবীর বোধও লোপ পেয়েছে, কেবল তোমার প্রভাবেই জীবিত রয়েছি। কৃষ্ণ, তুমি শাশ্বত জগৎকর্তা, গুরু উপস্থিত থাকতে শিষ্যতুল্য আমি কি করে উপদেশ দেব?

কৃষ্ণ বললেন, গঙ্গানন্দন ভীষ্ম, আমার বরে আপনার গ্লানি মোহ কষ্ট ক্ষুৎপিপাসা কিছুই থাকবে না, সমস্ত জ্ঞান আপনার নিকট প্রকাশিত হবে, ধর্ম ও অর্থের তত্ত্ব সম্বন্ধে আপনার বুদ্ধি তীক্ষ্ণ হবে, আপনি জ্ঞানচক্ষু দ্বারা সর্ব জীবই দেখতে পাবেন। কৃষ্ণ এই কথা বললে আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হ'ল, বিবিধ বাদ্য বেজে উঠল, অপ্সরারা গান করতে লাগল, সুস্পর্শ সুগন্ধ বায়ু প্রবাহিত হ'ল। এই সময়ে পশ্চিম দিকের এক প্রান্তে অস্তগামী দিবাকর যেন বন দগ্ধ করতে লাগলেন। সন্ধ্যা সমাগত দেখে মহর্ষিগণ গাত্রোত্থান করলেন, কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরাদিও ভীষ্মের নিকট বিদায় নিয়ে প্রস্থান করলেন।